ঢাকা বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬
৩২ °সে


বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে দুই তরুণের উদ্ভাবন

বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে দুই তরুণের উদ্ভাবন

>> সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

ছোটবেলায় স্কুলের বিজ্ঞানমেলায় অংশ নেওয়া বা দেখতে যাওয়ার কথা মনে পড়ে? নিরাপদ পানির ফিল্টার, বায়ু থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন, পরিকল্পিত নগর—এমন নানাবিধ প্রকল্প নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিপুল সমাগম হতো সেখানে। বিজ্ঞানমেলায় আরো একটি জিনিস প্রায় প্রতিবারই চোখে পড়ত, সেটি হলো ‘রিসাইক্লিং’ বিষয়ক ভাবনা। অনেকের পরিকল্পনায় থাকত বর্জ্যকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার করার কথা। বিশ্বের বহুদেশেই এই কাজটি করা হয়। আমাদের প্রেক্ষাপটে তা বাস্তবে কিভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব—স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করা সম্ভব হয়ে উঠত না। তবে গৃহস্থালির বর্জ্য দিয়েই জ্বালানি তেল, পেট্রোলিয়াম গ্যাস, ড্রাই আইস, বায়ো ইথানল, অ্যাক্টিভেটেড কার্বন, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও জৈব সার তৈরি করা সম্ভব—যা করে দেখালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী।

যুগান্তকারী এই প্রযুক্তি যাঁরা উদ্ভাবন করলেন, তাঁরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী এ এম রঞ্জু ও পীযুষ দত্ত। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছিলেন তাঁরা। তাদের গবেষণায় সহযোগিতা করেছেন ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তছলিম উর রশিদ, প্রভাষক সাজেদুল ইসলাম, বাংলাদেশ অ্যাডভান্স রোবটিকসের কর্মকর্তা জিমি মজুমদার ও এবিসি কনস্ট্রাকশন কেমিক্যাল কোম্পানির চেয়ারম্যান অতনু সমদ্দার।

শিক্ষার্থী এ এম রঞ্জু বলেন, ‘আমরা ঢাকা শহরের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখেছি, এখানে গড়ে প্রতিদিন ৪৫ হাজার টন বর্জ্য উত্পাদন হচ্ছে। দেশের মোট বর্জ্যের ৩৭ ভাগই ঢাকায় তৈরি হচ্ছে। এরমধ্যে গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে শুরু করে নানাবিধ বর্জ্য আছে, যার জন্য কোনো পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নেই। মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য বাড়ছে। এমনটা চলতে থাকলে এ নগর একদিন আবর্জনার স্তূপে চাপা পড়বে। এসব কথা ভেবেই আমরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করতে চেয়েছি। বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বেশকিছু জ্বালানি কিংবা সার উত্পাদন করলে সেটি আমাদের জন্য অনেক উপকার বয়ে আনবে।’

আরেক শিক্ষার্থী পীযুষ দত্ত বলেন, ‘বর্জ্য শুধু আমাদের দেশের সমস্যা নয়, এটা সমগ্র বিশ্বের জন্যও একটা বড় মাথাব্যথার কারণ। সবাই এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে, কারণ প্রতিনিয়ত এই বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এটি জল ও স্থলের প্রাণীদের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। আমাদের সিটি করপোরেশনগুলো হিমশিম খাচ্ছে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বিগত এক বছর ধরে গবেষণা করে আসছি। আমরা চাই, আমাদের প্রতিটি শহর হোক পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও দূষণমুক্ত।’

তাঁরা আরো জানান, তাঁদের উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোটরযান ও শিল্পকারখানার জন্য ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তেল উত্পাদন করা যাবে। অন্যদিকে বাসাবাড়ির রান্নার কাজের পেট্রোলিয়াম গ্যাস ছাড়াও অগ্নি নির্বাপন, খাবার সংরক্ষণ, কোমল পানীয় ও আইসক্রিম প্রস্তুতকরণের ড্রাই আইস উত্পাদন করা যাবে। এছাড়া পরিবেশবান্ধব জ্বালানি বায়ো ইথানল, কসমেটিক্স বা পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য অ্যাক্টিভেটেড কার্বন, শিল্প কারখানার জন্য হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও উদ্ভিদের জন্য জৈবসার উত্পাদন করা যাবে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্ল্যান্ট স্থাপন করে বর্জ্যকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করলে পরিবেশও ভালো থাকবে।

শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে পেটেন্ট নেওয়ার পাশাপাশি এই প্রকল্পটি সরকারের আইসিটি ডিভিশনে জমা দিয়েছেন তাঁরা। এছাড়া একটি বিজনেস প্ল্যানও সাজিয়েছেন, যাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এধরনের কাজে অর্থায়ন করতে পারে। এ ব্যাপারে এবিসি কনস্ট্রাকশন কেমিক্যাল কোম্পানির চেয়ারম্যান অতনু সমদ্দার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই এই দুই শিক্ষার্থী গবেষণায় মনোযোগ দিয়েছেন। তাদের এই উদ্ভাবনটি যদি সরকার গ্রহণ করে এবং দেশের বড় শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট স্থাপন করে, তবে তা থেকে জ্বালানি উত্পাদন হবে। পাশাপাশি যেহেতু বর্জ্যকে একটি ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে কাজে লাগানো হবে, তাই পরিবেশও সুন্দর থাকবে। এখন ডাস্টবিন বা যত্রতত্র যে বর্জ্য পড়ে থাকে, সেটিই এখানে কাজে লাগবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের প্রভাষক সাজিদুল ইসলাম বলেন, ‘সহকারী অধ্যাপক তছলিম উর রশিদ স্যার ও আমি শুরু থেকে তাদের সহযোগিতা করেছি। তারা যে প্ল্যান্টের ধারণা তৈরি করেছে, ছোট আকারের সেই প্ল্যান্ট থেকে উত্পাদিত পণ্যগুলো আমরা ল্যাবে পরীক্ষা করে সন্তোষজনক ফলাফল পেয়েছি। বড় পরিসরে এই প্রযুক্তি স্থাপন করা সম্ভব।’

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন