ঢাকা শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
৩১ °সে


কবিকে সম্ভাষণ, কবিকে পরামর্শ

কবিকে সম্ভাষণ, কবিকে পরামর্শ

কবি বিমল গুহ এবং আমি সমবয়সী না হলেও কাছাকাছি বয়সের। তার এবং আমার এসএসসি পরীক্ষার বছর এক—১৯৬৮। এসবই অবশ্য জেনেছি অনেক পরে। তার বহু আগে প্রথমে পড়েছি তার কবিতা। প্রথম থেকেই এও লক্ষ করেছি, বিমল গুহর কবিতায় তার সময়ের এবং একটি সচেতন ও প্রতিবাদী মনোভঙ্গির পরিচয় সবসময়েই ধরা থাকে। কবি বিমল গুহর এবং আমার প্রজন্মের কবিদের পক্ষে বুঝি এটা না হয়েই পারে না। পরে এও জেনেছি, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বিমল গুহর পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন। কবি নিজেও তখন দেশত্যাগ করে ভারতের ‘শরণার্থী শিবিরে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেন।’ এসবই একযোগে বিমল গুহর কবিতার একটি জনঘনিষ্ঠ এবং প্রতিবাদী মেজাজ নির্মাণ করেছে, বোঝা যায়। তার কাব্যগ্রন্থগুলোর শিরোনাম কাউকে এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জানাতে পারে : অহংকার, তোমার শব্দ, সাঁকো পার হলে খোলাপথ, স্বপ্নে জ্বলে শর্তহীন ভোর, নষ্ট মানুষ ও অন্যান্য কবিতা, প্রতিবাদী শব্দের মিছিল। এসব শিরোনাম একইসঙ্গে বিমল গুহর কবিমনের গড়ন এবং মান সম্পর্কে কিছু ধারণা দেয়।

সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আরেকটি জৈবনিক তথ্য উল্লেখ করব। তথ্যটি প্রাসঙ্গিক। কবি বিমল গুহর মাতামহ রজনী সেন ছিলেন লোককবি ও গায়ক। নরানাং মাতুলক্রম। সুতরাং একটি কবিমন যে বিমল গুহ উত্তরাধিকারসূত্রেই লাভ করেছিলেন—এরূপ খানিকটা ভাবা যায়। বিমল গুহ নিজেই নিম্নরূপ লিখেছেন :

‘আমার মাতামহ স্থানীয় লোককবি ও গায়ক রজনী সেন, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, আমাদের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন। আমার মা তার দ্বিতীয় ও কনিষ্ঠ সন্তান। দাদু আমাদের বাড়িতে এলে তার কাজ ছিলো আমাকে নিয়ে কবিগানের আসর বসানো। আমি যখন সেভেন/এইটে পড়ি, তখন আমি প্রায়ই প্রতিপক্ষ কবিয়ালের ভূমিকায় দাদুর সঙ্গে বসতাম। অবশ্য চটজলদি শব্দের সঙ্গে শব্দ মেলানোর কাজটা দাদুই করে দিতেন। আমি জানি না, আমার কবিতা লেখার পেছনে এর কোনো ভূমিকা থাকতে পারে কি-না।’

২.

আমাদের প্রজন্মের অর্থাত্ আমার, বিমল গুহর এবং সমসাময়িক কবিদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রোমান্টিকতা। এই রোমান্টিকতার সঙ্গে অবশ্য যুক্ত—যুগপত্ বিপ্লবী কিংবা প্রতিবাদী এক মনোভঙ্গি এবং দেশপ্রেম ও সময়চেতনা। কবি বিমল গুহর কবিতারও কমবেশি এরূপ এক প্রকৃতি, এমনই সব বিষয়বস্তুও। প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতায় বিমল গুহ লিখেছিলেন :

‘বিষাদগ্রস্ত মানুষের মুখ দেখলে আমার আগুনের কথা মনে পড়ে

আমি আলোকবর্তিকা হাতে তোমাকে খুঁজি

তোমার উদ্দীপ্ত ইচ্ছার কথা ভাবলে

তিলতিল জন্ম নেয় রক্তকণিকায় স্পন্দন

আমি নবসৃষ্টির রূপকার।’

রোমান্টিকতার যে বিষয়ীগত (Subjective) স্বভাব, তাতে যাবতীয় বিপ্লব-দ্রোহ-পরিবর্তনের নিয়ামক হতে পারে কোনো ব্যক্তি বা বক্তার ভূমিকা। এই ব্যক্তি বা বক্তা তখন সাধারণ ব্যক্তি মানুষ, নাগরিক জন; রোমান্টিক কবি—যে জনতার প্রতিনিধি, তা বোঝা যায়।

‘তুমি চোখ বুজলেই মন্দিরের ঘণ্টা আর বাজাবে না কেউ

জ্বলবে না দীপ

মানুষে জন্তুতে হবে গলাগলি, লোকালয়ে হানা দেবে

পাগলা মহিষ—বাঁকা শিঙে গেঁথে নেবে

প্রেমপ্রীতি—ভালবাসা-চুম্বনের যমজ উল্লাস।’

[ঐ, পৃ. ৩৯]

স্পষ্টতর জনজীবন-বিষয়ক অনেক কবিতায়ও অনেক সময় তা সম্ভব হয়নি। কবির ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা—আবেগে মধ্যস্থতায়ই শুধু প্রাণ পেয়েছে দেশ বা দশের ধারণা। বিমল গুহর অধিকাংশ রচনা সম্পর্কেই আরো স্পষ্ট উচ্চারণের প্রত্যাশা তৈরি হয়ে শেষ পর্যন্ত যেন তা পূরণ হয় না। আমার প্রিয় এই কবির কবিতার এই বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে সাধারণভাবে আরো কিছু কথা বলতে চাই।

৩.

প্রথমে বাংলাদেশের সাহিত্যিক তথা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ সম্পর্কে। আমাদের দেশে মূল উত্পাদন ব্যবস্থা—কৃষিতে যেমন কঠিন কর্ষণ বা জীবনপণ শ্রমদানের দরকার হয় না, তার সঙ্গে মিল রেখেই বুঝি আমাদের জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক এলাকায়ও কঠোর সাধনার পরিবেশটি অনুপস্থিত। আমার নিজের কবিতা সম্পর্কেও যত্নের অভাবে কথাটি পাঠক-সমালোচক বারবার বলেছেন।

আমার প্রিয় কবি বিমল গুহ বলেছেন বটে তার নিজের কবিতাকেন্দ্রিক এক জীবনের কথা, ‘এখন কবিতা লিখতেই হবে’— এমন একটি মানসিক অবস্থানে এসে গেছি, তা না হলে মনোবেদনায় ডুকরে কেঁদে ওঠা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’ কিন্তু আমার ধারণা যে সে ক্ষেত্রে এবারে, এখন থেকে, তিনি প্রতিটি কবিতাকেই আরো বেশি সময় দেবেন। একই কবির কবিতা বলে মনে হতে হবে, একই রকম চমত্কার মনে হতে হবে, বিমল গুহর সকল কবিতাকে। ‘তুমি চোখ বুজলেই’ যেমন চমত্কার, তেমন; ‘আলোকবর্তিকা’ যেমন তেমন। এ উপলক্ষে একই সংকল্প আমিও গ্রহণ করেছি।

বাংলাদেশের ব্যক্তিত্রুটি-ব্যর্থতা যেমন আছে, রয়েছে পরিবেশেরও ক্ষতিকর ভূমিকা। এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশেও, ইতিমধ্যেই বলেছি—আলস্যে, শৈথিল্যে পশ্চাত্পদ। কিন্তু, শুধু তা-ই নয়, এখানে সামাজিক রাজনৈতিক আদর্শবোধের শুধু নয়, সাহিত্যিক আদর্শবোধেরও খুবই অভাব। এ ভূখণ্ড ’৪৭-এর দেশভাগের মধ্য দিয়েই পড়ে যায় একটি সহজচালের প্রতারণায়, কিংবা ক্ষতিকর ইশারায়। যেন, শুধু Religion বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই একমাত্র মাপকাঠি, তারই ভিত্তিতে গড়ে তোলা যায় স-ব, মেটানো যায় বহুত্বের/বৈচিত্র্যের দাবি, মুছে ফেলা যায়, সমগ্র প্রাক্কালের ইতিহাস-ঐতিহ্য। জরুরি সব বোধ এবং আদর্শের বড়ো সেই শূন্যতার পূরণ এখনো হয়নি।

বর্তমানে নানাভাবে ছড়িয়ে পড়ছে ভারসাম্যহীনতা। একচ্ছত্রতার এবং একক প্রাবল্যের মনোভাব। এ যে কোনো এক অংশে, তা নয়, শুধুই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দিক থেকে, তা নয়। সমন্বয় এবং সংশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যাত্রার প্রয়োজন বোধ করে না—যে গতকাল নির্যাতিত হয়েছে, সেও। সকল জাতীয়তাবাদই প্রবল হয়ে উঠতে চাইছে, বলা হচ্ছে ধর্মে-ধর্মে দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্য দিয়েই মীমাংসা হবে। এমন ধর্ম মানবজাতিকে ধারণ করবে কীভাবে? পালটা আধিপত্যের মনোভাব দেখা গেছে নারীবাদী তত্ত্বেও, সম্পূর্ণ শুদ্ধতার দাবি। শক্তি এবং প্রশ্নগুলো উঠে আসায় আপত্তি নেই। কিন্তু আপেক্ষিক এবং তুলনামূলক মনোভাব ছাড়া সংশ্লেষণ হবে কী করে? চূড়ান্ত শুদ্ধতার এবং শ্রেষ্ঠত্বের দাবি যদি থাকে সকলেরই। দ্বান্দ্বিক নিরসনের তত্ত্ব এখনো অমোঘ কি না, সে কথা সকলেই ভেবে দেখতে পারেন। সম্মেলক সে ভবিষ্যতে ব্যক্তি মানুষের এবং ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ভূমিকাই হয়ে উঠতে পারে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। তেমন বিন্যাসের অনুসরণে কি না জানি না, কবি বিমল গুহর উচ্চারণকে ক্রমশই অধিকতর নিঃসঙ্গ শোনাতে থাকে। আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলনও সেখানে থাকতে পারে। ‘মধ্যরাতে দ্রুত এক স্টিম ইঞ্জিন’ যখন ‘কালো ধোঁয়া ছেড়ে’ মগজের স্টেশনে থামে, কবি তখন দেখেন :

‘ঝাঁক ঝাঁক কৃষ্ণ বাদুড়

কোলাহল করে ঘরময়—পাখা জাপটায়,

বাতাস নিথর হলে

সেই কালো বাদুড়ের পাখা থেকে

ধীরে ধীরে

ধীরে ধীরে

মাতাল নেশার মতো গাঢ় হিম-অন্ধকার

চতুর্দিকে নামে।’

—এ যেন ব্যক্তিগত হতাশার শুদ্ধ এক সামষ্টিক ব্যাখ্যা। যতই দিন গেছে, বিমল গুহর কবিতায় ‘ঘোর অন্ধকার’-এর উপস্থিতি প্রবল হয়েছে। সত্য অন্ধকারকে ধারণ করে কবিতা তার বরং উজ্জ্বল হয়েছে। কবি এখানে নাগরিক জন, দ্রষ্টা জনও বটে। আমরা আশা করব, এই দর্পণ হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিমল গুহর কবিতা যেন আমাদের কবিতাকে আরো উচ্চতর শিল্পমানের দিকে নিয়ে যায়, মানবের জীবনকেও। বিচিত্র, বর্ণিল অভিজ্ঞতার টুকরো টুকরো উপস্থাপনার যে রীতি বিমল গুহর, তার যোগফল যেন পাঠককেও নিয়ে যায় বহু এবং বিচিত্রের মূল্য অনুধাবনের দিকে। পাঠক যেন যুগপত্ আলোকিত ও আনন্দিত হয়। বিমল গুহর নিম্নোদ্ধৃত ছোটো কবিতাটির জন্য আমি তাকে দীর্ঘদিন, চিরদিন ঈর্ষা করব :

‘আহত পাখির মতো এক খণ্ড মেঘ

বিশাল ঝাপটায় ভাঙে জানালার কাচ,

হেলথ-কেয়ার ক্লিনিকের পর্দা কাঁপিয়ে

দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়ে—

অসুস্থ কেবিন তড়িঘড়ি তাকায় বিস্ময়ে

নীতিযুদ্ধে পরাজিত সন্তানের

সমস্ত সাহস যেন কেঁপে ওঠে

[নারীর আদল : ঐ, পৃ. ১৫৭]

এখানে আমাদের প্রজন্মের, আমাদের প্রজন্মের কবিদের আদর্শবোধ একাকার একটি জীবনদৃশ্যের সৌন্দর্য ও বাস্তবতাকে অর্জন করেছে।

বিমল গুহ [২৭ অক্টোবর ১৯৫২]

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৫ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন