ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬
৩৫ °সে


বাবর আজমের উপন্যাস

বাবর আজমের উপন্যাস

দ্বিতীয় পর্ব

বছর দুই আগে আমি একটি উপন্যাস লিখি। নাম—বাবর আজমের উপন্যাস।

উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র বাবর আজম লেখক। তরুণ লেখক। সে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকার ঈদসংখ্যায় উপন্যাস লেখার সুযোগ পেয়েছে। এই নিয়ে সে খুব উত্তেজিত। এমন একটা সুযোগ! সে ভাবছে, ঈদসংখ্যার সম্পাদকও তাকে বলেছেন, এমন একটা উপন্যাস লিখতে হবে, যেন সবাই বুঝতে পারে সে যথার্থই শক্তিশালী লেখক। বাবর আজমের মাথার ভেতর তাই উপন্যাসের চিন্তা ঘুরছে। সে নানারকম ভাবছে, কিন্তু কোনো কাহিনিতেই সে সন্তুষ্ট হতে পারছে না।

বিকালের দিকে সে বাড়ির কাছের পার্কে এসে বসে। ঠিক করে, এখানে বসে ঠাণ্ডা মাথায় উপন্যাসের কাহিনি সাজিয়ে নেবে।

উপন্যাসের অন্য দুই চরিত্র শরাফত ও আসিফ। তারা দুজনই ব্যবসায়ী। তারা একে অন্যকে দেখতে পারে না। তাদের দুজনের নজর পড়েছে এই প্রায় পরিত্যক্ত পার্কের ওপর। তারা এটি দখলের চেষ্টায় আছে। তার জন্য বেশ কিছু ব্যবস্থা তারা নিয়েছে। আরো একটি কাজ বাকি, আপাতত, সেটি হলো—একটি লাশ। দেখাতে হবে—পার্ক মাদকসেবী, ছিনতাইকারী, মাস্তানদের আড্ডাখানা হয়ে উঠেছে। তারা সেখানে মেয়ে ও মাদকের ফূর্তি করে, গোলাগুলি করে, এইসব।

শরাফত ভাড়া করা বাহিনী পাঠায় গোলাগুলি করে লাশ ফেলার জন্য। কাকতালীয়ভাবে আসিফের বাহিনিও একই সময়ে এসে হাজির হয়। একই উদ্দেশ্য দু দলের। তারা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে আরম্ভ করে। গুলিতে মারা যায় বাবর আজম। মারা যায় আরো একজন। তার নাম বাবুল, তালা বাবুল। এক দলের হয়ে গুলি চালাতে এসেছিল সে। সে মারা যায় তারই মহল্লার বন্ধু, আরেক দলের হয়ে আসা মন্নাফের গুলিতে।

হাসপাতালে বাবর আজম ও তালা বাবুলের পরিচয় হয়। বাবর আজমের মাথায় তখনো উপন্যাসের চিন্তা। সে ভাবে, কে তাকে, তাদের গুলি করল, কেন করল—এই নিয়ে সে উপন্যাস লিখবে। উপন্যাস নিয়ে মাথাব্যথা নেই বাবুলের। সে গরিব ঘরের ছেলে। টুকটাক মাস্তানি করে ভাড়া খেটে তার দিন চলে। তবে উপন্যাস নিয়ে মাথাব্যথা না থাকলেও তাকে প্রভাবিত করতে পারে বাবর আজম। রাতে বাবর আজম আর সে বেরিয়ে পড়ে হাসপাতাল থেকে। তাদের সামনে একের পর এক দরজা খুলতে থাকে।

উপন্যাসটি পড়ে অনেকেই বলেছিলেন, এর দ্বিতীয় পর্ব লেখা উচিত। আমারও সেরকমই মনে হয়েছিল। দ্বিতীয় পর্ব শুধু নয়, এর তৃতীয়, চতুর্থ পর্বও লেখা যেতে পারে।

দ্বিতীয় পর্ব লেখা শুরু করেছি। শুরুর অংশ এখানে প্রকাশিত হলো। এর কলেবর অবশ্যই আরো অনেক বাড়বে।

পাঠকদের সুবিধার জন্য, বিশেষ করে যারা ‘বাবর আজমের উপন্যাস’ পড়েননি, ঐ উপন্যাসের শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা এখানে ব্র্যাকেটের ভেতর সংযোজিত হলো।

[শরাফত স্পষ্ট গলায় বলল—এইখানে আমাদের দোষটা তোমরা কোথায় দেখলা!

তারা বসেছে মুখোমুখি। একপাশে বাবর ও বাবুল, অন্যপাশে শরাফত, মেজবা ও রাহাত। তারা সরাসরি প্রসঙ্গে চলে গেলে, তাদের, বিশেষ করে শরাফতকে পার্ক দখল করার জন্য গুলি চালানোর দায়ে অভিযুক্ত করা হলে, সে উত্তরে ঐ কথা বলল।

বাবর, শরাফতের এরকম অস্বীকারে কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও সেটা সে তখনই কাটিয়ে নিতে পারল—আপনি বলছেন, আপনার কোনো দোষ নেই?

নাহ। আমার কীসের দোষ!

কেন আপনার দোষ নেই?

আগে কও, কেন আমার দোষ আছে?

আপনি, আপনারা দুজন পার্ক দখল করতে চেয়েছেন।

হুঁ, চাইছি।

আপনাদের প্ল্যানের অংশ হিসেবে ওখানে দু জনকে গুলি করেছেন...।

দুইটা না, একটা। এই যে, বাবুল না কী নাম বললা, এ তো মরছে বেহুদা।

বাবুল হাসল—এইটা তো আমি প্রথম থেইকাই জানি। মন্নাফে যদি...।

ঠিক আছে, একজন। আমি কেন গুলি খেলাম?

আহারে ভাই, তুমি কেন ঐসময় ঐখানে ছিলা, এইটা একবারও বিচার করবা না?

মানে! আমি কোথাও থাকতে পারব না!

তুমি না থেকে অন্যজন থাকলে সে গুলি খাইত। তোমার সমস্যা হইত না।

আচ্ছা, আমি না খেতাম, অন্য কেউ খেত, এটা তো ঠিক?

আমি একবারও বলব না এইটা মিথ্যা।

অর্থাত্ কেউ না কেউ গুলি খেত?

শরাফত মেজবা ও রাহাতের দিকে তাকিয়ে নিয়ে মাথা দোলাল—কেউ না কেউ তো খাইতই।

সেটা কি আপনাদের দোষ হতো না?

ওমা, কেন!

কেন দোষ হতো না!

আরে, গোলাগুলি যে হবে, একটা যে পড়বে—এইটা তো প্ল্যানের অংশ। তুমি প্ল্যানের মধ্যে পড়ছ। এইখানে আমার বা আসিফের দোষ কেন দেখতেছ!

কারণ আপনারা গুলি করেছেন।

শরাফত হতাশ চোখে একবার মেজবা একবার রাহাতের দিকে তাকাল—এ দেখি কিছুই বুঝতেছে না!

আপনারা অন্যের জমি দখল করার জন্য গুলি করেছেন, এটা মিথ্যা!

আরে বাবা, আমি কি একবারও বলছি—মিথ্যা।

গুলি করা অন্যায় বা অপরাধ না?

শরাফত সজোরে দু পাশে মাথা নাড়ছে।

আপনাদের কী মত? অন্যায়, না অন্যায় না? বাবর রাহাত আর মেজবার দিকে তাকাল।

মেজবা মাথা নাড়ল—এইটারে অপরাধ বলা ঠিক হবে না।

রাহাত মাথা নাড়ল—এইটাকেও যদি অপরাধ বলি...!

আশ্চর্য!

এর মধ্যে আশ্চর্যের কী দেখতেছ! আচ্ছা বলো, তুমিই বলো, তুমি যদি আমাদের জায়গায় থাকতা, তুমি কী করতা?

আমি আর যা-ই হোক, এলোপাতাড়ি গুলি চালাতাম না, কাউকে ফেলতে আমি চাইতাম না। লাশের ব্যবসায় আমি নাই।

তাইলে জমিও তুমি পাইতা না।

জমি... জমি আমার দরকার নাই।

সেইটা ভিন্ন বিষয়।

বাবর রাগ রাগ চোখে বাবুলের দিকে ফিরল—শুনেছ, তুমি এদের কথা শুনেছ!

জি দন, শুনতেছি তো।

কী সব বলে দেখ...।

আমার তো ন্যায্যই মনে হইতেছে। লাশ দিয়া শুরু না করলে তারা আউগাইতে পারতেন না।

বাবুল, বড়ই আশ্চর্য হচ্ছি, তুমি এদের পক্ষে বলা শুরু করে দিয়েছ।

এদের পক্ষে তো কিছু বলতেছি না!

তাহলে তুমি কী বলছ এসব!

আমি শুধু যেইরকম, সেইরকম বলতেছি।

ওসবই তাদের পক্ষে বলা।

না। শরাফত হাত তুলল। তুমি আমার কথা শুনো। জমি যখন আছে, তখন ঐটা দখল হবে। দখল করতে হলে দখল করার নিয়ম মানতে হবে। তুমি... মেজবা। শরাফত মেজবার দিকে তাকাল।... না, তুমি পারবা না।... রাহাত, কী যেন বলে—এলিয়েন?... ঠিক আছে, না?... বাবর, তুমি এলিয়েনের মতো কথা বললে তো হবে না। আমার আর আসিফের, যদিও সে আমার শত্রু, যেমন কুনো দোষ নাই, দোষ এই মেজবা আর রাহাতেরও নাই। তারা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে মাত্র।

গুলি করার জন্য লোক নিয়োগ, থানা ম্যানেজ, পত্রিকা ম্যানেজ—এইসব পেশাগত দায়িত্ব!

জি। পেশা নানারকম হয়। কই, থানা-পুলিশ কেন ম্যানেজ হয়, এই নিয়া তো দেখি চিন্তিত হও না।

আপনি কি ভেবেছেন আমার লেখায় ঐ প্রশ্ন আমি তুলব না?

তুইলো। এখন শুনো, এই যে ঘটনা কে ঘটাইছে, এইটা খুঁজতে বাইর হইছ, এইটা হইতেছে তোমার হিংসা।

হিংসা!

আমাদের তো একটা পড়লেই চলত। পড়ছ তুমি। কিন্তু তুমি না পইড়া যদি অন্য কেউ পড়ত, ঘটনা কে ঘটাইছে, তা তুমি খুঁজতে বাইর হইতা?

হয়তো হতাম না, হয়তো হতাম। নিজের ঘটনা বলে বেশি উত্সাহী হওয়া খারাপ না।

আচ্ছা, খারাপ না। তখন আড্ডায় বইসা চুকচুক চা খাইতা আর বলতা—দ্যাশটার যে কী হইল!... তা, এখনো সেইরকম ভাবো। আর, জানা থাকুক যে—এইখানে নিয়মের বাইরে কিছুই হয় নাই।

যত কুযুক্তি, সব আছে আপনাদের কাছে।

বলো। বইলা যাও।

পুরো উপন্যাস ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৮ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন