ঢাকা শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬
৩২ °সে

আমার একাত্তর

আমার একাত্তর

আবদুস শাকুর শাহ

একাত্তরের নয় মাস সিলেটেই ছিলাম। তার মধ্যে আট মাস শহর থেকে অনেক দূরের এক গ্রামে, যেখানে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে পৌঁছাতে হয়েছে। গ্রামটা এমন প্রত্যন্ত ছিল যে, পাকিস্তানি বাহিনী যেতে পারেনি কখনো। ওরকম একটি জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল জীবন বাঁচানোর জন্য, সেখানে আমি অনেকটা একাই হয়ে গেলাম। আমি বাইরের লোক। অন্য সবাই আমার অচেনা। সেখানে পৌঁছানো ছিল করুণ এক স্মৃতি

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জীবনে ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতা। পরাধীনতার যে গ্রাস তার থেকে মুক্ত হতে এদেশের মানুষকে অভাবনীয় কষ্ট করতে হলো। ক্ষুধার্ত, খাবারের কোনো সংস্থান নেই, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়ানো, গ্রামে-গঞ্জে পালিয়ে গিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধের সময় এগুলো ছিল আমাদের নিয়তির মতো। সে ব্যাপারগুলো এখন অস্পষ্ট হতে হতে মানুষ প্রায় ভুলতেই বসেছে। এই ভুলে বসার ব্যাপারটা ঘটতে থাকে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর থেকে। তাঁর অনুপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা থেকে সৃষ্ট যে বাংলাদেশ, তার চেহারা পাল্টাতে শুরু করে। আমি যে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, সে অভিজ্ঞতা আমার চিত্রকর্মে উঠে এসেছে। একাত্তরে দেশের ভেতর মানুষ কীভাবে পাকিস্তানিদের প্রতিহত করেছে। তার প্রতিচিত্র এই ছবিগুলো। এদেশের মানুষ শুধু পাকিস্তানিদের প্রতিহত করেনি, প্রতিহত করছে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীকেও। ছেলে-মেয়ে-বৃদ্ধ সবাই প্রতিবাদ করে, একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ করে। সেসব আমার ফ্রেমে উঠে এসেছে। দেখা যাচ্ছে কেউ বর্শা হাতে, কেউ তরবারি হাতে, কারো হাতে সাপ, কোনোটায় দেখা যাচ্ছে বাঘের পিঠে চড়ে প্রতিরোধে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা গেছে কোনো হানাদার বাহিনীর সদস্য বা পাকিস্তানিকে হত্যা করে মাথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে আক্রমণের শিকার মানুষদের একজন। ক্ষোভ ওই পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, অত্যাচারীকে হত্যা করে তার মাথার খুলির ওপর পতাকা গেঁথে দিয়েছিল। পাকিস্তানি সৈন্যরা হেলমেট ফেলে পালিয়েছে, তার ওপর পতাকা গেঁথে দিয়েছিল। সে হেলমেটের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছে। এ ভাবে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দেশীয় দোসরদের অত্যাচারের যে জবাব, সেটা বিভিন্নভাবে আমি এঁকেছি। যা যা আমার আঁকায়-রেখায় উঠে এসেছে, তার কিছু নিজ চোখে দেখা, কিছু শোনা। কয়েকটা ছবি আছে নারী যোদ্ধারা হানাদারকে মেরে তার মাথা নিয়ে প্রতিবাদ করছে। আবার কিছু আছে হানাদার বাহিনী গুলি করছে বাঙালিদের ওপর। বাঙালিরা গুলি খেয়ে আত্মরক্ষা করছে কোথাও লুকিয়ে, কেউবা গুলি খেয়ে মারা যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা গেছে মুক্তিযোদ্ধা বা সাধারণ বাঙালিকে ধরে এনে সামনাসামনি গুলি করেছে। গুলি করে মেরে ফেলল। কিন্তু সে জানে না তার কী দোষ। এভাবে অনেকগুলো বিষয় আমার রেখাচিত্রে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের সেই সময় আমি সিলেটে ছিলাম। সিলেট শহর এবং শহরের বাইনে অচেনা জায়গায় কেটেছে এই সময়টুকু।

একাত্তরের নয় মাস সিলেটেই ছিলাম। তার মধ্যে আট মাস শহর থেকে অনেক দূরের এক গ্রামে, যেখানে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে পৌঁছাতে হয়েছে। গ্রামটা এমন প্রত্যন্ত ছিল যে, পাকিস্তানি বাহিনী যেতে পারেনি কখনো। ওরকম একটি জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল জীবন বাঁচানোর জন্য, সেখানে আমি অনেকটা একাই হয়ে গেলাম। আমি বাইরের লোক। অন্য সবাই আমার অচেনা। সেখানে পৌঁছানো ছিল করুণ এক স্মৃতি। একটানা দশ মাইল হাঁটতে হয়েছিল। গ্রামের আগেই রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা দোকান। দোকানের এদিক সেদিক দু-একজন বসে আছে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে আছি। মুড়ি-চানাচুর নিয়ে খেলাম। একজন পেঁপে নিয়ে আসছে। তার থেকে পেঁপে খেলাম। সেখানে একটা লোক বলল, কোথায় যাবেন? আমি বললাম যাব কোথায়, এখানে তো কাউকেই চিনি না। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, সুনামগঞ্জে পরিচিতরা আছে। সেটাও অনেক দূর। সেখানে যাওয়া এখন সম্ভব নয়। ভারতে যাব সেটাও কোন দিকে দিয়ে জানা নেই। বগুড়া হলে কিছু একটা করা যেত। লোকটার প্রশ্নের উত্তরে বললাম, এসেছি শহর থেকে, যাওয়ার কোনো জায়গা নাই। পালিয়ে আসতে হয়েছে। লোকটা অনেক চিন্তা করে বলল, ঠিক আছে আমার বাড়িতে চলেন। লোকটার সঙ্গে রওনা দিলাম। কিছুদূর এগিয়ে দেখি ঝাঁকড়া চুলের একটা লোক বসে আছে। জমির ভেতরে রাস্তার পাশে দা দিয়ে বাঁশের কী যেন কাটছে। তখন আমারও ঝাঁকড়া চুল। লোকটা বললেন, থামেন, কোথায় যান? এ কথায় ভয়ে আমার শরীর কাঠ হয়ে গেল। বললাম, আমার তো থাকার জায়গা নাই। উনি থাকার জায়গা দিবে বলে নিয়ে এলেন।

কোত্থেকে এসেছেন জানতে চাইলে আমি জানাই, সিলেট থেকে এবং পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল যে আমার পরিচিত তা-ও জানিয়ে দিই।

তখন আমাকে নিয়ে আসা লোকটাকে গালি দিয়ে বিদায় করল। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কী ঘটছে। তিনি জানালেন, যে লোকটার সাথে যাচ্ছিলেন সে চোর। বাসায় নিয়ে রাতে সবকিছু রেখে সকালে বের করে দিত। আমি তার এ কথায় আশ্বস্ত হতে পারলাম না। হাতে দা, বড়ো ঝাঁকড়া চুল, দেখতে ঠিক ডাকাতের মতোই।

তিনি বললেন, আমিও পালিয়ে শহর থেকে এসেছি। এখানে আমার শ্বশুরবাড়ি। এখানে আপনাকে থাকার জায়গা ঠিক করে দিচ্ছি। যতদিন দেশে শান্তি ফিরে না আসবে, ততদিন এখানে থাকবেন। আমার শ্যালককে বলে দিচ্ছি। কিছু পয়সা দিবেন, ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবে। গরু রাখার ঘরের পাশের একটি কক্ষ দেখিয়ে বলল—আমার সঙ্গে এখানে থাকবেন।

এতেই রাজি হয়ে গেলাম। জীবনতো বাঁচাতে হবে। আমার আর কোনো পথ খোলা নাই। এখানে সকালে একটু চা-নাস্তা দেয়। দুপুরে ভাত দেয় খাওয়ার মতো। রাতেও খাবার দিত। সিলেটের রান্না খেয়ে অভ্যস্থ নই, তবে বিপদে

সেখান থেকে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকি। আমরা চার বা পাঁচ জন ছিলাম। সঙ্গীদের সবাই বিভিন্ন পেশার লোক, আমার সঙ্গে ঠিক যায় না। তারপরও সিদ্ধান্ত নিই, যাব। আমরা দলবেঁধে সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে দেখি ডাকাতি হচ্ছে। প্রত্যেকের সব কেড়ে নিয়ে ওপারে পাঠাচ্ছে। আমাদের সঙ্গে কারো যোগাযোগ ছিল না। ভাবলাম আমাদের সঙ্গে যে কয়টা টাকা আছে তা নিয়ে নিলে খাব কী, থাকব কোথায়। যারা বর্ডার পাহারা দিচ্ছে তারা বলল, গেলে এখন ডাকাতের কবলে পড়বে, বরং ফিরে যাও। যাওয়ার যখন সময় হবে আমরা তোমাদের খবর দিব। আমার বন্ধুবান্ধব অনেকেই ভারতে গেছে যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। আমার ছাত্ররাও গেছে। আমার পরিচিত সিলেট যুবলীগের সভাপতি—সেও গেছে। আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম।

এর মধ্যে শহরে অনেকগুলো ঘটনা দেখেছি। নিজেরও অনেকগুলো ঘটনা আছে। তখন তো চিঠিপত্র যায়ও না, আসেও না। পোস্ট অফিসে গেলাম খবর নেওয়ার জন্য যে এখন চিঠি যায় কি না। যায়—জানতে পেরে ঢাকায় আমার বড়ো ভাইয়ের কাছে একটা চিঠি পাঠাই। চিঠিটা ফেলে বের হওয়ামাত্র আর্মির গাড়ি থেকে একটা বিহারি ছেলে লাফ দিয়ে নেমে এসে আমার পথ আটকে দাঁড়ায়। বলে, তুমি এই পাঞ্জাবি কেন পরেছ? আমি জানতে চাই, পাঞ্জাবির দোষটা কোথায়, এটা তো ইসলামি পোশাক? সে তখন ইনিয় বিনিয়ে বলে, না, তোমার এটায় হাত ঢোলা, ঝুল বেশি তুমি তোমাদের নেতা শেখ মুজিবের অনুসারী। না হলে এ পাঞ্জাবি পরতে না।

আমি অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু ও কিছুতেই মানতে রাজি নয়। গাড়িতে বসা আর্মির মেজর তখন ছেলেটাকে ডাকে। আমি কালবিলম্ব না করে দৌড়ে পোস্ট অফিসে ঢুকে পড়ি। আমার সঙ্গে তখন আরো একজন ছিল, সেও ভয়ে কাঁপছে। পোস্ট অফিসের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে ধানখেত দিয়ে দৌড়ে গ্রামের দিকে ছুটি। পদে পদে এরকম ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে।

বগুড়ায় থাকলে আমার এই দুঃখটা হয়তো থাকত না। যুদ্ধে যেতে পারতাম, ভারতেও যেতে পারতাম। আমার ছোট ভাই যুদ্ধ করেছে। সে আমার ফুফাত ভাই—মতিউর রহমান। ও বগুড়ার বিখ্যাত রাজাকারকে গুলি করে মেরেছে। যা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বগুড়ায় সবচেয়ে বড়ো ঘটনা। ঢাকায় থাকলে অন্যদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারতাম

আমাদের প্রিন্সিপাল সাহেব ছিলেন মুসলিম লীগের সাপোর্টার। তার ভাইও মুসলিম লীগার। তখন ক্লাস বন্ধ। অনেকে যাওয়া-আসা করে বটে। প্রিন্সিপালের ভাই জানাল, যার যা কিছু আছে, এখান থেকে সরিয়ে নাও। আমরা তিন জন কমবয়সী শিক্ষক। তারমধ্যে একজন হিন্দু। সে নিয়ে গেল গাড়িতে করে। যেখানে সেখানেই চেক করে। হাত দেখে পা দেখে। আর্মিরা ক্যাডেট কলেজকে ক্যান্টনমেন্ট বানিয়েছে। আমি একটা অনুমতি বের করি। ভয়ে ভয়ে কলেজে ঢুকি। কখন কাকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে। ক্যাডেট কলেজের গেট পর্যন্ত যাওয়ার পর হুট করে এক মেজর আমাদের আটকায়, সে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে দেয়ালের পাশে নিয়ে যায়। আমরা ৭/৮ জন। দেয়ালের আড়ালে দাঁড়াতে বলে। আমি ভাবছি, এখানেই শেষ। দেয়ালের পাশে নেয় সাধারণত গুলি করতে। কিন্তু আমাদেরকে গুলি করল না। আমরা দুজন উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি আশপাশে কী হচ্ছে। আমাদের মারবে, না অন্য কোনো ধান্দা। দেখি একটা মৃতদেহ বের করছে। তার ওপরে পাকিস্তানি পতাকা। এবার আমার মনে হলো কোনো জেনারেল হয়তো মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা গেছে। আর্মির কোনো বড়ো অফিসার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে। বেশি যুদ্ধ হয়েছিল জৈয়ন্তপুর। সেখানেই হয়তো মারা গেছে। ওকে বের করে পাকিস্তানে পাঠাচ্ছে। বের করে গাড়িতে তুলল। হয়তো এয়ারপোর্টে নিয়ে বিমানে পাকিস্তান পাঠাবে। তারপর আমাদের ডাকল। আমরা বললাম, আমাদের জিনিসপত্র নিতে এসেছি। তরুণ এক ক্যাপটেন বলল যে এতদিন পরে এখানে কোনো জিনিস থাকে? তোমাদের কি কোনো বিবেক-বুদ্ধি নাই? যেখানে প্রতিদিন পাখির মতো গুলি করছি।

আমার ছাত্রজীবনের সমস্ত কাজ পেইন্টিং, স্কেচ সমস্ত কিছু ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলাম। রুমে গিয়ে দেখি, কিছুই নাই। এরপর গেলাম লাইব্রেরিতে। সেখানে আমাদের নির্দেশ দিল, ঘর খালি করার জন্য, সব বই নামিয়ে ফেলার জন্য। প্রিন্সিপালসহ সবাই মিলে বই নামানো শুরু করলাম। ওই মেজর হুট করে বলল, তোমরা হিন্দু। এই কৃত্তিবাসী রামায়ণ কেন? তোমরা মুসলমানদের রামায়ণ পড়াও। তোমাদের বিচার হবে। তারপর সবাই কাঁপতে শুরু করছি ভয়ে। কোনোমতে বই নামাতে গেছি অমনি বইয়ের পেছন থেকে শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোটের একটি পোঁটলা আমাদেও সামনে মেঝেতে পড়ল। মেজর তো আরো গরম হয়ে গেল। আমরা তো বুঝেছি কোনো মেয়েকে অত্যাচার করে হয়তো মেরে ফেলেছে। সে কাপড়ই এখানে রেখেছিল। মেজর আমাদের গালিগালাজ করে গোষ্ঠী উদ্ধার করল। কারণ, এসব বের হলো কেন। বই গাড়িতে তুলে আমরা চলে এলাম। তখন প্রিন্সিপালকে বললাম, আপনার কাণ্ডজ্ঞান নাই। আমরা এখানে মারা যেতে পারতাম। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, আর আমরা এসেছি জিনিস নিতে। যুদ্ধ যখন চলে তখন আমার ছবি আঁকা হয়নি। নিজের জীবন, বাবা-মা কীভাবে আছে সে চিন্তায়ই প্রতিনিয়ত মনোকষ্টে দিন পার করতে হতো। খাওয়া নাই, কলম নাই, কালি নাই, কাগজ নাই। কোনোকিছু দেখলে নিয়ে যায়। রেডিও দেখলে নিয়ে যায়। ভয়, সবসময় ভয়। বাজারেও যাইনি। একটা পরিবারের সবাই মিলে কোনোমতে বাজার করে খাই। মরলে সবাই একসঙ্গে মরব এমন চিন্তা নিয়ে ছিলাম। সে সময়ে আঁকাটা কঠিন কাজ ছিল। সে-সময় কিছু কাজ করেছিলাম পেনসিলে। পরে সেগুলোই ১৯৭৬ সালে অঙ্কন করি। সেসময়ের একটা ছবিই আছে। জলরঙের মতো করে একটি কাগজে করেছিলাম। একটি বাস্তবে দেখা বিষয়। ধর্ষিত একটি মেয়ে পালিয়ে রাস্তার পাশে বসে আছে। এরকম দৃশ্য আমার চোখে পড়েনি। তবে এমন ঘটনা প্রচুর শুনেছি। তবে আমাদের ক্যাডেট কলেজের দেয়ালের পাশে মাথার খুলি, চুল, কাপড় দেখেছি। মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিল। সরাসরি আমার চোখে পড়েনি। আমি ওই থিমটা নিয়ে কাজ করেছি। আমার ছবিতে বেশির ভাগই এসেছে মানুষের কষ্ট। নয়টা মাস যে কষ্ট মানুষ করেছে আমার বিশ্বাস সব কষ্টের ঘটনা পুরোপুরিভাবে আসেনি। মানুষের শত রকম কষ্ট ছিল। কেউ অসুস্থ, চিকিত্সা নাই। কেউ খাবার পাচ্ছে না। কেউ বাজরে যেতে পারছে না। কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। শত রকম কষ্ট ছিল তখন। যারা সরকারি চাকরি করত তারা বেশি বিপদে ছিল। না এদিকে, না ওদিকে। মরবে না বাঁচবে। আরেকটা হলো ব্যবসায়ীরা। দোকান রেখে পালাবে, না দোকানদারি করবে। এতসব মালপত্র রেখে কোথায় যাবে সে। এ ধরনের লোক কিছু মারাও গেছে। আমাদের সঙ্গে যারা ছিল তাদের মধ্যে কেউ মারা যায়নি। ওরা যখন জেনেছে আমরা সরকারি চাকরি করি, তারপর মারতে যায়নি। আমাদের সঙ্গে একজন হিন্দু বেঁচে গেল। সবাইকে নিয়ে নামধাম জিজ্ঞেস করেছে। ওকে ডেকে যখন নাম জিজ্ঞেস করছে। ও বলেছে আমি বড়ুয়া। তখন বলল, তুমি বড়ুয়া তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহী নেতার নাম বল। ও নামটা জানত এবং বলল। তখন ওকে বলল, তুমি তো আমাদের লোক, তোমার কোনো ভয় নাই। কোনো অসুবিধা হলে আমাদের জানবে। এভাবে ও বেঁচে গেল। ও পরে আমাদের বলেছে কেমনে আমার মাথায় বড়ুয়াটা এল। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছিল কিছু একটা হচ্ছে। শুনেছি ভারতের সেনারা ঢুকে পড়েছে। পাকিস্তানি সেনারা রাগান্বিতভাবে পিছু হটছে। ভারতের হেলিকাপ্টার দিয়ে বম্ব ফেলছে। শহরে কয়েক জায়গায় বম্ব ফেলেছে। প্যারাসুট দিয়ে সৈন্য নামছে। এটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমরা যেখানে আছি তার চার-পাঁচ মাইল দূরে ভারতের সৈন্যরা নামছে। আশপাশের সব এলাকা খালি হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা স্বাধীন হলো। কিন্তু সিলেট স্বাধীন হলো না। স্বাধীন দেশেও পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল বর্ডার এলাকায়। আমাদের সাহস হলো। আমরা শহরে ফিরে এলাম। সিলেটে কয়েকদিন পর আত্মসমর্পণ করল। তখন শহর খালি হলো। মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে এল। আমার বন্ধু শাহ আজিজ যুদ্ধে গিয়েছিল, সে ফিরে এল। ওরা বলল, তোমরা যে বেঁচে আছ এটা আমাদের কল্পনার বাইরে। স্বাধীনতার পর সিলেটে মুক্তিযোদ্ধাদের প্যারালাল আরো একটি গ্রুপ দাঁড়াল মুসলিম লীগ। সিলেটে কিন্তু মুসলিম লীগের প্রভাবটা বেশি। ওরা বিভিন্ন জায়গায় বিতর্কিত বিষয়গুলো করতে থাকল। এই মুসলিম লীগার লোকজন বেশিদিন তাণ্ডব চালাতে পারেনি। কারণ তাদের মূল নেতাকে মুক্তিযোদ্ধারা শহরে হত্যা করে। অনেককে আবার ধরে এনে জেলে দেয়।

বগুড়ায় থাকলে আমার এই দুঃখটা হয়তো থাকত না। যুদ্ধে যেতে পারতাম, ভারতেও যেতে পারতাম। আমার ছোট ভাই যুদ্ধ করেছে। সে আমার ফুফাত ভাই—মতিউর রহমান। ও বগুড়ার বিখ্যাত রাজাকারকে গুলি করে মেরেছে। যা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বগুড়ায় সবচেয়ে বড়ো ঘটনা। ঢাকায় থাকলে অন্যদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারতাম।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০৩ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন