ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১০ বৈশাখ ১৪২৬
২৫ °সে

নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে এ দেশের রক্তমাখা ইতিহাস

নতুন প্রজন্মকে  জানতে হবে এ দেশের রক্তমাখা ইতিহাস

আনন্দ-বেদনার মহাকাব্য যেদিন থেকে চিরকালের জন্য বইতে শুরু করল বাঙালির বুকে, সেই মহান স্বাধীনতা দিবস আসছে ক’দিন পরেই। দিনটিকে সামনে রেখে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের (ঢাকা) সংসদ সদস্য নাহিদ ইজহার খান। এতে একাত্তর পরবর্তী সময়ে নিজের বেড়ে ওঠা, বাবা মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল নাজমুল হুদার (বীর বিক্রম) হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিচারণসহ দেশের প্রতি নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন তিনি

একটা অন্ধকার সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের ছোটবেলা কাটিয়েছি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর থেকে ছিয়ানব্বই পর্যন্ত আমরা স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করতে পারিনি, কারণ তখন ক্ষমতায় ছিল স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি। এখন প্রতিটি স্বাধীনতা দিবসে মঞ্চে যখন এই প্রজন্মকে গাইতে দেখি, ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার/সারা বিশ্বের বিস্ময়, তুমি আমার অহংকার’; তখন গর্বে বুক ফুলে ওঠে। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলি, ‘যতকাল রবে পদ্মা, যমুনা/গৌরি, মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার/শেখ মুজিবুর রহমান।’

মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হিসেবে আমি আজন্ম মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে লালন করি। স্বাধীনতার মাসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদদের। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যার জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। আমি মনে করি, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করার যে সুযোগ আমরা পেয়েছি, সেই উপলব্ধি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কতটা সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি জাতীয় পতাকা ও সার্বভৌমত্ব পেয়েছি, তা তুলে ধরতে হবে তাদের কাছে। মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়েও যে কতটা কষ্ট সইতে হয়েছে, সেই ইতিহাস তারা জানে না। একাত্তরের প্রজন্ম দেশের তরে প্রাণ দিয়েছিল বলেই এই প্রজন্ম একটি স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। উপভোগ করছে প্রকৃতি। শিক্ষিত হচ্ছে উচ্চশিক্ষায়। পেয়েছে কর্মসংস্থানের নানাবিধ সুযোগ। এই পথ ধরে আমরা ধীরে ধীরে সমৃদ্ধি অর্জনের পথে হাঁটছি। আর এই প্রজন্মের অনেকেই নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের জন্য সুনাম অর্জন করছে। আজ হয়তো এসবের কিছুই সম্ভব হতো না, যদি একাত্তরে আমরা স্বাধীন না হতাম। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল বৈষম্য রুখতে, স্বাধিকার আদায় করে নিতে। মুক্তিযোদ্ধারা যে আদর্শ মেনে জীবনবাজি রেখেছিলেন, তা নতুন প্রজন্মকে উপলব্ধি করাতে হবে ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে। তাহলেই তারা সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে। তাদের বলতে হবে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো দলের নন। তিনি সকল দল, মত, গোষ্ঠী ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুদ্ধস্বরে জাতীয় সংগীত গাইতে হবে, এমনকি ভর্তিপরীক্ষায়ও জাতীয় সংগীত গাওয়াকে একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সেমিনার, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী আয়োজন করা জরুরি। কারণ এই বিষয়গুলো নতুন প্রজন্মকে শৈশব থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তুলবে।

১৯৬২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন আমার বাবা খন্দকার নাজমুল হুদা। ১৯৬৮ সালে তিনি ঐতিহাসিক আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাবন্দি ছিলেন। পরে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তারা সসম্মানে মুক্তি পান। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ এবং ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণার পর বাবা মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। তিনি ছিলেন ৮নং সেক্টরের বয়রা সাব-সেক্টর কমান্ডার। যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাব পান। আমার তরুণ বাবাকে বঙ্গবন্ধু কাছ থেকে দেখেছিলেন, পরে তাকে বাংলাদেশে একটি আধুনিক সামরিক বাহিনী গঠনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেন। নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠা করা প্রথম বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম কমান্ড্যান্টের দায়িত্ব নিলেন বাবা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সময় বাবার পোস্টিং ছিল রংপুর। সেবছরই নভেম্বরের ৩ তারিখ জাতীয় চার নেতাকে এবং ৭ তারিখ আমার বাবা ও মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম ও কর্নেল এটিএম হায়দার বীর উত্তমকে হত্যা করা হয়। কত অবিচার করা হয়েছিল এই মুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্মকর্তাদের প্রতি! বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের জীবনে শুরু হয় সংগ্রাম। ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাবার আদর্শে বড় করেছেন মা। আমাদের শিখিয়েছেন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখতে, ধৈর্য ধারণ করতে, নির্লোভ হতে এবং দেশকে ভালোবাসতে। বাবার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতাম। এমন একটা সময়ও ছিল, যখন আমি ও আমার ভাই স্কুুলে যেতে পারতাম না।

৭ নভেম্বর আমাদের জীবনে একটি দুঃখ ভারাক্রান্ত দিন। এটি এতদিন ধরে সরকারি ছুটি ও উত্সবের দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ছুটি বাতিল করে আমাদেরকে কষ্ট ও গ্লানি থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তিনি আমার বাবার সততা, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমাকে একাদশ জাতীয় সংসদে সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এই সেই মহান সংসদ যার প্রাঙ্গণে আমার বাবার রক্তমাখা দেহ পড়েছিল। আমি কৃতজ্ঞ জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। তাঁকে আমি প্রথম দেখি ১৯৮১ সালের ১৭ মে মানিক মিয়া এভিনিউতে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে সেদিন জনসমুদ্রের সামনে অঝোরে কেঁদেছিলেন তিনি। শেখ হাসিনা শোককে শক্তিতে পরিণত করে আজ একজন মেধাবী ও শক্তিশালী নেত্রী হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে দিয়েছেন এক নতুন পরিচয়। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে এ দেশের রক্তমাখা ইতিহাস।

গ্রন্থনায় :সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৩ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন