ঢাকা রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬
২৮ °সে


সুখেন্দু চাকমা

রংতুলিতে স্বপ্ন আঁকা

রংতুলিতে স্বপ্ন আঁকা

>> সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

হ্রদ, ঝরনা, উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড়, গভীর বনাঞ্চল, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, ছড়াসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর রাঙামাটি পার্বত্য জেলা। এই জেলার ঘাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের ছোট্ট একটি গ্রাম জুনুমা ছড়া। সেই পাহাড়বেষ্টিত গ্রামের একটি আদিবাসী পরিবারে ১৯৯১ সালের ১০ মার্চ বিমল কান্তি চাকমা ও বিদ্যা রানী চাকমার কোল আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করে তাদের প্রথম সন্তান। পরিবার থেকে নাম রাখা হয় সুখেন্দু চাকমা।

পাহাড়ি পরিবেশে বেড়ে ওঠা সুখেন্দুকে বাবা-মা গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল। অত্যন্ত মেধাবী ছেলেটি যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে সেখানে তখনো আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ছিল না। টেলিভিশনের পর্দায় বাংলাদেশ টেলিভিশনই ছিল একমাত্র ভরসা। প্রতি শুক্রবার টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা দেখার আলাদা একটা নেশা কাজ করত তার মাথায়। আর সবার মতোই ছোটবেলায় সিনেমার কাহিনি যেমনই হোক মারামারির দৃশ্যগুলো ভালো লাগত সুখেন্দুর। সিনেমায় মারামারির দৃশ্যের প্রিয় চরিত্রের জয় হওয়ার ঘটনাটি তার মনকে আন্দেলিত করত। আর তাই হয়তো পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে সেসব দৃশ্য সাদা কাগজের ওপর কলম বা পেন্সিলের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলত ছেলেটি। তার ছবি আঁকার সূচনা হয়েছিল এভাবেই।

যখন সুখেন্দু চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিল, তখন বাবা বিমল কান্তি চাকমা একদিন ছেলের ছবি আঁকার আগ্রহ ও অংকন কৌশল দেখে মুগ্ধ হন। তিনি সন্তানকে চিত্রাঙ্কন বিদ্যায় পারদর্শী করতে উদয়ন চাকমা নামের এক শিক্ষকের কাছে পাঠান। সেখানে মাত্র এক থেকে দেড় বছর ছবি আঁকা শেখার সুযোগ হয়েছিল। চিত্রাঙ্কনের ক্ষেত্রে উদয়ন চাকমাই ছিলেন প্রথম শিক্ষক। তিনি সুখেন্দুর ছবি আঁকায় মুগ্ধ হয়ে ভবিষ্যতে সে বড় কিছু করবে এই স্বপ্ন দেখতেন। গ্রামের স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর অষ্টম শ্রেণি থেকে ঢাকার বনফুল আদিবাসী গ্রিনহার্ট কলেজে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হয়েছিল সুখেন্দু। সেখানে অষ্টম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আহসান হাবীব নামক এক শিক্ষকের সান্নিধ্যে আবারও চিত্রাঙ্কন শেখার সুযোগ হয়েছিল। অপরদিকে স্কুলজীবনে শেখা অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনাকে ব্যবহার করে অসম্ভব সুন্দর সুন্দর সব ছবি এঁকে সবাইকে মুগ্ধ করছে তরুণ বয়সে পা রাখা সুখেন্দু।

অত্যন্ত মেধাবী সুখেন্দু স্কুল-কলেজের গণ্ডী পেরিয়ে ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জনের পর চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে পরিচয় ঘটেছিল ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য প্রফেসর ড. নীতিশ চন্দ্র দেবনাথের সঙ্গে। উপাচার্য পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিলেও বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সভা-সেমিনারে অংশ নিতে আসেন। তাকে একটি অসাধারণ ছবি এঁকে উপহার দেন সুখেন্দু চাকমা। সুখেন্দুর অঙ্কিত সেই ছবি হয়তো এখনো সযত্নে সাবেক উপাচার্যের বাসার দেয়ালে কিংবা ফটো অ্যালবামে শোভা পাচ্ছে।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রিয় সাংবাদিক, কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ। গ্রামীণ জীবনের কৃষি নিয়ে গণজাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন যিনি, তাকে কাছ থেকে দেখতে পেয়ে একটি ছবি এঁকে উপহার দেওয়ার ইচ্ছে হয় সুখেন্দুর মনে। অবশেষে মনের আল্পনা ও রং তুলির আঁচড়ে শাইখ সিরাজের চিরাচরিত রূপটি এঁকে ফেলেছিলেন সেদিন। ছবিটি ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গৌতম বুদ্ধ দাশের মাধ্যমে শাইখ সিরাজের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। ছবিটি দেখার পর তিনি মুগ্ধ হয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন সুখেন্দুর।

অসাধারণ চিত্রাঙ্কনে পারদর্শী সুখেন্দুর কাছে অনেকেই প্রিয়জন, বাবা-মা, দূরদূরান্তে ফেলে আসা কোনো প্রিয় মুখের ছবি অংকন করে নিয়ে থাকেন। সুখেন্দু হাসিমুখেই সকলের আবদার পূরণ করে থাকে। এভাবেই এক শিক্ষকের পৃষ্ঠপোষকতায় পোষা কুকুর কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাণী চিকিত্সকের ছবি এঁকে দেয় সে। বর্তমানে ছবিটি ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী হাসপাতালে প্রবেশ করামাত্রই চোখে পড়ে।

সুখেন্দুর ছবি শুধু দেশেরই বিভিন্ন স্থানে শোভা পাচ্ছে এমন নয়। ২০১৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার নামকরা প্রাণী চিকিত্সক গংহিউং কিম চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় সফরে এলে তাঁকেও তারই অবিকল একটি ছবি উপহার দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল সুখেন্দুর।

সুখেন্দু চাকমা শুধু তার ক্যাম্পাস জীবনেরই ছবি অঙ্কন করেনি। আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা, পারিবারিক ও সমাজ জীবনের সুখ-দুঃখ, পাওয়া না পাওয়ার চিরাচরিত নিয়মগুলোকেও তার হাতের ছোঁয়ায় সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে একজন ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন তবে সে স্বপ্ন দেখে, একদিন তার নিজস্ব একটি আর্ট স্কুল হবে। স্বপ্ন দেখে একদিন বিখ্যাত সব চিত্রশিল্পীর নামের সঙ্গে তার নামও থাকবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৮ আগস্ট, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন