ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬
৩২ °সে

চন্দ্রমল্লিকার উত্সব

চন্দ্রমল্লিকার উত্সব

ইকবাল হাসান

শামসু মল্লিক যেদিন ঘোষণা দেয় যে, সে আলেকজান্ডারকে নিজের চোখে দেখেছে, রাজাধিরাজ আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, আমাদের বাদুরতলা গ্রামের সহজ-সরল মানুষেরা দিশেহারা হয়ে পড়ে এই ঘোষণায়; তাদের অজানা—কে এই আলেকজান্ডার, কোথাকার মানুষ, এই নাম তো তারা কোনোদিন শোনেনি এবং এই চির-অবহেলিত অজপাড়াগাঁয় সে আসবেই বা কেন, এমত প্রশ্নে মুহূর্তেই তাদের মনোজগতে হাত-পা ছড়ায় প্রায় অপ্রতিরোধ্য ঘোর ও বিভ্রান্তি।

অঙ্কের শিক্ষক সোহরাব মাস্টার তখন সবাইকে এমত ঘোর ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসেন, শামসু মল্লিকের পর তিনিই গ্রামের একমাত্র বিএ পাস করা মানুষ, যিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি কথাও বলেন না এবং যা বলেন তা অঙ্কের মতোই, হিসেব নিকেশ করে বলেন, ফলে এতদিনে এই গ্রামের প্রায় সবারই জানা হয়ে গেছে যে, তার কথার ওজন আছে।

অতঃপর তার মাধ্যমেই গ্রামের মানুষদের জানা হয় যে, আলেকজান্ডার গ্রিস নামের একটি দেশে জন্মগ্রহণ করেন। মহাবীর, যোদ্ধা আলেকজান্ডার একের পর এক যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে বিশাল রাজত্ব স্থাপন করেন ষোল বছরের শাসনামলে। তিনি, এমনকি, ভারত উপমহাদেশ পর্যন্ত এসেছিলেন।

শামসু মল্লিক ইতিহাসের শিক্ষক বিধায় এবং অতিসম্প্রতি তার ছোট ছেলেটি পুকুরে ডুবে মরে যাবার পর থেকেই তিনি চীনের কনফ্যুসিয়াস, সম্রাট অশোক, চেঙ্গিস খাঁসহ বিখ্যাতজনদের চোখের সামনে দেখতে শুরু করেছেন, ফলে এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নাই—সোহরাব মাস্টারের এমত আশ্বাসে গ্রামের মানুষেরা সাময়িকভাবে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও তাদের বিভ্রান্তি পুরাপুরি কাটে না।

বাদুরতলা গ্রামটিতে যদিও সন্ধ্যা নামার আগেই যেন রাত্রি নেমে আসে, অনেকটা নিঃশব্দে। পোষা বিড়ালের পায়ের পাতার মতো। ঘন বনজঙ্গলের ভেতর ছড়ানো ছিটানো বাড়িঘরগুলোকে গ্রাস করে আলোহীন কালো অন্ধকার, তবু এই গ্রামটিতে কেউ কোনোদিন জিন-পরি, ভূত-প্রেতের মুখ দেখেনি। আলেকজান্ডার দর্শনের এই ঘোষণা অতএব তাদের খুব স্বাভাবিকভাবেই উতলা করে তোলে, সোহরাব মাস্টারের ওজনদার কথার পরও কেউ কেউ ইতোমধ্যে ভাবতে শুরু করে যে, শামসু মল্লিকের ওপর জিন আছর করেছে!

নদীর নাম বিশখালি, যার পানি প্রায়শ ঘোলা থাকে, আর এই নদীর পাড়ে আমাদের বাদুরতলা গ্রামের কথা যাদের স্মরণে আছে তারা নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, এমন নিষ্প্রভ-নিস্তরঙ্গ গ্রাম বাংলাদেশের মানচিত্রে আর দ্বিতীয়টি নাই। গ্রামের কারো কোনো বাড়তি চাহিদা নাই, মামলা-মোকাদ্দমা নাই, যার যা আছে তা নিয়েই সে তুষ্ট! জীবন তাদের দিঘির জলের মতো স্বচ্ছ ও নিস্তরঙ্গ, বিশখালির জোয়ারভাটার মতো চলমান এবং স্বাভাবিক। বাদুরতলার মানুষরা জানে না উচ্চাকাঙ্ক্ষা কাকে বলে! গ্রামে বিদ্যুত্ না থাকায় দিনের বেলায় সূর্য আর রাতের বেলা কুপি, মোমবাতি ও হারিকেনের প্রায়-নিষ্প্রভ আলো তাদের একমাত্র ভরসা।

শামসু মল্লিকের আলেকজান্ডার দর্শনের আরো কিছুকাল আগে, তখন আমাদের তরুণকাল, একদিন সকালবেলা দেখি, আমার দরজায় ওরা তিন জন, শামসু, সোহরাব ও হারান মন্ডল। আমি তখন নাখালপাড়ার অতি ভিতরে এক মেসবাড়িতে থাকি। ছোট্ট একখানা ঘর, সারা বছর ফ্লোর স্যাঁতসেঁতে ভেজা ভেজা থাকলেও খারাপ লাগে না, স্বাধীন স্বাধীন ভাবটা যেন উড়ে বেড়ায় এখানে। আমার ভালো লাগে। আর আছে একখানা জানালা, যেখান থেকে আকাশ উঁকি দেয়, আর রাতবিরাতে তেছরা করে ঢুকে পড়ে চাঁদ।

হারান মণ্ডল ঘরে ঢুকেই সুদূর বাদুরতলা থেকে ঢাকা আসার কারণ ঘোষণা করে।

আজ বঙ্গবন্ধু ফিরে আসবেন।

শামসু মল্লিক ঘোষণা দেয় যে, তারা ইতিহাসের অংশ হতে চায়। আজ বঙ্গবন্ধু ফিরে আসবেন, এ যেন বিশ্বজয় করে আলেকজান্ডারের ফিরে আসার মতো। আর এই ঐতিহাসিক ফিরে আসার অবিস্মরণীয় দিনটির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে চান তারা।

আমাদের দিকে তর্জনী তুলে শামসু মল্লিক বলে, তোদের বলছিলাম না, পৃথিবীতে এমন কোনো কারাগার তৈরি হয়নি আজো—যেখানে বঙ্গবন্ধুকে ওরা আটকে রাখতে পারে।

শুনেছি, বঙ্গবন্ধুর সেলের পাশে ওরা নাকি কবরও খুঁড়ে রেখেছিল! হার্মাদের দল।

হারান মন্ডল বলে, এখন অই কবরে তোরা নিজেরা ঘুমা।

আমাদের মধ্যে একমাত্র হারান মন্ডলই বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক। আমরা ধারণা করি, হারান মন্ডলের বয়স আমাদের দ্বিগুণ হবে। যদিও তাকে দেখে এতকাল বোঝার উপায় ছিল না। তবে গত কয়েক মাসে পরানের চিন্তায় চিন্তায় হারান মন্ডলের শরীর ভেঙে গেছে, বয়সের তুলনায় এখন অনেক বয়স্ক মনে হয় তাকে। তার একমাত্র সন্তান পরান, পরান মন্ডল, নিখোঁজ।

একাত্তরের মাঝামাঝি, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে হারান মন্ডল দেখে, পরান নাই! দরোজাটা হা করে খোলা। স্ত্রী প্রতিমার চিত্কারে তখন আকাশ-বাতাস কেঁপে ওঠে, সোহরাব ও শামসুকে নিয়ে পুরো বাদুরতলা এবং আশপাশের ছয় গ্রাম চষেও ছেলের কোনো হদিস করতে পারল না হারান মন্ডল। পনেরো বছরের ছেলেটা দশম শ্রেণিতে পড়ত, ৭ মার্চের ভাষণ শুনেছিল রেডিওতে, ...তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো—এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।

স্বাধীনের সেই স্বপ্নময় ভাষণ আগুন ছড়িয়ে দিল ছেলেটার বুকের ভিতর। তাকে আর ঘরে রাখা গেল না।

গানের গলা ছিল পরানের, খালি গলায় উদাত্ত কণ্ঠে গান গাইত। দেশের গান।

বাদুরতলা প্রাইমারি স্কুলের পাশ দিয়ে যে সরু মাটির রাস্তা ঘন বনজঙ্গল দু ভাগ করে বিশখালির দিকে চলে গেছে, সেখানে এখন শুধু জোনাকির আলো, সেই আলোর ভিতরে যেন ফুটে ওঠে পরানের মুখ, স্পষ্ট দেখতে পায় হারান।

গভীর রাতে অই জোনাকজ্বলা বনজঙ্গলের ভিতর থেকে মাঝেমধ্যেই পরানের গলা শুনতে পায় হারান মন্ডল। ...শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রনি..., বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ—সেই সুর, সেই স্বর অস্থির করে তোলে তাকে।

রাত গভীর হলে হারান মন্ডল পরানের অপেক্ষায় বিশখালির পাড়ে বসে থাকে ভোরঅব্দি, যদি পরান মঠবাড়ি বা চল্লিশ কাউনিয়ার দিক থেকে ফিরে আসে! আসে না, তবু বসে থাকে হারান মন্ডল, একদিন না একদিন এই জলপথ ধরে পরান তার বুকে ফিরে আসবে এই আশায়।

মাঝেমধ্যে প্রতিমা ছায়ার মতো পাশে এসে দাঁড়াত, লও, ঘরে লও—বলে হারানকে নিয়ে ঘরে ফিরত, সেই প্রতিমাও পুত্রশোকে ভুগতে ভুগতে একসময় না ফেরার দেশে চলে গেল।

এখন হারানের পাশে আমরা ছাড়া আর কেউ নাই।

আজ বাঙালি জাতির জন্য এক অবিস্মরণীয় দিন। আজ বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসবেন। উত্তেজনায় আমরা থর থর করে কাঁপছি।

এমত সময়ে মাজেদা খালা এসে হাজির। তিনি আমাদের প্রতিবেশী, যেকোনো উত্সব আয়োজনে তিনি আমাদের ডাকেন, আমরা ছাড়া এই দুনিয়ায় যেন আর কেউ নাই তার। আত্মীয়স্বজনদের একদম ধারে কাছে ঘেঁষতে দেন না। গ্রাম দেশের প্রায় সব জমিজমা নাকি লুট হয়ে গেছে তার স্বামী মারা যাবার পরপরই। আর এই লুণ্ঠনকারীদের সবাই আত্মীয়স্বজন, খুব কাছের মানুষ, একদা তিনি যাদের খুব বিশ্বাস করতেন। বেশ সরল-সোজা মানুষ, প্যাঁচঘোচের ব্যাপার একদম বোঝেন না, আমি তাকে প্রথম পরিচয়ের দিন আপা বলে ডেকে একটা বড়ো ধরনের ধমক খেয়েছিলাম, এই ছ্যাড়া, আমারে কি তোর বোনের বয়সী লাগে? আমি তোর বোন না, তোর মায়ের বোন। আমারে এখন থেকে খালা বলে ডাকবি। সেই থেকে তিনি আমাদের মাজেদা খালা।

তিনি ল্যাটকা খিচুরির দাওয়াত দিতে এসেছেন। উপলক্ষ, বঙ্গবন্ধু আসবেন আজ। অনেক বড়ো আয়োজন।

মাজেদা খালাসূত্রে আমরা যখন জানলাম যে, লন্ডন থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আসা বিমানটি ঢাকার পথে ভারতের মাটিতে নেমেছে, আমাদের উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। হারান মন্ডল জয়বাংলা বলে চিত্কার করে উঠল।

মাজেদা খালার বাড়ির ছাদ থেকে বঙ্গবন্ধুকে হয়তো একনজর দেখতে পাবো ভেবে ছাদে উঠে যাই আমরা।

আর তখুনি এক অভাবনীয় দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

আমরা দেখি যে, প্রতিটি বাড়িতে চন্দ্রমল্লিকা ফুটে আছে। ছাদে, ব্যালকনিতে, বারান্দায়, ছাদের কার্নিশে, রাস্তার দু পাশে সর্বত্র যেন চন্দ্রমল্লিকা। যুবরাজ আসবে বলে এ শহরে যেন আজ শুরু হলো চন্দ্রমল্লিকার উত্সব!

প্রথমে ভেবেছিলাম, এ শুধু আমারই দৃষ্টিভ্রম, কিন্তু শামসু, হারান ও সোহরাব মাস্টার যখন বলল, চারদিকে আজ এত চন্দ্রমল্লিকা ফুটেছে, কী আশ্চর্য! আমি তখন নিশ্চিত হলাম, এ আমার দৃষ্টিভ্রম নয়!

পুরো শহর জুড়ে লাল লাখ চন্দ্রমল্লিকা, মাজেদা খালাকে এই খবরটি দেবার জন্য আমরা সহসা উদগ্রীব হয়ে উঠি আর ঠিক তখন জয়বাংলা ধ্বনিতে আকাশবাতাস কেঁপে ওঠে। আমাদের চোখ তেজগাঁও বিমানবন্দরের দিকে স্থির হয়।

গনগনে দুপুরে লাখ লাখ চন্দ্রমল্লিকার ভিতর অতঃপর ফুটে ওঠে বহুল প্রতীক্ষিত সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত, সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বস্তির মুহূর্ত যেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আসা ট্রাকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে রেসকোর্স ময়দানের দিকে। চারদিকে জয়বাংলা ধ্বনির ভিতর আমরা স্বপ্নময়তার সমুদ্রে সাঁতার কাটছি যেন, এই দৃশ্যের বাস্তবতা নিয়ে অপসৃয়মাণ কুয়াশার মতো আমাদের ঘোর কেটে গেলে আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকি।

সেই রাতে হারান মন্ডল তার ছেলে পরানকে খুঁজে পায়। সে দেখে যে, অলৌকিক জ্যোত্স্নার ভিতর বত্রিশ নম্বর বাড়ির বারান্দায় বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে পরান।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০২ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন