ঢাকা শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
৩১ °সে


হুমায়ূন আহমেদ এবং স্ট্যাচু অব লিবার্টি

হুমায়ূন আহমেদ এবং স্ট্যাচু অব লিবার্টি
হুমায়ূন আহমেদ, ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮—১৯ জুলাই ২০১২ আলোকচিত্র :নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম,

ইস্ট রিভারের ওপর দিয়ে গাড়ি চলছে। কুইন্সবোরো ব্রিজ থেকে ম্যানহাটনের অপূর্ব স্কাইলাইন দেখে আমি মুগ্ধ। আমেরিকার ঐশ্বর্যের এক বড়ো নিদর্শন এই ম্যানহাটন। এই ঐশ্বর্যের ভিড়ে সুদূর প্রাচ্যদেশের একজন লেখককে নিয়ে আমরা যাচ্ছি স্লোন কেটারিং হাসপাতালে। হুমায়ূন আহমেদের চোখে আমার মতো বিস্ময় নেই, আছে বিরক্তি।

তিনি মাজহার ভাইকে বললেন—মাজহার, বাংলাদেশে ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারের ব্যাপারটা আমি কিন্তু ফাইনাল করে ফেলেছি। চিকিত্সার জন্য এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে অযথা কষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তুমি চিন্তা করে দেখ, দেশে সমস্ত কাজ-কর্ম আত্মীয়-স্বজন ফেলে হাজার হাজার মাইল দূরে আমরা কেন আসব? এখানে এসে বাড়ি ভাড়া করা, সংসার সাজানো কী পরিমাণ ঝামেলা তুমি ভেবে দেখেছ?

... এখন আমার পরিকল্পনাটা শোন, তিনজন ভিক্ষুকের কাছ থেকে প্রথমে ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারের জন্যে অর্থ ভিক্ষা নেওয়া হবে। এদের ছবি তুলবেন নাসির আলী মামুন। স্কেচ করবেন ও ইন্টারভিউ নেবে মাসুক হেলাল। তারপর আমরা যাব বাংলাদেশের তিন শীর্ষ ধনী মানুষের কাছে। ভিক্ষুকরা দান করেছে শুনে তারা লজ্জায় পড়ে কী করেন আমার দেখার ইচ্ছা।

... শীর্ষ ধনীর পর আমরা যাব তিন রাজনীতিবিদের কাছে। তারা কিছুই দেবেন না আমরা তা জানি। তারা কেবল নিতে জানেন, দিতে জানেন না। তবে আমার ধারণা খালি হাতে তারা আমাদের ফেরাবেন না, অনেকগুলো উপদেশ দেবেন। আমাদের উপদেশেরও প্রয়োজন আছে কি বলো?

আমি জিজ্ঞেস করলাম—তিন সংখ্যাটা কেন স্যার, তিনজন ভিক্ষুক, তিনজন ধনী আর তিনজন রাজনীতিবিদ?

হুমায়ূন আহমেদ বললেন—শোন, পিথাগোরাসের মতে তিন হচ্ছে সবচেয়ে রহস্যময় সংখ্যা। এটি একটি প্রাইম নাম্বার। তিন হচ্ছে ত্রিকাল—অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত্। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল। তিন হল ট্রিনিটি। তিন মানে আমি, তুমি ও সে।

হাসপাতালে স্যার ব্লাড দেবার পর আমরা সবাই মিলে নাস্তা সেরে লবিতে অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন ডাক্তার আমাদের ডাকবে। এখানে পেশেন্টরা সবাই প্রায় একা। শিশু ছাড়া কারো সঙ্গে কোনো অ্যাটেন্ডেন্স নেই। এখানকার চিকিত্সা সংস্কৃতি মনে হয় এ রকমই—যার যার রোগের বোঝা তাকেই বয়ে বেড়াতে হয়। শাওন ভাবী, মাজহারুল ইসলাম আর আমি—আমরা তিনজন ঘিরে আছি হুমায়ূন আহমেদকে।

কিছুক্ষণ পর স্যারের ডাক পড়ল। আমরা ডাক্তার স্টিভেন আর ভিচের রুমে গেলাম। স্যারকে দেখে খুবই আন্তরিক ভঙ্গিতে ডাক্তার ভিচ বললেন—হ্যালো মি. আহমেদ, ইউ আর ডুয়িং ভেরি ওয়েল। তোমার কেমো কাজ করতে শুরু করেছে, ব্লাড কাউন্ট নিচে নামছে। এটা খুবই সুখের খবর। তুমি কি শেষ পর্যন্ত সিগারেট ছাড়তে পেরেছ?

স্যার বললেন—আমার ছোট ছেলেটির কথা ভেবে আমার ৩৭ বছরের বন্ধু সিগারেটকে আমি এককথায় বিদায় দিয়েছি।

বাহ্, ভেরি গুড। কিন্তু অন্যের সিগারেট টানা দেখলে তোমার খারাপ লাগে না?

না, বরং উল্টোটা হয়—কাউকে সিগারেট টানতে দেখলে ভালো লাগে। আমাদের বাড়ির সামনে একটা ছোট গ্রসারি শপ আছে, সেখানে চা, কফি পাওয়া যায়। যখন কাউকে দেখি কফির মগ নিয়ে বাইরে এসে সিগারেট টানছে তখন খুবই ভালো লাগে।

ভেরি গুড, এ রকমটা সবাই পারে না। তুমি নিশ্চয়ই আমেরিকান লেখক মার্ক টোয়েনের সিগারেটের গল্পটা জানো?

স্যার বললেন—হ্যাঁ আমি জানি। মার্ক টোয়েন এক সান্ধ্য আড্ডায় তার বন্ধুদের বলছেন—অনেকেই বলে সিগারেট ছাড়া কঠিন ব্যাপার। আমি তাদের কথা শুনে অবাক হই। সিগারেট ছাড়া কঠিন কোনো কর্ম না। আমি ১৫৭ বার সিগারেট ছেড়েছি।

হুমায়ূন আহমেদের রসিকতায় ডা. ভিচ হা হা করে হেসে ওঠেন। হাসি থামতেই স্যার ভিচকে বললেন, আমার একটা প্রশ্ন ছিল।

ডা. সাগ্রহে বললেন—বলো, কী তোমার প্রশ্ন?

তোমরা থাকতে, স্লোন ক্যাটারিং থাকতে স্টিভ জবস কেন মারা গেলেন?

প্রশ্ন শুনে ডা. ভিচের হাসি মিলিয়ে গেল। গম্ভীর মুখ করে তিনি বললেন—প্রথমত স্টিভ জবস আমাদের স্লোন ক্যাটারিংয়ে চিকিত্সা নেননি। দুর্দান্ত মুডি মানুষ হিসেবে ক্যানসারের শুরুতেই তিনি চিকিত্সা করাননি, অপারেশনেও রাজি হননি। যখন রাজি হলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার অনকোলজিস্টরা অ্যাগ্রেসিভ ট্রিটমেন্টে গেছেন। তার ওপর স্টিভ জবসের পুরো লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়েছে। নানারকম কমপ্লিকেশনও ছিল। আসলে ক্যানসার ট্রিটমেন্ট হলো ইনডিভিজুয়াল, প্রত্যেকের আলাদা রিএকশন এবং রেসপন্সের ওপর নির্ভর করে চিকিত্সা করতে হয়। আমার মনে হয় আমি তোমাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি।

স্যারের চিকিত্সার অগ্রগতি দেখে আমরা বেশ আনান্দিত। এ উপলক্ষে কাল আমরা ব্যাটারি পার্কে বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করলাম। সেখানে হবে জম্পেশ আড্ডা আর ডিনার। স্যার বললেন, ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে ডিনারের বদলে লাঞ্চ করলে কেমন হয়?

স্যারের পরামর্শে ডিনারের বদলে ঠিক হলো আমরা ‘ব্যাটারি গার্ডেন রেস্টুরেন্টে’ দুপুরে লাঞ্চ করব, তারপর পার্কে বেড়ানো। আমাদের লিফট দেবেন গাজি কাশেম।

পরদিন সকালে ঝলমলে রোদ দেখে আমরা বেশ পুলকিত হলাম। আজকের নাস্তার মেনু হলো ‘ছিটা পিঠা’ মাজহারুল ইসলামের নতুন আবিষ্কার। হুমায়ূন আহমেদ একই রকমের নাস্তা প্রতিদিন খেতে চান না তাই নতুন আয়োজন ‘ছিটা পিঠা’। মাজহার ভাই বেশ ভয়ে ছিলেন—পিঠা স্যারের পছন্দ হয় কি না। স্যার নাস্তা খেয়ে বললেন—মাজহার শোন, ধর কোনো কারণে তোমাকে যদি আমেরিকায় থেকে যেতে হয় তাহলে তুমি আর তোমার স্ত্রী স্বর্ণা মিলে একটা পিঠার দোকান খুলবে। আজকের ছিটা পিঠা হবে তোমার সিগনেচার ডিশ। আমেরিকানরা লাইন ধরে তোমার পিঠা খাবে। এবং অবশ্যই টেক এ ওয়ে আর ডেলিভারি সিস্টেম রাখবে। দু’ বছর ব্যবসা করে তুমি সারাজীবন বসে খেতে পারবে।

নিষাদ, নিনিত আগেভাগেই রেডি হয়ে আছে, ওদের আর তর সইছে না। শাওন ভাবীর মা এসেছেন নাতি দুজনের টেককেয়ার করতে, হাঁটুর ব্যথার জন্য তিনি প্রথমে যেতে রাজি হননি। স্যার ধমক দিয়ে রাজি করালেন। ব্যাটারি গার্ডেন রেস্টুরেন্টে স্যার ছাড়া আমরা সবাই লবস্টার অর্ডার করলাম, স্যার নিলেন বিফস্টেক সাথে ব্রকলি আর ম্যাশ পটেটো। গতকাল ডা. স্টিভেন আর ভিচের কাছ থেকে আশার কথা শুনে স্যারের মনটা বেশ ঝলমলে। লাঞ্চ শেষ করে আমরা পার্কে বেড়াতে বের হলাম।

হুমায়ূন আহমেদের আজ ছবি তোলার ঝোঁক চেপেছে। নিজ থেকেই নানা ভঙ্গিমায় অনেক ছবি তুলছেন। মাজহার ভাই এবং আমার সঙ্গেও অনেকগুলো ছবি তুললেন। আমেরিকায় প্রথম বেড়াতে এলে ট্যুরিস্টদের মধ্যে যে ধরনের উচ্ছ্বাস থাকে স্যার আজ সে রকম উচ্ছ্বসিত। ট্যুরিস্টরা বোটে করে স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে যাচ্ছে। স্যার আমাকে বললেন—যাবে নাকি? প্রথম আমেরিকায় এলে অথচ স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখবে না, তা তো হয় না।

আমি মনে মনে বললাম—আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হুমায়ূন আহমেদ, বাংলাদেশের স্ট্যাচু অব লিবার্টির জীবন্ত প্রতিমূর্তি। তাকে ফেলে আমার সেই পাথরের স্ট্যাচু দেখতে যাওয়ার কোনো মানে হয় না...

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৫ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন