ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১০ বৈশাখ ১৪২৬
২৫ °সে

এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ

এর আগে কখনো দেখেনি নিউজিল্যান্ড
এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে সম্প্রতি বন্দুকধারী সন্ত্রাসীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন অর্ধশত মানুষ। এই তালিকায় রয়েছেন কয়েকজন বাংলাদেশিও। নিউজিল্যান্ডের মতো শান্তিপ্রিয় দেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কম ঘটেছে। নিউজিল্যান্ডের যুব মন্ত্রণালয় কর্তৃক ‘চেঞ্জ মেকার অ্যাওয়ার্ড’ জয়ী লিঙ্গবৈষম্য ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকা বাংলাদেশি তরুণী আতিয়া ইরফান প্রিয়ন্তী জানিয়েছেন সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে। পাশাপাশি নিউজিল্যান্ড নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা। লিখেছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

বাবা সেনা কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে প্রিয়ন্তির ছোটবেলা কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে। বাবার বদলির চাকরি, তাই মেয়েকেও বিভিন্ন স্কুলে পড়তে হয়েছে। সেনাবাহিনীতে চাকরির একপর্যায়ে বাবা জাতিসংঘে যোগ দেওয়ায় প্রিয়ন্তিরা ঢাকায় চলে আসে। ‘ও’ লেভেলে পড়ার একপর্যায়ে ২০১৩ সালে সপরিবারে নিউজিল্যান্ডে চলে যান। বছরখানেক পর মা, ভাই ও ছোটবোন দেশে ফিরলেও প্রিয়ন্তি পড়াশোনার জন্য থেকে যান সেখানে। এপসম গ্রামার স্কুলে পড়ার পর এখন পড়ছেন অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে অব টেকনোলজিতে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস নিয়ে।

নিউজিল্যান্ডে শুরুর দিকে অভিজ্ঞতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রিয়ন্তি বলেন, ‘আমি যখন নিউজিল্যান্ডে এসেছিলাম, তখন এই দেশে অধিবাসীর সংখ্যা একেবারেই কম ছিল। খুব অল্পকিছু মানুষকে পেতাম যারা অন্যকোনো দেশ থেকে এসেছে। এমনকি ধরুন, আমি যদি একটা স্টেডিয়ামের ভিড়ে দাঁড়াই, সেখানেই আপনি আমাকে আলাদা করতে পারবেন। অধিবাসী বা শরণার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানাভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয় বলে শুনি আমরা। বর্ণবাদের বিষয়টিও তো সবারই জানা। অথচ আমি এখানে আসার প্রথমদিকের সময়টায় এসবের বিন্দুমাত্রও দেখিনি। এখানকার মানুষকে খুব আন্তরিক মনে হয়েছে। তাদের মধ্যে “অ্যাক্সেপ্টেন্স” জিনিসটাও প্রবলভাবে আছে। যে কারণে আমি চমত্কার পরিবেশ উপভোগ করেছি। একটা সময় বাইরের দেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়তে শুরু করল। আমি মানুষকে সাহায্য করার সুযোগ খুঁজতাম। আর যেহেতু ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট ছিলাম, তাই স্কুলের ইন্টারন্যাশনাল ডিপার্টমেন্টে সহজেই ঢোকার সুযোগ পাই। স্কুলেও তখন শরণার্থী শিক্ষার্থী বাড়ছে। এমনই একজনকে সাহায্য করতে গিয়ে অনলাইনে “শক্তি ইন্টারন্যাশনাল”-এর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তখনই আমি জানতে পারলাম, শরণার্থীরা পারিবারিক নির্যাতনের পাশাপাশি বর্ণবৈষম্য ও লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হচ্ছে। নিউজিল্যান্ড সম্পর্কে যেহেতু সবার কাছে একটা ক্লিন ইমেজ আছে, তাই এই সমস্যাগুলো নিয়ে কেউ ভাবছিল না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, এই সমস্যাগুলোকে নিয়ে কাজ না করলে সেগুলো একসময় বড় আকার ধারণ করতে পারে। ফলে আমি “শক্তি”র সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার স্কুলে একটা গ্রুপ তৈরি করি, যেটি স্কুলে শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে কাজ শুরু করে। আমাদের গ্রুপটি শরণার্থীদের সমস্যা জানা ও তুলে ধরার একটা প্লাটফর্মে পরিণত হয়। আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল। ২০১৭ সালের এপ্রিলের দিকে “শক্তি” আমাকে নিউজিল্যান্ডে ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার পর আমি “কমিউনিটি সেফটি” ক্যাটাগরিতে “চেঞ্জমেকার অ্যাওয়ার্ড” পাই। ওয়েলিংটন পার্লামেন্ট বি হাইভে আমন্ত্রণ পাই। বিষয়টি আমার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে বাড়তি উদ্যমে কাজ শুরু করি। নারী অধিকার, পারিবারিক নির্যাতন ও শরণার্থীদের সহায়তার নানা বিষয়ে শক্তি আমাকে প্রশিক্ষণ দেয়। এরপর তো জার্মান ফার্স্টলেডির সঙ্গেও সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছিলাম। বিভিন্ন জায়গায় কথা বলার সুযোগ পেয়ে যখন সমস্যাগুলো তুলে ধরতাম, তখন অনেকেই এগিয়ে এসে ধন্যবাদ দিয়ে বলত, “তুমি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছ। আমাদের চারপাশের সমস্যাগুলো আমাদের জানা ছিল না।”

‘নিউজিল্যান্ডেই সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা চলছে। এই দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এটি বিচ্ছিন্ন বলে মনে হতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু সমস্যা তৈরি হচ্ছিল বলেই এই ধাক্কার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাদের। উগ্রবাদের ধরন দুটি—অ্যাক্ট অব টেরোরিজম ও অ্যাক্ট অব রেসিজম। একজন মানুষ যখন বেড়ে ওঠে, তার বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যখন পারিপার্শ্বিক নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, তখনই সে উগ্রবাদী হয়ে ওঠে। যে মানুষটি হামলা চালাল, সে একটি গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ থেকেই এই কাজটা করেছে, যেটি রেসিজম ও টেরোরিজম। মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া পঞ্চাশজন নিরীহ মানুষের প্রাণহানি; যাদের মধ্যে আমার নিজের দেশের মানুষরাও ছিলেন, এমন ঘটনা কখনোই কাম্য নয়। নিউজিল্যান্ডে যে আন্তরিক সহাবস্থানের পরিবেশ দেখেছি, সেই পরিবেশে তো নয়ই। নিউজিল্যান্ডের মতো শান্তির স্বর্গোদ্যানে এমন ঘটনা আমাদের কল্পনারও অতীত! এমন নারকীয় হত্যালীলা এর আগে কখনো দেখেনি নিউজিল্যান্ড। মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা বাড়ছে, কিন্তু আমাদের সেই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। আর প্রতিটি সমস্যাকে যদি গোড়াতেই নির্মুল করা যায়, তবে সেটি বড় হতে পারে না। আজকের উগ্রবাদ-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদকে নির্মুল করতে হলে একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকে কাজ করতে হবে। ক্রাইস্টচার্চের প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করছি। নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। সবশেষে বলতে চাই, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন কোথাও না ঘটে।’

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৩ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন