ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬
৩১ °সে


কর জিডিপি হার বাড়াতে হবে

কর জিডিপি হার  বাড়াতে হবে

দেশের অর্থনীতির পরিসর বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না কর জিডিপি অনুপাত। বাংলাদেশে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায়ের হার অনেক কম। ফলে রাজস্ব আয় থেকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ জোগান বাড়াতে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও উন্নয়ন সহযোগীরা বারবার তাগাদা দিচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগও সরকারকে তাগিদ দিচ্ছে এ ব্যাপারে। বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের প্রতিবেদনে দেখা যায়, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এ হার বাংলাদেশে অনেক কম, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় কর জিডিপির অনুপাত একেবারেই সর্বনিম্নে, প্রতিবেশী সব দেশের তুলনায় এ হারের পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব বলছে, ৭ বছরে দেশের কর জিডিপি অনুপাত বাড়ানো যায়নি ১ শতাংশও। অথচ ওই সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৭ শতাংশ অতিক্রম করেছে। ওই সময়ে প্রায় পৌনে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ছিল ১৩ লাখ ৪৩৭ কোটি টাকা। গত অর্থ বছরে তা বেড়ে হয়েছে ২২ লাখ ৩৮৫ কোটি টাকা। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে এর পরিমাণ আরো বাড়িয়ে ২৫ লাখ ৩৭৮ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ হয়েছিল ২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার সামান্য বেশি। ওই সময়ে দেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার এবং জিডিপির আকার যেভাবে বেড়েছে সেভাবে কর জিডিপির অনুপাত বাড়েনি। যে কারণে সরকারের আয়ের উত্স এখনো পরোক্ষ করের উপর নির্ভরশীল যেমন- ভ্যাট, আমদানি শুল্ক ও অন্যান্য কর। সরকারের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ৭ বছরে জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে বাড়ানো যায়নি ১ শতাংশও। ২০১০-১১ অর্থবছরের পর দুই অর্থবছর এ অনুপাত কিছুটা বাড়লে টানা তিন অর্থবছর তা কমতে থাকে। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যা দাঁড়ায় ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ। করবহির্ভূত আয় বাদ দিলে এ অনুপাত এখনো এক অঙ্কের ঘর ছাড়াতে পারেনি। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ভারতে কর জিডিপি অনুপাত সাড়ে ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ, ভুটানে এ হার ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ ও নেপালের ২০ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সুশাসন এবং শৃঙ্খলার অভাবেই দেশে কর জিডিপি অনুপাত বাড়ানো যাচ্ছে না। এমনকি আগামী ৫ বছরেও ১ শতাংশ বাড়বে কিনা তা নিয়েও শঙ্কা আছে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে।

একটি দেশের সঙ্গে অন্য দেশের রাজস্ব আয় পরিস্থিতির তুলনা করা হয় মূলত মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) কত শতাংশ রাজস্ব থেকে আসে তার সঙ্গে। যে দেশের এ অনুপাত বেশি, সে দেশ তত বেশি স্বনির্ভর বলে মনে করা হয়। প্রত্যেক দেশের জনসংখ্যা ও করযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যার ভিন্নতা থাকে বিধায় এটিই সর্বজনগ্রাহ্য পদ্ধতি। কর জিডিপির অনুপাতের মাধ্যমে একটি দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য এমনকি ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার রূপরেখা প্রতিফলিত হয়। বিগত ১০ বছরে দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশীয় পয়েন্টে বাড়লেও অর্থাত্ ৫ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত হলেও কর-জিডিপি অনুপাত ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়েনি। অথচ ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে এটি ১৩ শতাংশে নিতে হবে।

২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন (মূল্য সংযোজন ও সম্পূরক শুল্ক আইন) পাস করার পর তা ২০১৫ সাল থেকে বাস্তবায়ন করার কথা ছিল; কিন্তু আইনটির কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে আপত্তি তুলে শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিল ব্যবসায়ীরা। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে কার্যকরের সব প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ব্যবসায়ীদের বিরোধিতার মুখে সরকার তা দুই বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়। সে হিসাবে আগামী জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ভ্যাট আইন বাস্তাবায়ন না হওয়ার কারণে নতুন আয়কর আইন প্রণয়নও পিছিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অবস্থার উন্নয়নে বিদ্যমান কর আইন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশে করের হার অনেক বেশি; কিন্তু কর আদায় কম। আর আমাদের কর ব্যবস্থা ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীল; কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে তা ব্যতিক্রম। মোট রাজস্ব আয়ের মাত্র ৩ শতাংশ ব্যক্তি শ্রেণির আয়কর থেকে আসে; কিন্তু যুক্তরাজ্যে এটি প্রায় ৮৬ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়া ৬২ শতাংশ, পাশের দেশ ভারতে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন। জানা যায়, নতুন করদাতা খুঁজে বের করার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) নতুন করদাতা খুঁজে বের করার যে লক্ষ্য ছিল তার মাত্র ৩০ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাড়ি বাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সারা দেশ থেকে গত জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে সোয়া ২ লাখ নতুন করদাতা চি?হ্নিত করা সম্ভব হয়েছে, অথচ সারা বছরে ৭ লাখ ২০ হাজার নতুন করদাতা খুঁজে বের করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ই-টিআইএনধারীর সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি হলেও নিয়মিত বার্ষিক রিটার্ন দেন মাত্র ১৮ লাখ টিআইএনধারী। তাদের মধ্যে ১০ শতাংশ কোনো কর দেন না, বা ‘জিরো রিটার্ন’ দেন।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আয় বাড়াতে হবে। এজন্য সরকারের উচিত কর প্রদানকারীদের ওপর নতুন করের চাপ সৃষ্টি না করে যারা কর ফাঁকি দেন তাদের করের আওতায় আনা। এজন্য রাজস্ববান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। কর প্রদানের আইনি জটিলতা দূর করা, কর ব্যবস্থা সহজ করা এবং জনগণের করের টাকা সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে অনুপাত বৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৮ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন