ঢাকা শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
৩০ °সে


সূর্যোদয়ের আগে

সূর্যোদয়ের আগে

নেহা রুমি যখন প্রথমবার ধর্ষণের শিকার হয়, তখন তার বয়স ১২ বছর। নেহা বিখ্যাত মডেল ও নর্তকী। তার নিপুণ ও অবাধ স্টাইল সারা আরব জাহানে পরিচিত। তার প্রদর্শনী দর্শকের গভীর গোপন অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। তার প্রদর্শনী উপভোগ করার সময় এটা বলা বেশ কঠিন যে এই মেয়েটি শৈশবে ধর্ষিত।

আমি নেহাকে অনেক বছর ধরে দূর থেকে চিনি। আমি তাকে আরব টিভিতে নাচতে দেখেছি। কিন্তু আমার বন্ধু আবদুল্লাহ অত্যন্ত খ্যাতিমান একটি আরবীয় নাইট ক্লাবে আমাকে নেওয়ার আগে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। সেদিন ছিল নেহার নাচ।

আমরা দুজন এক ছোট টেবিল খুঁজে বের করলাম। আবদুল্লাহ বলল, ‘আমি আজ তোমাকে এমন কিছু বলব, শুনেই তোমার গল্প লিখতে ইচ্ছে করবে।’

সে জানত, আমি লিখি। আমিও জানি সে ভালো গল্প কথক। সে-ই বলল, আমি শুনতে থাকলাম। একটা গ্লাস ভর্তি করে আমার দিকে এগিয়ে দিল।

আস্তে আস্তে শুরু করল।

‘পাকিস্তানে ধর্ষণ খুব সাধারণ ব্যাপার।’

‘এটা আর নতুন কী?’ আমি বললাম, ‘সব দেশেই অশুভ রাজত্ব রয়েছে। কেউ নিরীহ-নিষ্পাপ মানুষের ওপর বোমা ফেলছে, কেউ মেয়েদের ধর্ষণ করছে। তার চেয়ে বড়ো কথা আমরা যখন আমাদের পিতৃভূমির কথা বলতে গিয়ে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বাক্য বর্ষণ করছি, তখন তো আমাদের নেতারা গোটা দেশকেই ধর্ষণ করে চলেছে। চলো দোস্ত, আগে পান করে নিই, আমাদের ওসব যন্ত্রণাদায়ক প্রার্থনার কথা ভুলে যাই।’

আমি খেপার মতো কথাগুলো বললাম, দরিদ্র ও ধর্ষিত মেয়েদের ব্যাপারে আমার নির্লিপ্ততা বেরিয়ে এল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে সূর্যের দিকে তাকালাম, সোনালি বলটা ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে এবং ভ্রুতলায় বন্ধ হওয়া সমুদ্র চোখের পাতার তলায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

আবদুল্লাহ কী বলেছে আমি তা শুনিনি অথবা দেশে কী হচ্ছে-না হচ্ছে তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, এটা ভেবে কণ্ঠে ক্রোধ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি এইমাত্র যা বলেছি, তা কি শুনেছ?’ শব্দ করে হাতের গ্লাসটা রাখল, এটা তার বিরক্তির প্রকাশ।

‘হ্যাঁ, আমি শুনেছি, বলে যাও। আমি শুনছি।’

আবদুল্লাহ এক লহমার জন্য আমার দিকে তাকাল। শেষ পর্যন্ত বলতে শুরু করল, ‘নেহা পাকিস্তানি মেয়ে। অনেক অল্প বয়সে বাড়ি ছেড়েছে। তাকে গণিকালয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল আর তাকে বহু ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে।’

আবদুল্লাহ জানালার দিকে হেঁটে এল, দুই হাত পকেটে, যেন চিন্তামগ্ন। এখানটাতেই আমি দাঁড়িয়েছিলাম। তারপর উল্টে আমার দিকে পিঠ দিয়ে এগোতে থাকল। যেভাবে সে টেবিলের কাছে গেল, তার হাঁটা দেখেই আমি বলতে পারি কিছু একটা গণ্ডগোল অবশ্যই ঘটেছে।

আমি ভ্রুকুটি করলাম। ‘এসব বিপদের কথা মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়ে থাকে। আর একটা সুন্দরী মেয়ে যখন বাড়ি ছেড়ে পালায়, সে তার সৌন্দর্যের সুযোগগুলো নিয়েই থাকে।’

আমার এই নির্লিপ্ততার জন্য আমার কোনো অনুশোচনা নেই। যা-ই হোক, আমি দেখলাম এটা তো আমার একটা সুযোগ। সম্ভবত যে নিষ্ঠুরতার কাহিনি আবদুল্লাহ আমাকে শোনাতে চাচ্ছে, তা দিয়ে আমি হয়তো একটা ভালো গল্প ফাঁদতে পারব, যে গল্পটি হয়তো আমার লেখক খ্যাতিকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। ব্যান্ড তখন নিশ্চয়ই ‘ম্যাঙ্গোনিয়া গার্লস’ থিম সঙ বাজাচ্ছে, আমার ভুল হতে পারে না। আমার হাতের গ্লাস ঠুন করে আবদুল্লাহর গ্লাসের সঙ্গে টোকা দিয়ে বললাম, ‘গল্পটা চালিয়ে যাও।’

সুরের প্রতিধ্বনি যখন বারে ধ্বনিত হচ্ছে, আবদুল্লাহ আবার শুরু করে, ‘নেহা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে কারণ তার বাবা তাকে ধর্ষণ করেছে।’

আমি অবিশ্বাসের নিঃশ্ব্বাস ফেললাম।

আবদুল্লাহ বলল, ‘বিশ্বাস করো বন্ধু, বাস্তবতা সবসময়ই অদ্ভুত। আরো নিবিড়ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি কি বাকিটা বলব?’ কী বলব, আমি নিশ্চিত নই। আবদুল্লাহ আর আমি কলেজজীবন থেকে বন্ধু, সে কখনো মিথ্যে বলেছে, আমার জানা নেই। কিন্তু এটা এমনই তিক্ত সত্য যে বিশ্বাস করা কষ্টকর।

কিন্তু তার বাবা কেন? এ কেমন ভয়ংকর সত্য! আমি হাত দিয়ে মুখ ঢাকলাম, আমার হূদয় বেরিয়ে এল। আবদুল্লাহ আবার গ্লাস ভরল। ‘তোমাকে দেব আর একটা’ আমাকে সাধল।

‘না, আমাকে কেবল নেহার ব্যাপারটা বলো।’

আবদুল্লাহ শুরু করল, নেহার যখন জন্ম আমার বয়স তখন বিশের ঘরে। নেহা ফাতেমা দাইয়ের মেয়ে।

দাইরা ছেলেসন্তান হলে কিংবা বিয়েশাদিতে গান গেয়ে জীবনযাপন করে। এই মহিলাদের কাজ অন্যের বিনোদনের ব্যবস্থা করা। তারা মানুষকে হাসায়, বাচ্চাদের খুশি করে। প্রেমিকেরা তাদের মাধ্যমে প্রেমিকার কাছে চিঠি পাঠায়, বয়স্করা তাদেরই উপভোগ করে। এরা পেশাদার বিনোদনকারী। তাদের বেঁচে থাকা অন্য মানুষের সুখ ও আনন্দের ওপর—তাদেরটার কথা অবশ্য কেউ ভাবে না। আমার বয়স যখন ১৭, আমি পুুরুষ হয়ে উঠেছি, যৌনবাসনা চরিতার্থ করার ঝড়ো আকাঙ্ক্ষা আমার জেগে উঠেছে—সে সময় আমার এক বন্ধু ফাতিমা সম্পর্কে একটা গোপন কথা আমাকে জানায়। সে আমাকে ‘খাবার সময়’ কথাটি শোনায়—এ সময় তরুণ ছেলেরা যৌনতার প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে।

নিজের খাবার সময় হয়েছে বুঝতে পেরে খাবার জন্য নির্ধারিত ফি পাঁচ টাকা চুরি করি আমার দাদির পুরনো বাক্স থেকে। তারপর অন্ধকারে হেঁটে হেঁটে ফাতিমার কুটিরে। আমি যখন তার নোংরা মাটির ঘরের দরজায় টোকা দিই, আমার হাত কাঁপছিল।

ফাতিমা বের হয়ে বাইরে আসে; তার চোখে অদ্ভুত এক চাহনি।

জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার মা কি ভালো আছে?’

‘আমি আমার মায়ের জন্য এখানে আসিনি। আমি এসেছি...’ বলে আমি থেমে গেলাম।

‘ভয়ের কিছু নেই। এই অন্ধকারে এখানে কেন এসেছ বলো, খোলাখুলি বলো।’

‘আমি, আমি...’ আমি তোতলাতে থাকি।

আমাকে অবাক করা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল ফাতিমা।

হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে দিয়ে তুমি কী করবে?’

আমিও হাসতে শুরু করি, আমার ভয় গলতে থাকে।

‘হ্যাঁ ফাতি, আমার এখন খাবার সময়, তোমার কাছে খেতে এসেছি।’

ফাতিমা আমার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেল।

তখনই জিজ্ঞেস করল, ‘আমার ফি কোথায়?’

আমি তার হাতে পাঁচ রুপি দিলাম।

আবদুল্লাহ একটু দম নিল। আমার সঙ্গে আর চোখাচোখি হয়নি।

আমার তখন খুব জানার আগ্রহ, ফাতিমা কী করল?

যখন সে জানেই যে আমি একেবারেই অনভিজ্ঞ, যা যা করার সেই করল।

আমি জিজ্ঞেস করি, ‘তোমার পয়সা উসুল হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করে আমি আবদুল্লাহর দিকে তাকাই, শুনতে চাই, তার আর কী বলার আছে।

উসুল হয়েছে কি না আমি ঠিক নিশ্চিত নই। ফাতিমার শরীরে ও মুখে একটা অসহ্য গন্ধ, অনেকটা মরা জন্তুর গন্ধের মতো। আমি সেই কাঁচা বয়সেই একটা ব্যাপার বুঝতে পেরেছিলাম—সেক্স হতে হবে সুমিষ্ট ও শান্ত স্নিগ্ধ, বীভত্স ও বিরক্তিকর কিছু নয়। এটাই শেষ নয়। আরো ভয়ংকর কথা বলল তারপর, ‘যা এক্ষুনি পালা।’

ভালোবাসা কিংবা সহূদয়তা নয়। কেবল পালিয়ে যেতে বলল? স্বর নামিয়ে আবদুল্লাহ বলল, ঠিক তা-ই বলেছে। হতবুদ্ধি হয়ে আমি তখন জিজ্ঞেস করি, ‘কিন্তু আমি পালাব কেন?’

আবদুল্লাহর আর একটু কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করি, ‘তখন সে কী বলল?’ তার জবাবই আমাকে বিপর্যস্ত করে তুলল।

আবদুল্লাহ টেবিলে ফিরে এল, বসল, টেবিল ক্লথটা পরীক্ষা করল। তারপর মুখ খুলল। পালাতে হবে কারণ এখন তোমার বাবার খাবার সময়। তোমার মা তো পোয়াতি। তোমার বাবার আসার সময় হয়ে গেছে।

আমার মনে হলো কেউ আমার ওপর একটা বোমা ছুড়ে মেরেছে। আমি দৌড়াতে থাকলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে একটা কবরস্থানে এসে থামলাম। আমি একজন বুজুর্গের কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদলাম। এরপর অনেক বছর আমার সেক্স আচরণ ছিল অস্বাভাবিক ধরনের—অসংবেদনশীল ও নোংরা পরিস্থিতিতে আমার যৌন পরিচিতিই এর কারণ।

এক বছর পর ফাতিমা পুরুষ দাই গুলামিকে বিয়ে করে। তার আর ফাতিমার সামাজিক মর্যাদা একই। আরো এক বছর পর নেহার জন্ম হয়। এ রকম একটা কুিসত পিতা-মাতার ঘরে এরকম সুন্দর একটা মেয়ে হবে ভাবাও যায় না।

বেচারার দুর্ভাগ্য, সে সময় পাকিস্তান-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা থাকায় এবং গুলামি ওপারের হওয়ায় ভারতীয় সেনাবাহিনী জোর করে তাকে সৈন্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। তা-ই হয়, আর্মি আসে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, তখন গরিব-দুঃখী মানুষদের জোর করে সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে দেয়। লেখক, তুমি তো জানোই, গরিব মানুষ জন্মসূত্রেই হতভাগা।

ইন্ডিয়ান আর্মি তাকে ১০ বছর জোর করে সেনাবাহিনীতে আটকে রাখে। গুলামি যখন ফিরে আসে তখন সে আর আগের মানুষ নেই, ভিন্ন মানুষ। সাদা লম্বা দাড়ি, কঙ্কালের মতো শরীর, ১০০ বছর বয়সী বুড়োর মতো দেখতে—দেখে চেনার মতো নয়।

আবদুল্লাহ বলে চলেছে, ‘এই বাবাই নেহাকে ধর্ষণ করে?’

আমার বন্ধুর কাছ থেকে চোখ সরিয়ে আনি। আমি, জন্মগতভাবে লেখক, গল্পটা বলার জন্য কেন তাকে ধরেছিলাম সেজন্য এখন অনুতাপ হচ্ছে।

আবদুল্লাহ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বলল, ‘সেইসব দিনগুলোতে কোরান শিক্ষার জন্য নেহা নিয়মিত যেখানে যেত। মাথা বরাবরই নেকাব ঢাকা থাকত। সেখানেই নেহার সঙ্গে গুলামির দেখা। যখন তাকে জোর করে নিয়ে যায়, মেয়েটির বয়স দুই বছর। এখন বারো। গুলামি তাকে চেনেনি। তার অনেক স্মৃতি লোপ পেয়েছে—তার যে একটা মেয়ে ছিল, এটাও হয়তো এখন স্মৃতিতে নেই।’

তবুও—

আবদুল্লাহ গল্পটা ছাড়েনি। নেহার কান্না গ্রামের পাষাণ হূদয় মানুষগুলোর চোখেও অশ্রু ঝরিয়েছে। আমি নিশ্চিত, স্বর্গে বসে আল্লাহও কেঁদেছেন। গুলামি যখন তার হাতে ধর্ষিত মেয়েটির পরিচয় জানল, সেও তখন দিশেহারা, অনুতাপে জর্জরিত। গুলামি একসময় শূন্য পর্বতের দিকে যেতে যেতে দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। গুলামি হারিয়ে যায়। আর কখনো তাকে দেখা যায়নি।

‘আমার জীবন বেশ চলে যাচ্ছিল। আমি এসব ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু একদিন ড্যান্স ক্লাবে নেহাকে দেখে আমার সব মনে পড়ল। এখন তুমিও নেহাকে দেখবে।’

যখন ঘোষক নেহার উপস্থিতির ঘোষণা দিল, আবদুল্লাহর চোখে অশ্রু। বলল, দেখ, মেয়েটি এখনো কত সুন্দর!

নেহার নিপুণ নাচ দেখে আমি বিস্মিত। তার প্রতিটি পদক্ষেপ জীবনের নিঃশ্বাস ধরে রাখে। তার সূক্ষ্ম ও অবাধ অঙ্গসঞ্চালন দর্শকদের আবেগও চড়িয়ে দিয়েছে। তার স্টাইলে অবলীলায় মিশে গেছে শিল্প ও সৌন্দর্য—তার নাচে স্বর্গের আশ্বাস ও আনন্দের নিশ্চয়তা। বিস্ময়কর এই মেয়েটি। তার চোখে উদ্ভাসিত প্রত্যাশা ও মুগ্ধতার অনুভব। আমার মন ফিরে যায় মেয়েটি যখন ধর্ষিত হয় সেই সময়ে।

নেহাকে দেখার জন্য বারে যাওয়ার পথে আবদুল্লাহর মনে হয় মেয়েটি আজ গতরাতের মতো নাচতে পারবে তো? তার সংশয় দূর করে তার আত্মাকে জয় করে নেয় এই বিস্ময় বালিকা।

প্রদর্শনীর পর আবদুল্লাহ আমাকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বলে, ‘আমার বন্ধু একজন লেখক। তার অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি হূদয় আছে, আর আছে জীবন ও শিল্পের জন্য ভালোবাসা।’

আমার বন্ধু আবদুল্লাহ আমার যে ভালোবাসার সুখ্যাতি করেছে তা কি আমার অর্থ ও খ্যাতির লোভের চেয়েও বেশি? আমি ভাবি। উঁচু স্বরেই বললাম, ‘আমরা দুজন যদিও দুই ভিন্ন পরিবেশ থেকে এসেছি, মনে হয় আমি তোমাকে চিনি। আমাদের কীভাবে চেনাজানা হয়ে থাকতে পারে?’

একটি সলাজ হাসি ধীরে ধীরে তার মুখে উঠে আসে। আমরা দরজা পথে বেরিয়ে যাচ্ছি—হাসিটা থেকেই যায়।

সেই হাসিটা তখনো আছে। নেহা বলল, ‘তুমি আমাকে নিয়ে গল্প লিখতে চাও?’

আমি জবাব দেইনি। তার জীবনের নিষ্ঠুর কাহিনির ওপর ভর দিয়ে আমি আমার স্ট্যাটাস বাড়াতে যাচ্ছি—আমার এই ইচ্ছেটা কি কেবল তাকেই ছোট করে, না আমাকেও? প্রশ্নটা মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে।

নেহা নুয়ে একটা পাথর কুড়িয়ে নেয়। তারপর অন্ধকার ঢেউয়ের দিকে নিক্ষেপ করে।

নেহা বলল, ‘তোমরা কী রকম মানুষ বলো তো? তোমরা অন্য মানুষের দুর্ভোগ ও যাতনা বেচে নিজেদের জন্য যশ কামাই করছ। তারপর তোমরা মরে যাও আর তোমাদের করুণ জীবন নিয়ে গল্প লিখে অন্য লেখকেরা। আগে তোমরা অন্যের জীবন নিয়ে বলো, তারপর অন্যেরা তোমাদের জীবন নিয়ে। নিজেদের পরিচিত করানোর কী আহাম্মকি অভিলাষ! আমি বহু বছর আগে শিখেছি আমাদের অত্যন্ত নীরবে এ জীবন থেকে সরে যেতে হবে। মনে রেখো, সব রাস্তারই সমাপ্তি অন্ধকার কবরখানা।’

মৃত্যু নিয়ে তার কথোপকথন আমাকে মুগ্ধ করে, আমাকে আতঙ্কিত করে, আমাকে হতবুদ্ধি করে। আমার লাভের জন্য তাকে খুঁড়ে খুঁড়ে আবিষ্কার করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। এতদিন যারা তাকে নির্মমভাবে শোষণ করেছে, আমি সেই জনগোষ্ঠীর কথা মনে করি—আমি সেই দলে যোগ দিতে চাই না।

এতকিছু সে সহ্য করল কেমন করে? আমি অবাক হই। তার মুখে হাসি, কিন্তু আমি জানি এই হাসির অন্তরালে তার হূদয় যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।

নেহা আমার চোখের দিকে তাকায়, অত্যন্ত সংবেদনশীল স্বরে জিজ্ঞেস করে, ‘সারাক্ষণ চলমান বালুর শব্দ তুমি কি শুনতে পাও? খাড়া পাহাড়ে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ কি তোমার কানে পৌঁছায়?’

একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আস্তে আস্তে আবারও জিজ্ঞেস করল, ‘ঝোড়ো রাতে সিক্ত রাস্তায় তুমি কি পদধ্বনি শুনতে পাও? বিশাল মরুভূমিতে তুমি কি পর্যটকের গান শুনতে পাও? তুমি কি শরতে পাতা ঝরার করুণ সংগীত শুনতে পাও? তুমি কি...।’

আমি তাকে থামিয়ে দিই, বলি, হ্যাঁ, তুমি তো আমার মতোই, অন্তরে কেবল একটি শিশু, এমনকি এই বাণিজ্যিক সমাজেও যেখানে অনুভূতিগুলোও পণ্য ছাড়া কিছুই না। তুমি প্রকৃতি ও শিল্পকে ভালোবাস।

আমার অন্তরে এমন অনুভূতি জেগে উঠছে, আমি কখনো ভাবিনি আমার হূদয় তা ধারণ করে রাখতে পারবে। আমি সবকিছু থেকে যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি—সে সময় সম্পূর্ণ বিস্মৃত একজন মানুষ।

ঢেউ বালুর ওপর একটি মাছ ঠেলে দিয়েছে। নেহার চোখে পড়েছে। সে দৌড়ে গিয়ে এই অসহায় জীবটিকে আবার পানিতে নিক্ষেপ করে।

নেহা বলে, ‘আমরা মাছের মতোই। আমরাও মাছের মতোই এভাবে ছিটকে পানির বাইরে চলে আসি, কেউ একজন হয়তো মৃত্যুর মতোই আবার পানিতে ছুড়ে ফেলে। পৃথিবীতে আমরা আসলেই এ রকম পানির বাইরে চলে আসা মাছের মতো—মৃত্যু আমাদের জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সত্যি বলতে কি, জীবনের আসল নাম মৃত্যু। আর বাকি সব বালু। আমাদের ইচ্ছে ও স্বপ্নগুলো আসলে বালুর জন্য ভালোবাসা।’

আমার হূদস্পন্দন আরো বেড়ে গেল। মনে হচ্ছে, নেহা আমার ওপর অদ্ভুত একটি ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। সে আমার মন, আমার অনুভূতি এবং জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে। আমরা হাত ধরাধরি করে সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর দৃষ্টি রেখে সৈকত ধরে হেঁটেছি। আমরা আর কথা বলিনি।

আমার মধ্যে এক মোহনীয় হতবুদ্ধিদশা গড়ে উঠতে থাকে। আমার পুরুষসত্তা তার সান্নিধ্যের আকাঙ্ক্ষায় আকুল হয়ে ওঠে। আমার এই আতঙ্কজনক ও বন্য আকাঙ্ক্ষা আমাকে কিছু সময় বিমোহিত করে রাখল। হঠাত্ আমার মনে হলো, আমি এসবের কিছুই চাই না—তাকে চিরদিনের জন্য ভালোবাসতে চাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো চাওয়া নেই।

আমরা থেমে পরস্পরের দিকে তাকালাম। অতি প্রত্যুষের আলোছায়ায় আমি দেখলাম তার চোখ জ্বলজ্বল করছে—যেন সে আমার নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি কবুল করে নিয়েছে। তার মুখ আমার হাতে তুলে নিই। আত্মসমর্পণে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, আমি দু চোখে কোমল চুম্বন এঁকে দিই। আমার হূদয় আনন্দে নেচে ওঠে।

আমি ফিসফিস করে বলি, তুমি কত সুন্দর!

তারপর হঠাত্ নেহার আচরণে একটা পরিবর্তন লক্ষ করি—সে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। নিজেকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে উদীয়মান সূর্য দেখছে।

কোমলকণ্ঠে বলল, কিন্তু এই সৌন্দর্য তো পশুদের জন্য।

তারপর নেহা চলে গেল।

আমি সময়ের বালুকাবেলায় একাই দাঁড়িয়ে আছি—অপেক্ষা করছি, কেউ একজন এসে আমাকে পানিতে ছুড়ে দেবে।

লেখক :কানাডায় বসবাসরত পাকিস্তান বংশোদ্ভূত ও ঔপন্যাসিক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৫ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন