ঢাকা শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
৩০ °সে


‘নির্বাসিতা তুমি, সুন্দরী শ্রীভূমি...’

‘নির্বাসিতা তুমি, সুন্দরী শ্রীভূমি...’
গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ-এর বাসভবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সঙ্গে রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবী

১৩২৬ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন বেড়াতে এসেছেন ভারতের শিলংয়ে। সিলেটের ব্রাহ্মসমাজের তত্কালীন সম্পাদক গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ ছিলেন কবির একান্ত ভক্ত ও অনুরাগী। কবিগুরু শিলংয়ে এসেছেন শুনে তাঁকে সিলেটে আনার জন্য গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ চরমভাবে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। তিনি ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে কবিকে সিলেট ভ্রমণের জন্য সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে ‘তার বার্তা’ পাঠালেন। তার বার্তার জবাবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানালেন, সিলেটে আসা তাঁর পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। কারণ দীর্ঘ পথ-ভ্রমণ বিরক্তিকর। কিন্তু কবিগুরুর এ জবাবে দমে যাবার পাত্র ছিলেন না গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ। তিনি কবিগুরুর অসম্মতি পেয়েও ‘আঞ্জুমান ইসলাম’, ‘মহিলা সমিতি’ ইত্যাদি সংস্থার পক্ষ থেকে পুনরায় টেলিগ্রাম করার ব্যবস্থা করেন। এভাবে সিলেট (তত্কালীন শ্রীহট্ট) থেকে একের পর এক অনুরোধ যাবার পর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একান্ত বাধ্য হয়ে সিলেট আসার সদয় সম্মতি জানান।

তখন শিলং থেকে সিলেট যাতায়াতে কোনো যান ছিল না। সাধারণত আসাম-বেঙ্গল রেলপথে শিলং থেকে সিলেট পর্যন্ত মানুষজন চলাচল করতেন। তবে বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল একটা। এটি হলো আদিবাসী খাসিয়াদের পিঠে চড়ে খুব অল্প সময়েই শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি হয়ে আসা যেত সিলেটে। কবিগুরু মানুষের পিঠে চড়ে আসতে কিছুতেই রাজি হলেন না। তিনি বলেছিলেন, ‘বরং দশ মাইল পায়ে হেঁটে পাহাড় উত্রাই করতে পারি তবু মানুষের কাঁধে চড়তে পারবো না।’ সে জন্যে চেরাপুঞ্জির রাস্তা দিয়ে না এসে আসাম-বেঙ্গল রেলপথ দিয়েই তিনি শ্রীহট্ট (বর্তমান সিলেট) অভিমুখে রওয়ানা হলেন। কবি সিলেটে আসছেন এ সংবাদ প্রচারিত হওয়া মাত্রই সারা শহরে প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয়। কবিগুরুর আগমন উপলক্ষে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী এবং অভ্যর্থনা সমিতি গঠন করা হয়।

ভারতের বদরপুর রেলওয়ে জংশনের কোয়ার্টারে শান্তি নিকেতনের প্রাক্তন ছাত্র শ্রীযুক্ত মনোরঞ্জন চৌধুরী ও তার স্ত্রী জয়া চৌধুরী বসবাস করতেন। তারা সেখান থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়া কবির সহযাত্রী হলেন। কবির সঙ্গে ছিলেন তাঁর পুত্র শ্রীযুক্ত রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শ্রীযুক্তা প্রতিমা দেবী। বদরপুরে কবিকে এক নজর দেখতে শত-শত মানুষের ভিড় লেগে যায়। এ অবস্থা দেখে ট্রেনের কামরা থেকে নিচে নেমে আসেন কবি। এসেই তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলেন। দর্শকমণ্ডলি মুগ্ধ বিস্ময়ে নির্বাক। এ অবস্থায় কবিগুরুকে দেখে মনে হলো তিনি কোনো অমর্ত্যলোকের অধিবাসী। দর্শকবৃন্দের উদ্দেশে কবিগুরু শুধুমাত্র গানের দুটি লাইন উচ্চারণ করলেন—

‘মোর সন্ধ্যায় সুন্দর বেশে

এসেছ তোমায় করি গো নমষ্কার।’

এদিকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সিলেটে অভ্যর্থনা করে আনার জন্যে শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হরেন্দ্র্র চন্দ্র, ক্ষীরোদ চন্দ্র দত্ত, শ্রীযুক্ত ধর্ম্মদাস দত্ত প্রমুখরা সিলেট থেকে কুলাউড়া পর্যন্ত অগ্রসর হলেন। কুলাউড়াতে ট্রেনের মধ্যেই কবিগুরু রাত্রিবাস করলেন। পরদিন সকালে সিলেটের ‘প্রেসবিটেরিয়ান চার্চ’-এর মিসেস ইথেল রবার্টস ট্রেনের কামরাতেই তাঁর সঙ্গে দেখা করলেন। ইথেল রবার্টস কবিগুরুকে জানালেন, তাঁর খ্যাতির কথা শুনে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসেছেন। একথা বলার পর কবি জবাব দিয়েছিলেন যে, ‘এইটেই তাঁর পক্ষে মস্ত একটা পেনাল্টি। যাকে বলা চলে খ্যাতির বিড়ম্বনা।’

কুলাউড়া থেকে সিলেটের যাত্রাপথে মাইজগাঁও, বরমচাল, ফেঞ্চুগঞ্জ ইত্যাদি রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন থামিয়ে কবিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা প্রদান করা হয়। ১৯১৯ সালের ৫ নভেম্বর (১৯ শে কার্তিক) বুধবার সকাল ৮টায় কবিগুরু সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন থেকে প্ল্যাটফরমে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গেই অসংখ্য আতশবাজি পোড়ানো হয়। চারদিকে জনতার মুখরিত উচ্ছ্বাস। সিলেটে (তত্কালীন শ্রীহট্ট) কবিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর জন্য তত্কালীন শ্রীহট্ট মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান রায় বাহাদুর চৌধুরী, শ্রীহট্টের কৃতি সন্তান আব্দুল করিম, প্রাক্তন মন্ত্রী খান বাহাদুর, আব্দুল মজিদ, রায় বাহাদুর প্রমোদ চন্দ্র দত্তসহ শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সমবেত হয়েছিলেন সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে। কবির সঙ্গে আগত মহিলাদের অভ্যর্থনা করবার জন্য গিয়েছিলেন শ্রীযুক্তা নলিনীবালা চৌধুরী।

সুরমা নদীর ঘাটে কবিকে নেবার জন্য প্রস্তুত ছিল সুসজ্জিত একটি ‘মারবোট’ ও একটি ‘বজরা’। কবিগুরু উঠলেন বোটে আর তাঁর পুত্র, পুত্রবধূসহ অন্যরা উঠলেন বজরাতে। বোট সুরমার জলে ভেসে ধীরে ধীরে তীরে এসে ভিড়তে লাগল। নদীর তীরে কাজিরবাজার থেকে ডাকবাংলো অবধি প্রায় এক মাইল বিস্তৃত জনতার লাইন। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বাঙালি, মাড়োয়ারি, ইংরেজ—সকল মানুষই নদীর তীরে সমবেত। কবিগুরুকে সেখানে দেওয়া হয় রাজোচিত সংবর্ধনা। সংবর্ধনার জবাবে কবিগুরু বলেছিলেন, শ্রীহট্টে এমন সংবর্ধনা পাবেন—এমন আশা তিনি কস্মিকালেও কল্পনা করেননি।

কবিগুরুকে বহনকারী বজরাটি চাঁদনিঘাটে এসে পৌঁছার পর মৌলভী আব্দুল্লা’র নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবকদের একটি দল সারবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কবিকে অভ্যর্থনা জানান। ধীরে ধীরে লাল গালিচাসমৃদ্ধ সিঁড়ি দিয়ে কবিগুরু ওপরে উঠে মৌলভী আব্দুল করিমকে নিয়ে ফুলের মালা ও পাতাবাহারে সুসজ্জিত একটি ফিটন গাড়িতে উঠলেন। কবি গাড়িটিতে আরোহন করা মাত্রই স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা গাড়িটি টেনে নিয়ে চলল সামনের দিকে। ব্যাপারটা কবিগুরুর বুঝতে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হলো। যখন তিনি ব্যাপারটি বুঝতে পারলেন তখন এ কাজটি করতে বার বার বারণ করতে লাগলেন। কিন্তু কে শুনে কার কথা? শিক্ষার্থীরা তখন আনন্দের আতিশয্যে বিভোর। কবিগুরুর বারণ শোনার সময় তাদের নেই। উত্সাহের আতিশয্যে গাড়ি টেনে নিয়ে প্রাণপণে ছুটছে। অবশ্য করিগুরু এ ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন।

তত্কালীন সময়ে সিলেট শহরের উত্তর-পূর্বাংশে মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় ছোট একটি টিলার ওপর ছিল পাদ্রি টমাস সাহেবের বাংলো। পাদ্রি টমাস সাহেব তার সুরম্য বাংলো বাড়িটি সংস্কারপূর্বক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবস্থানের জন্য ছেড়ে দিলেন। কবিগুরু সেখানে পৌঁছালে পুরোপুরি প্রাচ্যরীতি অনুসারে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। বেলা পাঁচটা বাজার আগেই মন্দিরপ্রাঙ্গণ লোকে-লোকারণ্য। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সাতটা বাজার কয়েক মিনিট আগে গৈরিক বসনে আবৃত-দেহ, ঋষি-কবি মন্দিরে এসে পৌঁছালেন। কবিগুরু মন্দিরে পৌঁছার পর ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ কবিগুরুকে একটি সংগীত পরিবেশনের জন্যে অনুরোধ করলেন। তার অনুরোধে ও সমাবেত জনতার আকুলিতে কবি গাইলেন—

‘বীণা বাজাও হে মম অন্তরে।

সজনে, বিজনে, বন্ধু সুখে দুঃখে বিপদে,

আনন্দিত তান শুনাও হে মম অন্তরে।’

কবিগুরুর সিলেট আগমনের পরদিন (২০ কার্তিক ১৩২৬ বঙ্গাব্দ) সকাল আটটার সময় সিলেট টাউনহল প্রাঙ্গণে শ্রীহট্টবাসীর পক্ষ থেকে কবিকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এ সভায় পাঁচ হাজারের অধিক নারী-পুরুষ সমাগত হয়েছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে উকিল আম্বিকা বাবুর রচিত কবি প্রশস্তিমূলক একটি গান পরিবেশন করেন শ্রীযুক্ত যতীন্দ্রমোহন দেব চৌধুরী। এ গানে বেহালা বাজান সংগীতজ্ঞ যামিনীকান্ত রায় দস্তিদার। অনুষ্ঠানে ‘কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভ্যর্থনা কমিটি’র সভাপতি সৈয়দ আব্দুল মজিদ শ্রীহট্টে কবির আগমনে শ্রীহট্টবাসী কতটুকু আনন্দে উদ্বেলিত তা বর্ণনা করে উর্দু ভাষায় বক্তৃতা করেন। সভায় কবির প্রতি অভিনন্দনপত্র পাঠ করেছিলেন শ্রী নগেন্দ্র দত্ত। সভায় কবিগুরু প্রায় দেড় ঘণ্টা সাবলীল ভাষায় ‘বাঙ্গালীর সাধনা’ সম্বন্ধে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা করেন।

ওইদিনই সন্ধ্যা সাতটার সময় টাউন হলে কবি বক্তৃতা দেবেন বলে ঠিক করা ছিল। সন্ধ্যা সাতটায় অনুষ্ঠান হবার কথা থাকলেও বিকেল চারটা বাজার আগেই পুরো টাউন হল লোকে-লোকারণ্য। সভাস্থলে তিল ধারণের ঠাঁইও ছিল না। অনুষ্ঠানের শুরুর আগেই অনেকেই টাউন হলের ভেতরে স্থান পাননি। তাই বাধ্য হয়ে শত শত মানুষ বাইরেই দাঁড়িয়ে রইলেন। সাতটার সময় ফিটনে করে কবি সভায় এসে পৌঁছালেন। সেদিন কবির বক্তৃতা যারা শুনেছিলেন তারা ভাগ্যবান। সিলেটে কবি যে সকল অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেছিলেন তারমধ্যে এ অনুষ্ঠানের বক্তৃতাই ছিল সেরা। তাঁর এ বক্তব্য প্রাণস্পর্শী ও উদ্দীপনাপূর্ণ ছিল। বক্তৃতায় তিনি ভারতবর্ষের দুর্দশার যথার্থ কারণ বর্ণনা করলেন। তিনি বললেন, ‘নিম্ন বর্ণের লোকদের প্রতি উচ্চ বর্ণের অবজ্ঞা ও অপ্রীতিই ভারতবর্ষের অধঃপতনের কারণ। ভারতবর্ষের পক্ষে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে একতাসূত্রে আবদ্ধ হওয়া।’ বক্তৃতার উপসংহারে তিনি বলেন, ‘সূর্য্য পূর্বদিকেই উদিত হয়। বাংলা ভারতের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। সমগ্র ভারতবর্ষ তাই আজ বাংলার দিকে আশা করে চেয়ে আছে। বাঙালীকেই আজ ভারতের এই জনজাগরণ যজ্ঞে পৌরোহিত্য করতে হবে।’ কবি বলেছিলেন, ‘এক নয়, দুই নয়, বহু বহু রাজা আমাদের শোষণ করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘কাগজের নৌকাতে করে ভবসমুদ্র পার হওয়া যায় না। মানে দরখাস্ত পেশ করে স্বরাজ মেলে না।’ কবি ‘অধর্ন্মেন এধতে তাবত্ ততো ভদ্রানি পশ্যতি ততঃ সপত্নান্ম জয়তি সমূলন্তু বিনশ্যতি’ তাঁর অতিপ্রিয় এই শ্লোকটি আবৃত্তি করে তাঁর বক্তৃতা শেষ করেছিলেন।

কবি যে কয়দিন সিলেটে অবস্থান করেন সে কয়দিন তাঁর খাবার গ্রহণের সময় শ্রীযুক্তা নলিনীবালা চৌধুরীসহ মহিলারা তাঁর টেবিলের চারপাশে ঘিরে বসতেন। মেয়েদের নিকট কবি বেশ রসালো গল্প বলতেন। সিলেটে ‘ডিঙামাণিক’ নামক এক প্রকার সুদৃশ্য কদলী দেখে কবি বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, মাণিককে ডিঙেয়েছি বটে।’

কবির জন্যে একটি এগারো হাত গরদের কাপড় কিনে আনা হয়েছে দেখে তিনি সহাস্যে বলেন, ‘আমার মতো ঢেঙা লোকও শ্রীহট্টে (সিলেটে) আছে না কি?’ সেই দারুণ শীতেও রাতে তাঁর শোবার ঘরের দরজা-জানালা খোলা থাকত। শ্রীহট্ট থেকে বিদায়বেলায় কবি শ্রীহট্ট নিয়ে রচনা করলেন—

‘মমতাবিহীন কালস্রোতে

বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হোতে

নির্বাসিতা তুমি

সুন্দরী শ্রীভূমি।

ভারতী আপন পন্য হাতে

বাঙালীর হূদয়ের সাথে

বাণীমাল্য দিয়া

বাঁধে তব হিয়া।

সে বাঁধনে চিরদিন তরে তব কাছে

বাঙলার আশীর্বাদ গাঁথা হয়ে আছে।’

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৫ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন