ঢাকা শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
৩১ °সে


ডেজার্ট আইল্যান্ড ডিস্ক

ডেজার্ট আইল্যান্ড ডিস্ক

বিবি মারা যাবার ঠিক ছয় মাস আগে ডেজার্ট আইল্যান্ড ডিস্ক থেকে ‘নির্বাসিত’ হওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন স্যাম ফিঙ্কলার।

কাকতালীয় মিল ছাড়া এর মধ্যে আমরা বাড়তি অন্য কোনো রহস্য খুঁজতে গেলে সেটা কিন্তু হবে বড়ো ধরনের নিষ্ঠুরতা।

বাগানে বসে ছিল ওরা। ছিমছাম ছোট্ট বাগান। কাঠের গেট দিয়ে আলাদা করা হয়েছে বাইরের জংলাঝাড় থেকে। ভীষণ কাজে মগ্ন পটের বিবি টাইলার। হাতে পায়ে মাটি মেখে পরিচর্যা করছে চারাগাছের। আমন্ত্রণের প্রসঙ্গটা এই সময় উত্থাপন করল স্যাম। বউয়ের ‘এটা দাও, ওটা তোলো’ ইত্যাকার ফরমায়েশ খাটার চাইতে এ-ই বরং ভালো। বউটা তার এমন বাগানঅন্তপ্রাণ অথচ বাগান জিনিসটা বরাবরই ফিঙ্কলারের কঠিন গাত্রদাহ। ফুল কিংবা সুশোভিত লন দুটোই তার কাছে জঘন্য লাগে। অদূরে একটা আরামকেদারা দেখিয়ে বউ তাকে নির্দেশ করে, কিছু করতে হবে না তোমাকে, ওখানে শুয়ে শুয়ে আলসেমি করো। যদিও বউয়ের জানা, ওর শরীরটা আরামকেদারায় শুয়ে আলিস্যি করে কাটানোর জন্য তৈরি হয়নি। ‘যখন সময় হবে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেব আমি,’ ওর উত্তর। অতএব, ফিঙ্কলার যখনই বাগানে যেত, ওকে দেখা যেত বাগানের সীমানা ধরে ঝানু গোয়েন্দার মতো পায়ে পায়ে হাঁটছে। গভীর পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি নিয়ে খুঁজছে ঝোপের মাঝে কোনো লাশ লুকিয়ে আছে কি না। মাঝে মাঝে থেমে দাঁড়াচ্ছে, মনের মধ্যে বুদ্বুদের মতো বেড়ে ওঠা কথাগুলো টাইলারকে বলার জন্য। যদিও টাইলারের সাথে তার প্রতিটি আলাপ অবধারিতভাবে শেষমেশ গিয়ে ঠেকে নিরস কাজের প্রসঙ্গে। গোয়েন্দা পায়চারি করতে গিয়ে হঠাত্ একটু থামলে কিংবা একটা কোনো কাজ শেষে হাতটা খালি পেলেই টাইলার ওর হাতে ধরিয়ে দেবে একটা বাঁশের ঝুড়ি, কিংবা সবুজ এক টুকরো দড়ি ধরিয়ে লাগিয়ে দেবে বেড়া বাঁধার কাজে। এমন কিছু আহামরি নয় এসব কাজ, যদিও তা করতে গিয়ে ফিঙ্কলারের মনে হতো এমনিসব গোবর আর ল্যাদার মাঝে এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে মহামূল্যবান জীবনের একেকটা দিন।

‘ডেজার্ট আইল্যান্ড ডিস্ক শোতে যাওয়ার ডাক এসেছে আমার,’ বাগানের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে বউয়ের উদ্দেশে সংবাদটা চাউর করল ফিঙ্কলার। পড়ে যাওয়ার ভয়ে পেছনে একটা পানির পাইপে এক হাতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও।

দুই হাঁটুর ওপর উবু হয়ে মাটিতে বসে পাথুরে জমিন নিংড়ে প্রাণের সন্ধান করছিল টাইলার। মুখ না তুলেই জানতে চাইল, ‘ডাক এসেছে মানে? আমাকে তো কখনো বলোনি তুমি এজন্য চেষ্টাচরিত্তির করে বেড়াচ্ছো?’

‘আমি করিনি। ওরাই আমাকে খুঁজে বের করেছে।’

‘তাহলে ওদের বলো তোমাকে খারিজ করে দিক।’

‘কেন তা করতে যাব আমি?’

‘কেনই বা তা করবে না? ডেজার্ট আইল্যান্ড ডিস্ক দিয়ে কী ঘোড়ার আন্ডা অর্জন করতে চাও তুমি? কিছু যদি করতেই চাও তাহলে ওসব বাদ দিয়ে বরং বাগানের কাজে হাত লাগাও। তোমার কাছে তো কোনোদিন একটা গানের ডিস্কও ছিল না। সংগীতের স-ও তো বোঝ না তুমি।’

‘আমি বুঝি।’

‘ঠিক আছে, পছন্দের কয়েকটা গানের কথা বলো তো আমাকে।’

‘আহ— বোঝা আর বলা তো এক কথা নয়।’

‘বুদ্ধু!’ বউয়ের জবাব, ‘শুধু মিথ্যা বলতে পারলেই হয় না। ঘটে বুদ্ধিও থাকতে হয়। আমার পরামর্শ হচ্ছে অনুষ্ঠানে যেও না তুমি। এতে তোমার বিন্দুমাত্র উপকার নেই। তোমার চেহারা দেখেই মানুষ বলে দিতে পারবে তুমি গুলগপ্পো দিচ্ছো। তোমার গলার আওয়াজ বেড়ে যায়।’

বউয়ের টোপে ধরা পড়তে পড়তেও শেষ মুহূর্তে নিজেকে বাঁচিয়ে নিল ফিঙ্কলার, ‘মিথ্যা বলতে হবে না আমাকে। আর আমার সবগুলো রেকর্ড যে গানেরই হতে হবে, তা-ও নয়।’

‘তো, কী কী বাছাই করছো তুমি শুনি—বার্টান্ড রাসেলের স্মৃতিকথন থেকে পাঠ? উহ, আর তর সইছে না আমার।’

উঠে দাঁড়িয়ে অ্যাপ্রনের পাছায় ঘষে দুই হাত পরিষ্কার করল টাইলার। বাগানে কাজের জন্য অ্যাপ্রনটা তাকে ফিঙ্কলারই কিনে দিয়েছিল দু বছর আগে। কানের ঝুমকো দুলটাও কিনে দিয়েছে সে। আর বাঁ হাতে জ্বলজ্বল করতে থাকা গোল্ড রোলেক্স ঘড়িটা উপহার দিয়েছে তাদের দশম বিবাহবার্ষিকীতে। সম্পূর্ণ পরিপাটি পোশাক আর জমকালো অলংকারসমেতই বাগানের কাজে চলে আসে টাইলার। ঝুড়ি হাতে মাটিতে সার ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ ছেড়ে উঠে এক মুহূর্তের নোটিশে সে চলে যেতে পারে অভিজাত রিজ হোটেলে ডিনারের আমন্ত্রণ রাখার জন্য। শুধু হাত থেকে গ্লাভসটা খুলে মাথার চুলে ঝটপট আঙুল চালিয়ে নিলেই হলো। ল্যাবড়াগাদা সারের ভেতর থেকে অনিন্দ্য সৌন্দর্য নিয়ে দেবী ভেনাসের মতো রূপবতী বউটাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে ঢোঁক গিলল ফিঙ্কলার। শুধুমাত্র এই সৌন্দর্যের আকর্ষণেই, যতই অপছন্দ হোক, বাগান থেকে বেশিক্ষণ দূরে থাকতে পারে না ফিঙ্কলার। সে বুঝতে পারে না, বউকে যখন তার এতই আকর্ষণীয় মনে হয়, তখন কোন দুঃখে সে বাড়তি কয়েকটা রক্ষিতা পুষতে আগ্রহ বোধ করছে।

তার কারণ কি এই যে, সে খারাপ লোক নাকি নিতান্ত বোকা। নিজেকে অবশ্য তার অতোটা মন্দলোক মনে হয় না। স্বামী হিসেবে সে উত্তম এবং বিশ্বস্ত। আসল সত্যটা হচ্ছে, প্রকৃতিগতভাবেই বহুগামী না হয়ে উপায় নেই পুরুষের। এমনও মনে হয়, আবার নিজের স্বভাবের প্রতি কৃতজ্ঞতাও বোধ করে, যদিও কখনো কখনো সেটা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলে যায়, যেমন নিজের ঘর নিজের বিবির প্রতি তার এই টান।

এই তার প্রকৃতি—সবই প্রকৃতি, প্রকৃতির বিধান—ওই হারামজাদা প্রকৃতিই সবকিছুর মূল, সে নয়।

‘শোনো, আমি ভাবছিলাম শুরু করব,’ আবেগমাখা কণ্ঠে বলল সে, ‘আমাদের বিয়ের দিনের সেই গানগুলো দিয়ে...।’

পানির পাইপটা চালু করবে বলে ট্যাপের কাছে গিয়ে দাঁড়াল টাইলার। ‘মেন্ডেলসনস ওয়েডিং মার্চ? ঠিক মৌলিক বলা যাবে না একে। যদিও আমি চাই, যদি কিছু মনে না করো, আমাদের বিয়েটাকে অন্তত এই ঝামেলা থেকে দূরে রাখবে। ডেজার্ট আইল্যান্ডে যাওয়ার পর এ বিষয়টি বিন্দুমাত্র মাথায় থাকবে না তোমার। আর তোমার সেরা পছন্দ যদি মেন্ডেলসনই হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হচ্ছে ওদের জানিয়ে দেওয়া, তুমি ব্যস্ত। যেতে পারছ না অনুষ্ঠানে। অন্তত যতদিন না সে নতুন করে একটা ‘অ্যাডাল্টারি মার্চ’ রচনা করে।’

‘ব্যস্ততার অজুহাতে ডেজার্ট আইল্যান্ডে যাওয়া হচ্ছে না? অসম্ভব। ডেজার্ট আইল্যান্ডে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেলে কারো কোনো ব্যস্ততা থাকতে পারে না। এ এমন এক প্রস্তাব যাকে পাওয়ামাত্র খপ করে ধরে ফেলতে হয়—অনেকটা ক্যারিয়ারের মতো।’

‘তোমার বর্তমান ক্যারিয়ারের অসুবিধাটা কী? এদিকে এসে পাইপের অন্য প্রান্তটা একটু ধরো তো।’

পাইপের অন্য প্রান্তটা ঠিক কোথায় চট করে সেটা বুঝে উঠতে পারল না ফিঙ্কলার। ঝানু গোয়েন্দার মতো সতর্ক পায়ে আবারও হাঁটা ধরল। চুলের মাঝে ব্যস্ত আঙুল, ঝোপঝাড়ের ভেতর উঁকি দিচ্ছে তীক্ষ চোখে।

‘যেখান থেকে পানির ধারাটা বেরিয়ে আসছে সেখানে তাকাও, গাধা। কত বছর ধরে এ বাড়িতে থাকছ তুমি? অথচ এখনো বলতে পারো না তোমার পানির পাইপটা কোথায় থাকে? হা!’ নিজের কৌতুকে নিজেই হাসল টাইলার। গম্ভীর হয়ে থাকল ফিঙ্কলার।

‘ডেজার্ট আইল্যান্ডে আমন্ত্রিত হলে নিজেকে লুকিয়ে রাখা যায় না—’ কোনোরকমে জবাব দিল সে। পানির পাইপটা খুঁজে পেল তক্ষুনি এবং হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়েই রইল, কারণ ততক্ষণে ভুলে গেছে কী জন্যে এটা খুঁজে বেড়াচ্ছিল সে।

‘তোমাকে অনুরোধ করা হয়েছে। ওরাই তোমাকে অনুরোধ করেছে। অনুরোধ অস্বীকার করতে বাধা কোথায় তোমার? তোমার নিজের জীবনে এতে কী উপকার হবে? তোমার মধ্যে তো কোনো প্রেরণা নেই। এদিকে দাও ওটা।’

‘প্রেরণা নেই?’

‘আগ্রহ কম। বেপরোয়া নও।’

‘তুমি বলেছ প্রেরণা...?’

‘এবং?’

‘মানে, আমি উদ্যমী ইহুদি নই?’

‘ওহ, কসম লাগে, আমি কক্ষনো তা বলতে চাইনি এবং তুমিও তা জানো। উদ্যমী ইহুদি তোমার নিজের কল্পনা। এতই যদি তোমার ভয় যে মানুষ তোমাকে এভাবেই বিচার করে, তো সেটা তোমারই সমস্যা। আমি মনে করি তোমার কাছে এসে থেমে গেছে প্রেরণা। যা হোক, আমাদের সম্পর্কের মধ্যে ইহুদি ব্যক্তিটি কিন্তু তুমি নও, আমি।’

‘বাজে কথা, তুমিও তা জানো।’

‘ঠিক আছে, আমিদাহ থেকে পড়ে শোনাও তো। অষ্টাদশ আশীর্বাদের যে কোনো একটি অন্তত বলো...।’

মুখ ফিরিয়ে নিল ফিঙ্কলার।

একটা সময় ছিল বাগানে কাজ করতে করতে আচমকা ওর উদ্দেশে পানি ছোড়ার খেলায় মেতে উঠত টাইলার, পাল্টা পানি ছুড়তে শুরু করত সেও, যার শেষ হতো হাসাহাসি, এমনকি পড়শিদের বিব্রত করে ঘাসের বিছানাতেই অবশেষে ভালোবাসাবাসির খেলা দিয়ে। কিন্তু সত্যিই গত হয়েছে সেসব দিন...

... ধরে নিল কখনোই ঘটেনি এমন ঘটনা। মনে মনে একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করল টাইলার, ওকে ধাওয়া করে ছুটছে ফিঙ্কলার, ধরে ফেলেছে তাকে, ওর ওষ্ঠে মুখ ডুবিয়ে আকণ্ঠ পান করছে সুধা। কিন্তু সশঙ্ক বালিকা হঠাত্ আবিষ্কার করল, দিন ফুরিয়ে গেছে। কিছুতেই আজ আর পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না ছবিটা।

বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলল ও। কী করবে কী না করবে সে বিষয়ক মতামতের জন্য নয়। সে জানত এটা তাকে করতেই হবে। ডেজার্ট আইল্যান্ডে গিয়ে পছন্দের গান নিয়ে মিথ্যা বলতে হবে। ওর সাবেক শিক্ষক লিবোর তাকে পরার্মশ দিল শুবার্টের ইমপ্রম্পতাস নেওয়ার জন্য। সঙ্গে কয়েকটা কনসার্টো। স্কুলের পুরনো বন্ধু ত্রিসলভ ইতালীয় অপেরার গ্রেট ডেথ এরিয়ার অনেকগুলো নাম পাঠিয়ে দিল। ‘কতগুলো প্রয়োজন তোমার? জানতে চাইল সে, ছয়টা?’

‘একটাই যথেষ্ট। ওরা বৈচিত্র্য দেখতে আগ্রহী।’

‘যাতে অসুবিধা না হয়, আমি তোমাকে ছয়টাই দিলাম। প্রত্যেকটাই আলাদা। কখনো দেখা যাচ্ছে মেয়েটা মারা যাচ্ছে, কখনো আবার ছেলেটা। এছাড়া আরো একটা বাড়তি দিয়েছি যেখানে ওরা দুজন একইসময়ে মারা যায়। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হিসেবে এটা হবে অসাধারণ।’

‘এবং আমার ক্যারিয়ারেরও,’ ভাবল ফিঙ্কলার।

শেষমেশ নিজের অনুভূতিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার মনস্থ করল ফিঙ্কলার। বাছাই করল জনপ্রিয় বব ডিলান, কুইন, পিঙ্ক ফ্লয়েড, ফেলিক্স মেন্ডেলসন (ওয়েডিং মার্চের বদলে লিবোরের পরামর্শমতো ভায়োলিন কনসার্টো), গার্লস অ্যালাউড, এলগার, বার্টান্ড রাসেলের স্মৃতিকথন থেকে পাঠ, এবং ব্রুস স্প্রিংস্টিন, শোতে যাকে সে অভিহিত করল গুরু হিসেবে। বইয়ের তালিকায় স্থান পেল প্লেটোর সংলাপ, যদিও একবার মনে হলো, ওরা কি নিয়ম শিথিল করে হ্যারি পটার সমগ্রটা তার সঙ্গে নিতে অনুমতি দেবে!

‘এত এত গম্ভীর গ্রন্থের পাশে হালকা বিনোদনের জন্য?’ জানতে চাইল উপস্থাপক।

‘না, তার জন্য তো প্লেটোই আছেন,’ জানাল ফিঙ্কলার। মজা করে বলা, যদিও ভাবল যাদের উদ্দেশে বলা তারা ঠিকই বুঝে নেবে এর শানে নজুল।

বউটা যাতে না ভাবে যে তাদের বিয়েতে একমাত্র ইহুদি সে, তার জন্য উপস্থাপককে সে জানাল প্রতিদিন বাবার হাত ধরে প্রার্থনাগৃহে যাবার কথা, বাবা-মায়ের উদ্দেশে স্তোত্র আওড়ানোর কথা, মর্মভেদী পরিতাপের প্রসঙ্গ যা সত্যিই সহানুভূতির উদ্রেক করে, এবং, এগুলো তাকে চিহ্নিত করে দিল বিশেষ কিছু একটা হিসেবে। জিশগাদাল ভিজিসকাদাশ... মৃতের উদ্দেশে প্রেরিত প্রাচীন হিব্রু বাণী। পবিত্র হোক, ধন্য হোক মহান সেই সৃষ্টিকর্তার নাম। সেই প্রার্থনা যা তাকে জ্ঞাত করে তার এতিম হওয়ার কাহিনি। সত্যের মুখোমুখি ঈশ্বরকে তাই জানিয়ে দেয় যুক্তি যাকে উপলব্ধি করতে অক্ষম। স্টুডিওতে নেমে এল পিনপতন নীরবতা। নিজের ইহুদিত্ব চিরকাল তার কাছে অসীম গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এ ছিল প্রাত্যহিক শান্তি আর অনুপ্রেরণার উপলব্ধি। কিন্তু তাই বলে ফিলিস্তিনিদের এভাবে বাস্তুহারা করা হতে থাকলে সে তো আর চুপ থাকতে পারে না। ‘ফিলিস্তিন বিষয়ে,’ সে বলেই চলল, ভেঙে গেল তার কণ্ঠ, ‘আমি গভীরভাবে লজ্জিত।’

‘বলতে চাইছ গভীরভাবে আত্মগুরুত্ববোধ সম্পন্ন?’ অনুষ্ঠান শোনার একপর্যায়ে টাইলার বলল, ‘কীভাবে পারলে তুমি?’

‘না পেরে কীভাবে থাকতাম আমি?’

‘কারণ, অনুষ্ঠানের মূল বিষয় এটা ছিল না। এ কারণেই তোমার পারার কথা নয়। কারণ, কেউ তোমার কাছে তা জানতেও চায়নি।’

‘টাইলার..!’

‘আমি জানি— তোমাকে এ কাজ করিয়েছে তোমার বিবেক। তা, মন্দ নয় এমন বিবেক। যখনই তোমার কোনো দরকার হয়, অমনি সে হাজির, প্রয়োজন ফুরালে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না তাকে। শোনো, দশজনের সামনে গিয়ে তোমার এমন শরমিন্দা প্রকাশের কারবার দেখে আমি নিজেই শরমিন্দা এবং আমি ইহুদিও নই।’

‘যথার্থ। ঠিক এ কারণেই তুমি এভাবে বলতে পারলে,’ ফিঙ্কলার বলল।

অনুষ্ঠান থেকে ফিরে আসার পর তার এমন চমকপ্রদ কথার কোনোটাই ‘পিক অব দ্য উইক’-এ ঠাঁই পেল না দেখে কিছুটা বিমর্ষ বোধ হলো ফিঙ্কলারের। যদিও এ দুঃখ পুষিয়ে দিয়ে অনুষ্ঠান প্রচারের এক পক্ষকাল পর একখানা চিঠি এল তার হাতে। থিয়েটারকর্মী আর শিক্ষবিদ ইহুদিদের একটি দল তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাদের সাথে যোগদানের জন্য। যদিও দলের বিষয়টি এখনো একটি ধারণামাত্র এবং এতকাল তার কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না, কিন্তু অনুষ্ঠানে তার সাহসী উচ্চারণের পর থেকে নতুন করে ভাবতে বসেছে তারা। আশায় বুক বাঁধছে নতুন করে উঠে আসার জন্য। সত্য উচ্চারণে তার সাহস দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা দলের নাম রাখতে চাইছে— লজ্জিত ইহুদিকুল।

বুকের ভেতর গোপন আলোড়ন অনুভব করল ফিঙ্কলার। শৈশবে দাদার জন্য কখনো না করা প্রার্থনা তাকে যতটা না আকুল করত তার চাইতে বন্ধুদের প্রশংসা তাকে অনেক বেশি আপ্লুত করে দিল। তালিকাটা খুঁটিয়ে দেখল। অধিকাংশ অধ্যাপকই তার পূর্বচেনা এবং কখনো পাত্তা দেওয়া হয়নি তাদের। অবশ্য অভিনেতা যাদের নাম সেখানে দেখা যাচ্ছে তাদের সবারই অবস্থান বলতে গেলে এই মুহূর্তে খ্যাতির চূড়ায়। নিজের জীবনে কখনোই খুব একটা থিয়েটারপ্রেমী ছিল না, টাইলার যতবার তাকে বলেছে, এই-চলো-না-নাটক-দেখে-আসি-একটা ততবার তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে সে। আর এই মুহূর্তে কল্পনায় সে দেখল, অভিনেতারা লাইন ধরে চিঠি লিখছে তার কাছে—যেসব অভিনেতাকে কখনোই দ্রষ্টব্য মনে হয়নি তার কাছে, তারাও আজ এক নতুন ব্যঞ্জনায় আবির্ভূত হলো তার সামনে। তালিকায় জনৈক সেলিব্রিটি পাচকের নাম এবং বেশ কয়েকজন প্রসিদ্ধ কমেডিয়ানের নামও রয়েছে। ‘খোদা!’ চিঠি হাতে পেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল ফিঙ্কলার।

বাগানে অলসকেদারায় বসে আরাম করছিল টাইলার। এক হাতে কফির কাপ, অন্য হাতে খোলা দিনের কাগজ। চোখে এখনো ঘুম লেগে আছে। যদিও ইতোমধ্যেই বাইরে বেশ সকাল। ফিঙ্কলারের চোখেই পড়ল না আগের চাইতে আজকাল অনেক দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছে টাইলার।

‘খোদা’ আবারও উচ্চারণ করল শব্দটা যাতে বউয়ের কানে ঢোকে কথাটা।

কিন্তু নড়ল না টাইলার। ‘প্রতিজ্ঞাভঙ্গের কারণে কেউ কি তোমার নামে মামলা ঠুকে দিচ্ছে, ডার্লিং?’

‘মনে হচ্ছে, সব মানুষ আমার কারবারে লজ্জিত বোধ করেনি।’ চিঠির পাতা থেকে বিখ্যাত নামগুলো ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল সে। একটা একটা করে।

‘তারপর?’

এক ডজন নাম উচ্চারণ করতে যতটা সময় নিয়েছিল ফিঙ্কলার, এই একটিমাত্র শব্দ উচ্চারণ করতে তার চাইতে দীর্ঘ সময় নিল টাইলার।

নাক দিয়ে ঘোঁত জাতীয় শব্দ করল ফিঙ্কলার, ‘তারপর— বলে কী বোঝাতে চাইছ তুমি?’

উঠে বসে ওর দিকে তীব্র চোখে তাকাল টাইলার। ‘স্যামুয়েল—তুমি যতগুলো নাম পড়লে তার মধ্যে একটি নাম নেই যার প্রতি তোমার ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। গ্রন্থকীটদের তুমি ঘেন্না করো। অভিনেতারা তোমার দু চক্ষের বিষ—বিশেষত এসব অভিনেতাদেরই তুমি অপছন্দ করো বেশি—সেলিব্রিটি পাচকদের জন্য তোমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আর কমেডিয়ানদের তুমি সহ্যই করতে পারো না। হাস্যকর নয়, তুমিই এদের সম্পর্কে কথা বলছো। সত্যিই হাস্যকর নয়। কেন আমি, না, কেন তুমি আদৌ পরোয়া করবে ওরা কী বলল না বলল তা নিয়ে?’

‘অভিনেতা হিসেবে তাদের সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়নের বিষয়টি এখানে অপ্রাসঙ্গিক।’

‘তাহলে দয়া করে বলুন, প্রাসঙ্গিক কোনটা? রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে তাদের সম্পর্কে তোমার মূল্যায়ন? ঐতিহাসিক হিসেবে? ধর্মাত্মা হিসেবে? নৈতিক দার্শনিক হিসেবে? আমার মনে পড়ে না কখনো তুমি এমন বলেছো যে, কমেডিয়ান হিসেবে তারা ফালতু হলেও মানুষ হিসেবে তারা গভীর চিন্তাবিদ। যতবার অভিনেতাদের সাথে কাজ করতে গিয়েছো, তুমি তাদের বর্বর বলেছো, বলেছো তারা শুদ্ধভাবে একটি বাক্য উচ্চারণ করতে কিংবা ভাব প্রকাশে অক্ষম। তোমার চিন্তা বুঝতে পারার তো প্রশ্নই আসছে না। এর মধ্যে কোনটা বদলে গেছে, ফিঙ্কলার?’

‘সমর্থন পেলে মানুষের ভালো লাগে।’

‘তাই বলে যে কোনো জায়গা থেকে? যে কারো কাছ থেকে?’

‘আমি এদের যে কেউ মনে করি না।’

‘না, অন্যের চাইতে বরং তোমার নিজের ভাষায়।

কারণ এখন তারা তোমাকে প্রশংসা করছে!’ ফিঙ্কলার উপলব্ধি করল গোটা চিঠিটা সে তাকে পড়ে শোনাবার সুযোগ পাবে না। বলতে পারবে না যে তার ‘সাহস’ থেকে কীভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে এসব মানুষ। অন্তত নতুন করে বেগবান হচ্ছে একটা আন্দোলন। এখনো ছোট্ট, কিন্তু কে জানে, কতটা বিশাল হয়ে উঠতে পারে তা যে কোনো মুহূর্তে। বলা হলো না প্রশংসিত হওয়াটা আসলেই কতটা প্রীতিকর। জাহান্নামে যাও তুমি, টাইলার।

তারপরও তাকে ছেড়ে নড়তে পারল না ফিঙ্কলার।

সংক্ষেপে বলল, ‘তোমার নিজের মানুষ যখন তোমার প্রশংসা করে তখন তা একেবারেই পৃথক ব্যাপার।’

দু চোখ বন্ধ করল টাইলার। ওর মনের ভাব বোঝার জন্য চোখ খুলে তাকানোর দরকার হয় না তার।

‘হায়রে আমার খোদা,’ হতাশা ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে, ‘তোমার নিজের! ভুলে গেছ ইহুদিদের দেখতে পারো না তুমি? ইহুদিসঙ্গ এড়িয়ে চল তুমি। প্রকাশ্যে কতবার বলেছো ইহুদিদের দেখলেও বিরক্ত বোধ করো তুমি, কারণ ওরা অযথাই মুটিয়ে যায় আর মুখে বলে তারা সংযমী ঈশ্বরে বিশ্বাস করে। আর এখন যখন মাঝারিদরের স্বল্পখ্যাত কতিপয় ইহুদি এসে তোমার সাথে একমত হলো, অমনি তাদের প্রেমে পাগল হয়ে গেলে তুমি। তাহলে এটারই কী প্রয়োজন ছিল এতকাল? তুমি কি সত্যিই সমস্ত ইহুদিদের মাঝে উত্তম ইহুদি হয়ে উঠতে যদি এসব ইহুদি ছোকরারা আরো আগে এসে তোমার সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করত? আমি বুঝি না। এর কোনো মানে হয় না। ইহুদিবাদকে জাগিয়ে তুলতে নতুন করে উত্সাহী ইহুদি হয়ে ওঠা।’

‘আমি ইহুদিবাদকে উস্কে দিচ্ছি না।’

‘বেশ, নিশ্চয়ই খ্রিস্টবাদ নয় এটা। লজ্জিত ইহুদিকুল। তোমার জন্য অনেক সম্মানজনক হতো ডেভিড আরভিংয়ের সাথে ঘুরে বেড়ানো। মনে রেখো তুমি আসলেই কী চাও স্যামুয়েল... স্যাম! তুমি যা চাও তা কতিপয় ইহুদির সমর্থন নয়, এমন সমর্থন দেওয়ার জন্য তারা সংখ্যায় খুব একটা নেইও বটে।’

ওর কথায় কর্ণপাত করল না ফিঙ্কলার। ওপরের ঘরে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসল। তার কানে বাজছে সদ্য শোনা কথাগুলো। লজ্জিত ইহুদিকুলের উদ্দেশে ধন্যবাদ জানিয়ে একটা চিঠি লিখল ও। ধন্যবাদের প্রতিউত্তরে ধন্যবাদ। ওদের সাথে যোগ দিতে পেরে সেও ধন্য।

কিন্তু এতে কি কোনো দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম হবে সে? আওয়াজ আর ধ্বনিপ্রবণ এই সময়ে, ভালো লাগুক আর নাই লাগুক, একটা ছোট্ট আদ্যনাম হাজার ইশতেহারের চাইতে বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম। বেশ—তাহলে আদ্যনামই হোক—কিংবা তার কাছাকাছি কিছু একটা—ইতোমধ্যেই যা রয়ে গেছে সংগঠনের নামের ভেতরেই। লজ্জিত ইহুদিকুল না হয়ে কেমন হয় যদি তার নামের সাথে মিল রেখে এর নাম হয় অ্যাশ-হেইমড ইহুদিকুল। ভবিষ্যতে সংক্ষিপ্ত হয়ে হতে পারে শ্রেফ অ্যাশ। বর্তমান পরিস্থিতি বিচারে মনে হয় না এটা তাকে নিজে গিয়ে ব্যাখ্যা করতে হবে নতুন করে।

সপ্তাহ ঘুরে যাবার আগেই চিঠির উত্তর চলে এল তার হাতে। প্যাডের ওপর জ্বলজ্বল করছে সংগঠনের নতুন নাম ‘অ্যাশ-হেইমড ইহুদিকুল।’

প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ হলো তার। সাথে মিশে আছে বেদনা। ঘরহারা ফিলিস্তিনির দীর্ঘশ্বাস যা এভাবে বাধ্য করেছে লজ্জিত ইহুদিকুলের আত্মপ্রকাশে।

ওর সম্পর্কে টাইলারের মূল্যায়ন ছিল নিষ্ঠুররকম ভ্রান্ত। যা চাইছে বলে সে তাকে অভিযুক্ত করেছিল তার কিছুই চায়নি সে। খ্যাতি কিংবা স্বীকৃতির জন্য আদৌ লালায়িত হয়নি সে। খোদা সাক্ষী, নিজের কাজ সম্পর্কে কোনো অনুতাপ নেই তার। এটি গ্রহণবর্জনের ব্যাপার নয়। সত্যই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে না কাউকে তো এটা বলতেই হতো। আর এখন তো অন্যরাও তার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছে সেই একই কথা। তার নামে।

তার প্রোডাকশন সহকারী মেয়েটা, রনিত ক্রাভিজ, ঘটনাচক্রে, যদি একজন ইজরায়েলি জেনারেলের মেয়ে না হতো, সে হয়তো তাকে ফোন করে ইস্টবোর্ন এলাকায় লজ্জিত ইহুদিকুলের জন্য একটা উইকএন্ডের প্রস্তাবনা শেষ পর্যন্ত দিয়েই দিত।

লেখক :ব্রিটিশ সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক। তিনি ২০১০ সালে ম্যানবুকার পুরস্কার লাভ করেন।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৫ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন