ঢাকা শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬
৩০ °সে


অর্থনীতিতে বৈশাখী উত্সবের হাওয়া

অর্থনীতিতে বৈশাখী  উত্সবের হাওয়া

বৈশাখকে কেন্দ্র করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতি। বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক, রকমারি বাঙালি খাবার, কার্ড ও মোবাইলে শুভেচ্ছা জানানো, মেলা এবং হালখাতার মধ্য দিয়ে শেষ হবে উত্সব। ফ্যাশন হাউজগুলোতে চলছে বাহারি রঙ ও ডিজাইনের বাঙালি

পোশাকের সমারোহ

g রেজাউল করিম খোকন

বাঙালিদের অন্যতম সর্বজনীন উত্সব পহেলা বৈশাখ। বর্ষবরণের এই উত্সব কড়া নাড়ছে দুয়ারে। চারদিকে চলছে প্রস্তুতি। বাংলার গ্রামীণ এই উত্সবের শুরুটা বেশ প্রাচীন। ১৫৮৬ সালের ৫ নভেম্বর থেকে বাংলা সন গণনা শুরু। সম্রাট আকবরের সময় এটি ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। চৈত্রমাসের শেষ দিন ভূস্বামীরা খাজনা পরিশোধ করে নতুন বছরের প্রথম দিন আয়োজন করতেন উত্সবের। এটিই বৈশাখী উত্সব বা বৈশাখী মেলা হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। বৈশাখী মেলায় স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সবরকম হস্তশিল্পজাত ও মৃিশল্পজাত সামগ্রী বিকিকিনি চলছে বছরের পর বছর ধরে। সময়ের পরিক্রমায় রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে বৈশাখী মেলার সেরকম আয়োজন না হলেও বৈশাখী সামগ্রীর কদর একটুও কমেনি। আগামীকাল পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ সনকে বরণ করে নিতে উত্সবে মাতবে দেশ। এখন অনেকটা ধুমধাম করেই মানুষ পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে। দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াটা এর অন্যতম কারণ। ফলে বৈশাখী উত্সব ঘিরে আর্থিক লেনদেন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হয়। বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ে। চাঙ্গা হয়ে ওঠে অর্থনীতি। এ সময় বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো তাদের এটিএম, ক্রেডিট কার্ড ও ইন্টারনেট ভিত্তিক ব্যবস্থায় অর্থের পর্যাপ্ত যোগান রাখে। প্রবাসীরা বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের পরিবার পরিজনদের কাছে বেশি পরিমাণে রেমিট্যান্স পাঠায়। মোবাইল ব্যাংকিং ও পোস্ট অফিসের মাধ্যমেও আর্থিক লেনদেন বাড়ে।

বৈশাখী উত্সব উপলক্ষে এরই মধ্যে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজের আউটলেটে ও শপিং মল বিশেষ ছাড়ের অফার দিয়েছে। কেউ কেউ বিভিন্ন হারে ক্যাশব্যাকের লোভনীয় অফার ঘোষণা করেছে। কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে তাদের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটার ওপর বিভিন্ন ধরনের ছাড় ও ক্যাশব্যাক অফার দিয়েছে। নামিদামি হোটেল ও রেস্তোরাঁয় খাবারে ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ অফারও দিয়েছে কিছু ব্যাংক। বৈশাখী উত্সবকে ঘিরে প্রতিবছর বাংলাদেশে অর্থনীতিতে আলাদা জোয়ার সৃষ্টি হয়। এই উত্সবে প্রতিবছর কী পরিমাণ আর্থিক লেনদেন হয় বা এ সময় বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ কত এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান সরকারি বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছেই নেই। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, বৈশাখী উত্সবে বাণিজ্যের পরিমাণ কমবেশি ৩০ হাজার কোটি টাকা।

তিন বছর আগে সরকার চাকরিজীবীদের জন্য বৈশাখী বোনাস ঘোষণা করায় উত্সবে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। উত্সবের কারণে খরচের চাহিদা যেমন বেড়েছে, পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বোনাস দেওয়ায় বাজারে টাকার জোগানও বেড়েছে। ফলে বৈশাখকে কেন্দ্র করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতি। বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক, রকমারি বাঙালি খাবার, কার্ড ও মোবাইলে শুভেচ্ছা জানানো, মেলা এবং হালখাতার মধ্য দিয়ে শেষ হবে উত্সব। ফ্যাশন হাউজগুলোতে চলছে বাহারি রঙ ও ডিজাইনের বাঙালি পোশাকের সমারোহ। নতুন নতুন পোশাক কিনতে ফ্যাশন হাউজগুলোতে প্রতিদিনই ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। ফুটপাতের দোকান থেকে শুরু করে নামিদামি শপিংমল পর্যন্ত সবখানেই বৈশাখী উত্সবের কেনাকাটার ধুম চলছে। এই উত্সবের মূল আকর্ষণ পান্তা-ইলিশ। বর্তমানে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও বিভিন্ন কোল্ড স্টোরেজে মজুদ করা আগে ধরা ইলিশ বাজারজাত শুরু করেছে ব্যবসায়ীরা। তাজা ইলিশের দামও থাকছে বেশ চড়া। পিছিয়ে নেই নিত্যপণ্য, ফুল, মৃিশল্প এবং গহনা ব্যবসায়ীরা। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্রই বৈশাখী উত্সবকে ঘিরে জমজমাট আয়োজন চলছে।

সবকিছু মিলিয়ে বৈশাখী উত্সবকে ঘিরে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি এসেছে। অর্থনীতিবিদদের অভিমত, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায় উত্সব ঘিরে অর্থনীতি গতি পেয়েছে। অর্থনীতিতে এর একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। কারণ, এতে দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাহিদা সৃষ্টি হয়। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ঠিক রাখতে পারলে এই বৈশাখী উত্সবের পুরোটাই ইতিবাচক হতে পারে। অন্যান্য উত্সবের সঙ্গে বৈশাখের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত ঈদ, কোরবানি, পূজা এবং বড়দিনের উত্সব নির্দিষ্ট ধর্মের লোকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বৈশাখী উত্সব হলো— ধর্ম নির্বিশেষে সব বাঙালির সর্বজনীন উত্সব। অন্যান্য উত্সবে বিদেশি পণ্যের ব্যবহার বেশি হলেও বৈশাখী উত্সবে দেশীয় পণ্যেরই প্রাধান্য থাকে। বৈশাখে ৯০ শতাংশই দেশীয় পণ্য ব্যবহার হয়। এছাড়া বৈশাখ শুধু ঘরোয়া উত্সব নয়। হোটেল, রেস্তোরাঁ এমনকি পাঁচ তারকা হোটেলে জমজমাট আয়োজন থাকে। এছাড়া ঈদে মানুষ গ্রামে চলে যায়। কিন্তু বৈশাখে যে যেখানেই থাকুক না কেন সেখানেই উত্সব পালন করে। ফলে এ উত্সব এককেন্দ্রিক নয়। এক সময় বৈশাখী উত্সব ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। গত এক যুগে তা ব্যাপকভাবে বড় বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। নববর্ষের উত্সবে লম্বা একটানা বেশ ক’দিন ছুটি পাওয়ায় অনেকেই পর্যটন স্পটগুলোতে যাবার আয়োজন করেছেন। ফলে দেশে পর্যটন স্পটগুলোতে ভিড় জমবে ধারণা করা যায়। ফলশ্রুতিতে সেখানেও ভালো ব্যবসা হবে হোটেল রেস্টুরেন্টগুলোতে। এভাবে গোটা অর্থনীতিতে বৈশাখী উত্সবের হাওয়া দারুণ চাঙ্গা ভাব সৃষ্টি করেছে নিঃসন্দেহে বলা যায়।

ছবি: সোহেল রেজা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন