ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬
৩২ °সে

বাপ আবার মরে নাকি!

বাপ আবার মরে নাকি!

আন্দালিব রাশদী

মন্টু মামাকে মায়ের দিকের সর্বোচ্চ শিক্ষিত আত্মীয় বলা যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সেকেন্ড ক্লাস অর্নাস। এমএ পড়ছে। অনার্সের ফল বেরোতে এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। দেরি এতটাই যে এমএ পরীক্ষাও ঘনিয়ে এসেছে। জুন কি জুলাইতে পরীক্ষা। উনিশ শ একাত্তর। সিনিয়র ছাত্ররা তখন নেতা না হলেও সিঙ্গেল রুম পেত। মন্টু মামাও পেয়েছে।

মন্টু মামার চেয়ে বছর দুয়েকের বড়ো আবদুস সামাদ স্কুলজীবনে ক্লাস এইটে একবার ফেল করে। এসএসসিতে একবার ফেল করে। সিরাজগঞ্জ কলেজে মন্টু মামার ক্লাসমেট বেখেয়ালি ধরনের মানুষ আবদুস সামাদ বাঁশি বাজাত দারুণ, দেখে দেখে মানুষের ছবি আঁকতে পারত। ক্লাসের খাতায় কখনো কলমে কখনো পেনসিলে এসব ছবি আঁকাআঁকি। মন্টু মামা ধরলেন, তাহলে আমার একটা ছবি এঁকে দে, শক্ত কাগজে চাইনিজ ইঙ্কে। কাগজ, চাইনিজ ইঙ্ক, লম্বা নিব মন্টু মামাই কিনে দিয়েছে।

আবদুস সামাদ ছবি আঁকা শেষ করে ছবির ঠোঁটে একটু হাসি ছড়িয়ে দিল। এটুকু বাড়তি কাজ একজন শিল্পী করতেই পারে। বাস্তবের মন্টু মোটেও হাসিখুশি ধরনের মানুষ নয়, খুব গম্ভীর। নিজের আচরণের সাথে বেমানান এ ছবিটি তার এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে বাড়তি টাকা খরচ করে আরশি গ্লাস হাউস থেকে চমত্কারভাবে বাঁধাই করিয়ে আনে। ছবির চার সীমান্তে কাঠের ফ্রেমের রং ঘন কালো। কালো বর্ডার পছন্দ হয়নি আবদুস সামাদের। বলেছে, মন্টু কাজটা ভালো করিসনি। ফ্রেমের কাঠের রংটা কালো হওয়ায় ছবিটাকে মনে হয় খবরের কাগজে ছাপা শোক সংবাদ। কাঠের ন্যাচারাল কালারটাই দিতে পারতি।

যুক্তি মন্টু মামারও আছে। বলল, তুই আমার ঠোঁটে যে হাসিটা এঁকেছিস ফ্রেমটা কালো হওয়াতে তা বেশি ফুটেছে।

ছবিটা যখন বাহিরগোলা রোডে আবদুল বারীর ব্যক্তিগত পাঠাগারের পাশের হলুদ রঙের একতলা বাড়ির সাদা দেয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া হলো, দেয়ালটাই হঠাত্ খিলখিল করে হেসে উঠল। মন্টু আবার হাসে নাকি?

মন্টু মামার মা, মানে নানি মন্টুর হাসি দেখে মহাখুশি। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত মন্টু হাসিখুশিই ছিল, খিলখিল করেই হাসত। কিন্তু স্কুলে ভর্তি করে দেবার পর থেকেই গম্ভীর হয়ে উঠল—গাম্ভীর্যে তার স্কুলের হেডমাস্টার মহিবউল্লাহকেও ছাড়িয়ে গেল। মন্টু মামার বাবা বললেন, পুরুষ মানুষ গম্ভীরই ভালো। তাছাড়া মন্টু বাড়ির বড়ো সন্তান। বড়োটি গম্ভীর হলে ছোটগুলো তাকে ভয় পাবে, শাসন করতে সুবিধে হবে।

মন্টু যখন ক্লাস এইটে, তার ছোট চার ভাইবোনের শাসন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব মন্টু সেধেই নিজের ঘাড়ে নিয়ে নেয়। মন্টুর বাবা নেয়ামত আলী সকাল-সন্ধ্যা গায়ে যমুনার হাওয়া লাগিয়ে বেড়ান। সংসারের কর্তৃত্ব চলে যায় মন্টুর হাতে।

মন্টুর শাস্তিতে বৈচিত্র্য কম। শাহানা বানুর শাস্তি আট বালতি পানি, সেন্টুর তিন বালতি, রেহানা বানুর দুই বালতি আর চাঁদ সুলতানা যেহেতু খুব ছোট, বালতি টানতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়তে পারে সে জন্য অ্যালুমিনিয়াম জগে দু জগ পানি।

বাহিরগোলা সড়কের শেষ মাথায় একটা নতুন টিউবওয়েল। দুটো পাইপ বেশি দেওয়াতে মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত গিয়েছে। টিপতেই যে পানি বের হয় তা বেশ স্বচ্ছ এবং কেউ কেউ বলে, মিষ্টিও। মন্টুর শাসন কায়েম হবার পর তা ছোট ভাইবোনদের কেউ শস্তিযোগ্য কোনো অপরাধ করলে পানি-শাস্তি আরোপ করত। ফলে বাড়ির একটি সিমেন্ট বাঁধাই পানির হাউস সবসময়ই পানিতে পূর্ণ থাকত। পানি-শাস্তি যার যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত শাহানা বানু বলত, ওরা তো ছোট, পারবে না। ওদেরটা আমিই এনে দিই। অন্যের শাস্তি প্রায় সারাজীবনই শাহানা বানু ভোগ করেছে। সে জন্য পড়াশোনায় মন বসাতে পারেনি।

শাহানা বানু পড়াশোনায় এতটাই খারাপ যে অঙ্ক না পারা, এমনকি দেখে দেখেও ইংরেজি লিখতে না পারা এবং প্রায় প্রতিদিন মন্টুর দেওয়া হোম টাস্ক করতে ভুলে যাওয়ার কারণে দু বালতি হিসেবে ছ বালতি পানি তাকে টানতেই হচ্ছে।

রেহানা বানুর শাস্তি প্রাপ্য হয় ভিন্ন কারণে : পয়সা চুরির অপরাধে ধরা পড়া, বইয়ের কয়েকটি পৃষ্ঠা না থাকার সন্তোষজনক কারণ দর্শাতে না পারা কিংবা চাঁদ সুলতানাকে অহেতুক কাঁদানো।

সেন্টু শাস্তি পায় মূলত মন্টুর কর্তৃত্ব না মানার কারণে। সেন্টু মনে করে, মন্টু যত বড়োই হোক না কেন, যেহেতু মন্টু স্কুলের শিক্ষক নয়, তাদের পড়াবার কোনো অধিকার তার নেই।

শাহানা বানুর একটি ব্যক্তিগত অসুবিধা রয়েছে, কথা বলে ইশারায়। সুবিধে এই যে তার ইশারা-ভাষা ভাইবোনেরা বোঝে এবং শাহানা বানু যেকোনো কঠিন বক্তব্য ছোটদের মতো করে সহজ ইশারায় বুঝিয়ে দিতে পারে। শাহানা বানু বোবা। কেবল বোবাই; বধিরও নয়, অন্ধও নয়।

শাহানা বানুকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে দেরিতে। পরীক্ষা দেয়নি কিংবা ফেল করেছে দু-একবার। সব মিলিয়ে সে যখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী তার বয়সীরা স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে কলেজে ঢুকতে যাচ্ছে। অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার সময় যখন চার বিষয়ে ফেল করল, খুশি মনেই স্কুল থেকে রিপোর্ট কার্ড নিয়ে ফিরে এল। কার্ডের উল্টোপিঠে লাল কালিতে লিখল :আমি আর স্কুলে যাব না। আমার পড়াশোনার এখানেই ইতি। ইতি শাহানা বানু।

বাবা বললেন, তা কী করে হয়? মেয়ে মাত্র ক্লাস সেভেন পাস। বিয়ের প্রস্তাবই আসবে না।

শাহানা একটা ভিন্ন কাগজে কালো কালিতে লিখল :মা তো ক্লাস ফোর পাস। বাবা বিএ পাস। সে হিসেবে আমার কমপক্ষে এমএ পাস পাত্র পাবার কথা। এরচেয়ে কম শিক্ষিত কোনো ছেলেকে আমি বিয়ে করব না। করবই না।

শাহানা ভাইবোনদের প্রাপ্য সকল শাস্তি নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়। তারপরও সময় কাটতে চায় না দেখে বাবাকে রাজি করিয়ে ঢাকা থেকে হাতে চালানো সিঙ্গার সেলাই মেশিন কিনে আনে এবং এক-দেড় মাসের মধ্যেই বাহিরগোলার বহু পরিবারের মেয়েদের পোশাক তৈরির আস্থাভাজন দর্জিতে পরিণত হয়। তখন আফসোস করে হাতমেশিন না কিনে পা-মেশিন কিনলেই ভালো হতো। শাহানার ব্যস্ততার শেষ নেই। যে ঘরের দেয়ালে মন্টু মামার ছবি সে ঘরেরই একটি ছোট খাটের ওপর বসে সেলাই করে চলেছে স্কুল ছেড়ে দেওয়া বাড়ির বড়ো মেয়েটি। এই ঘরের ভেতরের দরজা পেরিয়ে মন্টুর রুমে যেতে হয়।

আবদুস সামাদের এই ঘরের ভেতর দিয়ে তার বন্ধুর ঘরে যেতে হয়। এমনিতেই সেলাই করার সময় মাথা নিচের দিকে ঝুঁকে থাকে, আবদুস সামাদের আসা-যাওয়ার সময় শাহানা বানুর মাথা আরো নিচে নেমে আসে। তখন আর মুখটা দেখা যায় না। দৃশ্যটিই আবদুস সামাদের মনে গেঁথে যায়।

আবদুস সামাদ টেনেটুনে আইএ পাস করে সিরাজগঞ্জ কলেজে বিএ-তে নাম লেখায়। মন্টু ততদিনে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। আবদুস সামাদের পড়াশোনা আর ভালো লাগে না। কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে একটা কিছু তো করে খেতে হবে—সে পথটা নিজেই আবিষ্কার করে। স্টেশন রোডের রিকশা গ্যারেজে কাজ নেয়। মিস্ত্রির কাজ নয়, শিল্পীর কাজ। রিকশা মালিকদের পছন্দমতো রিকশার পেছনে বিভিন্ন ধরনের ছবি আঁকতে শুরু করে। হারানো সুর ছায়াছবিতে উত্তম কুমার-সুচিত্র সেন, যমুনার পালতোলা নৌকা কিংবা সিরাজগঞ্জ জগন্নাথ ঘাটের স্টিমার; অধিকাংশ মালিকেরই পছন্দ নায়ক-নায়িকার ছবি।

বোবা মেয়ের জন্য ভালো পাত্র জুটবে কোথায়, আবার রিকশা পেইন্টার ভালো পাত্রী পাবে কোথায় পাবে? এরকম পরিস্থিতিতে আবদুস সামাদ ও শাহানা বানুর বিয়ে হয়ে যায় কালো মেঘে আচ্ছন্ন সত্তরের নভেম্বরের এক রাতে। বিয়ের আয়োজন ছোট হলেও শহরের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মোতাহার মাস্টার এবং ডেপুটি সিভিল সার্জেন্ট এ বিয়েতে ছিলেন, তাদের কেউ শাহানাকে একটি টকটকে লাল শাড়ি উপহার দিয়েছিলেন।

খোলা মাঠে প্যান্ডেল বানিয়ে বিয়ের আয়োজন করা। সবার খাওয়া শেষ হতে না হতেই হঠাত্ একটি ঝড়ো হওয়া প্যান্ডেলের একাংশ উড়িয়ে নিল। নিম্নচাপের কারণেই হয়তো বিয়ের আনন্দটা চাপা পড়ে গিয়েছিল। তারিখটা সত্তরের ১২ নভেম্বর। সে রাতের জলোচ্ছ্বাসে উপকূলের জেলাগুলোর লক্ষ লক্ষ মানুষ ভেসে যায়।

একাত্তরের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে মন্টুর মনে হলো আবদুস সামাদকে তো রিকশা পেইন্টার হলে চলবে না, তাকে শিল্পী হতে হবে। মন্টু তাকে ঢাকায় নিয়ে এল, নিজের কাছে, ইকবাল হলে। মন্টু সামাদকে নিয়ে গেল আর্ট কলেজের প্রিন্সিপাল সাহেবের কাছে। সামাদের হাতে পেনসিল আর সাদা খাতা ছিলই। মন্টু যখন সামাদকে ভর্তি করে নেবার অনুরোধ করছে, সামাদ সে সময় হাতের ওপর খাতা রেখেই কয়েক টানে প্রিন্সিপাল স্যারের একটি ছবি এঁকে ফেলল।

নিজের ছবি দেখে স্যার বললেন, হাত দেখছি বেশ পাকা। বেশ, এই ছবিটার নিচের অংশটিতে ভর্তির একটি আবেদন করে ফেল। পুরো ঠিকানা দেবে। দেশের অবস্থাটা তেমন ভালো মনে হচ্ছে না। সব ঠিকঠাক থাকলে এপ্রিলের থার্ড উইকে সার্টিফিকেট, মার্কশিট, ছবি আর শ দেড়েক টাকা নিয়ে চলে এসো।

মার্চের প্রথম দিন থেকেই তো ঢাকা শহরে যেন গনগনে আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। আগুনটা স্বাধীনতার। সে আন্দোলনে কার কী ভূমিকা হবে কেউ ঠিক করে দেয়নি। আন্দোলন নিজেই নিজেকে বেগবান করতে মানুষের মেধা টেনে বের করেছে। আবদুস সামাদ রং-তুলি ছেড়ে মাথা তুলতে পারছে না। লিখে যাচ্ছে একের পর এক চোখ ঝলসানো পোস্টার—‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বত্ত’। কোত্থেকে আসছে পোস্টার পেপার, কে আনছে রং, কাজের মাঝে কে বাইরে যাচ্ছে, একটা পরোটা, খানিকটা বুন্দিয়া কে দিচ্ছে—কিছুই তার জানা নেই, কেউ তার পরিচিতজনও নয়; তবুও সবাইকে আপন মনে হচ্ছে।

হঠাত্ একবার মাথা উঠিয়ে এদিক ওদিক তাকায়, মনে হয় বোবা মেয়ে শাহানা তার পোস্টার লেখালেখির কাজটা দেখছে। পরক্ষণেই মনে হয়, সে তো সেই সিরাজগঞ্জে, বাহিরগোলা রোডে, হাতমেশিনে নিশ্চয় কারো জামা সেলাই করে চলেছে। মন্টু বরং মাঝে মাঝে সামাদকে ধমক লাগাচ্ছে, এসব করে সময় নষ্ট করছিস ক্যান?

সামাদ বলে, আর্ট কলেজে পড়তে হবে না? এখন একটু প্র্যাকটিস করছি। পঁচিশ তারিখ পোস্টার লিখল :‘সামারিক জান্তা হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। দুপুরের পর আর লিখতে ইচ্ছে করল না। কাউকে কিছু না বলে ছ-সাত ঘণ্টার ঢাকা শহর হেঁটে বেড়াল, মাঝখানে দু বার দু কাপ চা। একটু দেরিতে ঢোকার কারণে হলের খাবার পেল না। হলের ভেতর একটা থমথমে অবস্থা। ব্যস্ততার মধ্যে একজন অন্যজনের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ কিছু বলছে না।

দুই.

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কামানের গোলা যখন ইকবাল হলের দেয়াল বিদীর্ণ করে, আবদুস সামাদ বুঝেওনি কী ঘটছে। মন্টু বলল, বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছে।

মন্টু ঠিক কার বাড়াবাড়ির কথা বলল, পাকিস্তান সরকারের না পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির?

হলের মূলভবনের সামনে যারা লাশ হয়ে পড়েছিল মন্টু তাদের একজন। ঘটনাটা তো আবদুস সামাদের চোখের সামনেই। প্রথম দফায় দেয়ালঘেঁষে যাদের দাঁড় করানো হয়েছিল মন্টুদের সাথে সামাদও ছিল। আধো আলোতে মধ্যরাতে ব্রাশফায়ার শুরুর মুহূর্তেই কিংবা একটু আগে সামাদ অকস্মাত্ শরীরের ভার রাখতে না পেরে পড়ে গিয়েছিল। লাশের সাথে শুয়েই ছিল। নড়েনি। আক্রমণকারী বাহিনী কখন চলে গেছে বুঝতেও পারেনি। ভোরে যখন লাশ টানাটানি শুরু হয় আবদুস সামাদ উঠে দাঁড়ায়। একজন বিদেশি সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিল, হাউ ডিড ইউ সারভাইভ?

কথাটার মানে বুঝতে পারেনি। মন্টুর লাশ কে কোন দিকে নিয়ে গেছে অনুসরণ করে তা শনাক্ত করার মতো শক্তি তার ছিল না।

বাহিরগোলাতে খবর পৌঁছেছিল দুজনই মৃত। মেরে পেট্রোল ঢেলে সকলকে পুড়িয়ে ফেলেছে। কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। ২৭ মার্চ রাতেই সামাদ যমুনার ভুয়াপুর প্রান্তে পৌঁছায়। গভীর রাতে উন্মত্ত যুমনা পার হতে পারেনি। ২৮ মার্চ তাকে দেখে সবচেয়ে বেশি চমকে ওঠে শাহানা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলের বিস্ময় বিলীন হয়ে যায়—যেন সকলেই জিজ্ঞেস করছে, মন্টু মরেছে, তুমি মরলে না কেন? তুমি চালাকি করে নিজে বেঁচে গেলে কিন্তু মন্টুকে চালাকিটা শেখালে না কেন?

ভয়ংকর ভুতুড়ে অবস্থা সিরাজগঞ্জে। অবাঙালির সংখ্যা অঢেল। মন্টুর শয্যাশায়ী দাদি চিত্কার করে বিলাপ করলেন, মন্টুর আগে আমি কেন মরলাম না।

আবদুস সামাদ সান্ত্বনা দেবার জন্যই তার সামনে দাঁড়ায়। তিনি এতে আরো খেপে গিয়ে চিত্কার করে বলেন, অভাগা তুই মরলি না ক্যান? আমাকে তুই মন্টুর লাশ দেখা।

মন্টুর লাশ তুই কই লুকাইছিস?

আবদুস সামাদের অস্বস্তি বাড়তে থাকে। যার সাথে তার দেখা হয়, মনে হয় সে-ই তাকে জিজ্ঞেস করছে, একা ফিরলি ক্যান? মন্টু কোথায়? সবার চোখেমুখে প্রশ্ন। কারো চোহারাই বলে দেয়—মন্টুর ঘাতক তাহলে আবদুস সামাদ। একমাত্র ব্যতিক্রম শাহানা বানু। সে তার দিকে নির্বিকার তাকিয়ে থাকে। তার মনে কোনো প্রশ্ন নেই। তবুও সে আবদুস সামাদের আঁকা মন্টুর হাসিমুখ ছবিটার দিকে তাকায়। তারপর বোবা মেয়েটি অনেকদিন পর একটু করে কাগজ এবং একটি পেনসিল হাতে নিয়ে মোটা হরফে লেখে : আপনার আর ঢাকা যেতে হবে না। আবদুস সামাদ বলে, আচ্ছা।

তার প্রায় প্রতিদিনের দুঃস্বপ্ন লাশের স্তূপের মধ্যে শুয়ে আছে। একটি কি দুটি লাশের পরেই নিথর পড়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ক্লাসের ছাত্র ইকবাল হলের শহিদুজ্জামান মন্টু। আবদুস সামাদ যখনই মাথা তুলতে চেষ্টা করে তখনই মন্টু ঠোঁট নাড়ে। ফিসফিস করে, আমাকে ছেড়ে কোথায় যাচ্ছিস?

এলিয়ট ব্রিজের গোড়ায় লুত্ফর রহমান অরুণের সাথে দেখা। অরুণ বলে, আমার সাথে চল।

অনেকটা জোর করেই তাকে নিয়ে আসে এসডিও সাহেবের অফিসে, তার রুমে ঢুকতেই উস্কুখুস্কু চুলের মানুষটি বললেন, অরুণ, উল্লাপাড়া ব্রিজটা উড়িয়ে দিতে হবে। পাকিস্তানি আর্মিকে ব্রিজ ক্রস করতে দেওয়া যাবে না। অরুণ বলল, আচ্ছা।

একটু থেমে অরুণ আবার বলল, স্যার, আবদুস সামাদ পঁচিশ মার্চ ইকবাল হলে ছিল। বেঁচে গেছে।

এসডিও সাহেবের নাম শামসুদ্দিন। তিনি বললেন, শুধু বাঁচলে চলবে না।

তিনি এর বেশি আর কিছু বলেননি। অরুণ বলল, আর্মস দরকার। তিনি বললেন, ব্যবস্থা হবে।

সেদিনই আবদুস সামাদ তার স্ত্রীকে বলল, চললাম । ভালো থেকো।

তার আগে দৈনিক পাকিস্তান নামক খবরের কাগজে প্যাঁচানো একটি বাঁধানো ছবি দিল শাহানা বানুর হাতে। ফ্রেমটা কাঠের স্বাভাবিক রঙেরই, ভেতরে শাহানা বানু, কিন্তু মুখটা দেখা যাচ্ছে না। বাহিরগোলার বাড়ি আসা-যাওয়ার সময় সেলাই মেশিনের পেছনে বোবা মেয়েটিকে যেমন দেখেছে ঠিক তেমনই। ছবির নিচে বেশ স্পষ্ট করে লিখেছে :‘আবুদস সামাদ ১৯৭১’।

শাহানা তার নিজস্ব ভাষায় বলল, ছবিটা ভালো হয়নি। আমার মুখ কোথায়?

আবদুস সামাদ তার ভাষা বোঝে, বলল, যখন ছবিটা আমার মাথায় ঢোকে তুমি মাথা এতটাই নিচু করে রেখেছিলে মুখটা দেখতে পাইনি।

এখন তো মুখ দেখেছেন? তাহলে নতুন করে আঁকেন।

আঁকব। আগে কাজটা শেষ করে আসি।

কোন কাজটা?

ফিরে এসে বলব।

এই কথাটা শাহানা নিজের ভাষায় বলেনি। একটা ছোট কাগজে লিখেছে :আমাদের একটা বাবু হবে।

আবদুস সামাদ বিকট চিত্কার করে ওঠে, আমাদের বাবু হবে স্বাধীন দেশে।

কাঁধব্যাগটাতে একটা লুঙ্গি, একটা শার্ট, একটা বড়ো খাতা, পেনসিল, তুলি, ওয়াটার কালার ভরে একবার শাহানার দিকে, একবার মন্টুর ছবিটার দিকে তাকিয়ে আবদুস সামাদ যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, শাহানা বানু সেলাই করে পাওয়া পঞ্চাশটি টাকা তার শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে দেয়। আবদুস সামাদ দ্রুত পা ফেলে বাহিরগোলা সড়ক ধরে হাঁটতে থাকে। শাহানা বানু এমএ পাস করা বর চেয়েছিল। নিজেই নিজেকে প্রবোধ দেয় এমএ পাস কেউ কি এত ভালো ছবি আঁকতে পারবে?

দেরিতে হলেও আবদুস সামাদ জেনেছে এসডিও শামসুদ্দিন সাহেবকে পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। অরুণ, পাহাড়ি ও অন্যরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে চলছে।

২৭ নভেম্বর বেশ রাতের বেলায় মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি, বেশ লম্বা একটি ছেলে, নাম বলল আবু কায়সার, শাহানা বানু নামের একটি বোবা মেয়ের খোঁজ করল।

আবু কায়সার কথা বলছিল মন্টুর ভাই সেন্টুর সাথে। সেন্টু শাহানা বানুকে ডেকে আনল।

আবু কায়সার একবার তার দিকে তাকিয়ে তার হাতের চটের ব্যাগের ভেতর থেকে সামাদের কাঁধব্যাগটা বের করে তার হাতে দিল।

শাহানার নিজস্ব ভাষাটি যতই দুর্বোধ্য হোক ব্যাগ হাতে নিয়ে সে যে প্রশ্নটি করল তা স্পষ্টই শোনা গেল, তিনি এখন কোথায়?

আবু কায়সারের কাছে কোনো জবাব নেই।

ঘাগুটিয়া অপারেশনে গুলিবিদ্ধ হবার পরও আবদুস সামাদ অস্ত্র ছাড়েনি। সহযোদ্ধাদের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য একাই গুলি চালিয়েছে। এ টুকই খবর—রক্তাক্ত একজন মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের জিপে উঠিয়ে নিয়ে গেছে।

আবু কায়সার তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বাহিরগোলা সড়ক ধরে দ্রুত পা চালিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

তারপর শাহানা বানুর নিজস্ব ভাষাটিও লুপ্ত হয়ে যায়।

শাহানা আর কথা বলে না।

আবদুস সামাদের কাঁধব্যাগে ছিল তার ছবি আঁকার খাতা। দুটি পেনসিল, ব্যবহূত কিছু রং। চিঠিপত্র কিছুই ছিল না।

খাতায় একটি মাত্র ছবি, তাও অসম্পূর্ণ। ছবিটি শাহানা বানুর। এবার চেহারা সবটাই দেখা যাচ্ছে। তার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে ফ্রকপরা একটি মেয়ে। যেহেতু মাথা রেখেছে কাঁধে, চেহারাটা দেখা যাচ্ছে না। গোলাপি ও সাদা রঙের মিশ্রণ ফ্রকে, মেয়েটির কোমল পায়ের গোলাপি আভা। ফ্রকের ওপরের দিকটাতে রং লাগানো হয়নি। ছবি শেষ না হলেও নিচের দিকে স্পষ্টভাবেই লেখা আছে :আবদুস সামাদ ১৯৭১। আরশি গ্লাস হাউস থেকে এই ছবিটিও বাঁধানো হয়। সেন্টু বলেছিল, ছবিটি বাঁধানোর আগে অসমাপ্ত অংশ গোলাপি ও সাদায় ভরে দেবে। শাহানা বানু রাজি হয়নি।

আবদুস সামাদ মুখ ফুটে কখনো বলেনি :মেয়ের স্বপ্নই যে তার ছিল ছবিই তা বলে দেয়। ষোল ডিসেম্বর থেকে দেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের বয়স যখন এক মাস দশ দিন নির্বাক শাহানা বানু এবং শিল্পী আবদুস সামাদের একটি মেয়ে জন্ম নেয়।

শাহানা বিশ্বাস করে আবদুস সামাদ তার ব্যাগটা আগে পাঠিয়ে দিয়েছে। কাজটা শেষ করেই চলে আসবে। এই বিশ্বাস নিয়েই চল্লিশ বছরের বেশি সময় অনুসন্ধিত্সু দৃষ্টি শুধু মানুষের দিকে তাকিয়েছে—কোনজন আবদুস সামাদ। শেষদিকে চোখে ছানি পড়েছে। ছানি কাটানোর আগেই নির্বাক শাহানা বানু একদিন চোখ আর মেলেনি, হয়তো তার দেখার শক্তি নিঃশেষ হয়ে এসেছিল।

তিন.

আবদুস সামাদের মেয়ে বাংলাদেশের চেয়ে ছোট। গোলাপি ও সাদায় মেশানো ফ্রক পরেই মেয়েটি বড়ো হয়েছে। বাবার কথা যখনই মনে হয় এখনো গোলাপি শাড়ি পরে ।

নাহিদ আকতার যে বাপমরা মেয়ে ছোটবেলা থেকে এটাই তো শুনে আসছে, কিন্তু বিশ্বাস করেনি।

নাহিদ আকতার ঢাকার একটি স্কুলে পড়ায়। তার তিনটি ছেলেমেয়ে—মেয়ে দুই, ছেলে এক। তাদের কাছে নাহিদ মন্টু মামার কথা বলে, ইকবাল হলের শহিদুজ্জামান মন্টু। খুব ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম দিনই—২৫ মার্চ লাশ হয়ে গেল। সেই লাশ কোথায় যে গেল!

নাহিদ আকতার বাবার কথা তাদের বলে না। একদিন বুড়ো আবদুস সামাদকে ধরে এনে সবার সামনে হাজির করিয়ে বড়ো একটা সারপ্রাইজ দেবে। বাবাকে কোথায় পাবে সে-ই জানে। প্রায় তিরিশ বছর ধরে নাহিদ রিকশার পেছনে আঁকা ছবি দেখে বেড়াচ্ছে। যে ছবিগুলো তার ভালো লাগে সাথে সাথে নিশ্চিত হয়ে যায় এগুলো তো বাবার আঁকা। স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় একটু খারাপ রেজাল্ট করলে কী হবে ছবি আঁকায় তার বাবাকে কে হারাবে? নাহিদ ঢাকা শহরের বড়ো-ছোট সব রিকশা গ্যারেজে ঢুঁ মারছে। একজন একজন করে রিকশা পেইন্টারকে খুঁজে বের করে, মেলে না। আবদুস সামাদের একটি মাত্র কিছুটা বিবর্ণ পাসপোর্ট সাইজের ছবি ছিল শাহানা বানুর হাতে। নাহিদ আকতার এই ছবিটাকে বড়ো করায়, পাসপোর্ট সাইজের অনেকগুলো কপি করায়। ছবির উল্টোপিঠে সুন্দর করে লেখে শিল্পী আবদুস সামাদ। নিচে লেখে :মেয়ের নাম নাহিদ আকতার। ৮৯/৫ পূর্ব রাজাবাজার, তেজগাঁও, ঢাকা ১২১৫। ফোন নম্বরও দেয়।

বাবার ছবিটা গ্যারেজ মালিক কিংবা শিল্পীর হাতে দিয়ে বলে :যদি দেখা হয়, ফোন করবেন। বলবেন, নাহিদ আকতার তার বাবার জন্য কষ্ট পাচ্ছে।

পোস্তগোলার এক গ্যারেজ মালিক জিজ্ঞেস করে, কহন থেইক্কা বাপের লগে দেহা নাই?

নাহিদ আকতার বলে, নাইনটিন সেভেন্টিওয়ান।

গ্যারেজ মালিক বলে, এত বছরে মইরা ভূত হইয়া গেছে।

নাহিদ আকতার বলে, ইমপসিবল।

গ্যারেজ মালিক চোখ পিটপিট করে বলে, মাইয়া মানুষ পাগল হয়া গেছে।

নাহিদ আকতার হাসে।

মানুষ এত মূর্খও হয়?

বাপ আবার মরে নাকি! বাবা কখনো মরতে পারে না।

ডেমরায় এক রিকশা গ্যারেজে পেইন্টিং-এর কাজ চলছে শুনে নাহিদ আকতার পোস্তগোলা তেমাথা থেকে ডেমরার বাস ধরে। সেখানে থাকতে পারে। নতুবা অন্য কোথাও।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০২ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন