ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬
৩৪ °সে


দাম্পত্য

দাম্পত্য

আমি ফুলের মতো পবিত্র চরিত্রের অধিকারী নই। ফুলের চরিত্র যদি খুব ভালো হতো শত পতঙ্গ আকৃষ্ট করত না। মহুয়া কেমন সে নিজেই ভালো জানে।

আমাদের দাম্পত্য কলহের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কলহের শেষ পর্যায়ে উপসংহারের কাছাকাছি এসে তা আবার নতুন করে শুরু হয়।

আরো একটি বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করার মতো নয়, কলহের মাঝখানে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন বিরতির মতো অনিবার্য কোনো বিরতি। সে বিরতির সময় এমনও হয় যে, মহুয়া হেসেও উঠে। আমার সঙ্গে নয়, কলহের মাঝখানে আমাদের ব্যস্ততার কথা না জেনে যারা ফোন করে তাদের কারো সঙ্গে। ফোন অধিকাংশই মহুয়ার, দু-একদিন আমারও এসেছে।

বিরতি থেকে ফিরে এসে ‘যা বলছিলাম’ বলে মহুয়া বিরতির আগের শেষ বাক্যটি থেকে শুরু করে। আমার সমস্যা ভুলে যাওয়ার; বিরতির আগে আমার পক্ষে যেসব যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলাম তার প্রায় সবগুলোই ভুলে যাই এবং এক পর্যায়ে কলহ থেকে বেরোনোর জন্য কণ্ঠস্বর ও মাথা কিছুটা নিচু করে বলেই ফেলি, ‘সব দোষ আমার।’

মহুয়া তখনই ছেড়ে দেবে মনে করার কারণ নেই। আমার স্বীকারোক্তির পিঠে আবারও প্রশ্ন করবে। ‘তোমার নয় তো কার?’

—বললামই তো আমার।

—বলবেই তো, কারণ দোষটা তোমার।

আমি বলি, ‘ঠিক।’

—ঠিক মানে? তুমি আমার সাথে বিটলামি করছ?

—বিটলামি মানে?

—বিটলামি মানে জানো না।

—জানি বিটলস নামের বিখ্যাত পপগ্রুপের সিঙ্গাররা যা করত, তাই তো বিটলামি। নাকি ভুল বললাম?

মহুয়াকে আমার এই বিটল ব্যাখ্যা সারাদিনই চটিয়ে রাখবে। আমার দিকে ছুঁড়ে মারার মতো হাতের কাছে নতুন কেনা নিজের মোবাইল ফোনটা ছাড়া তেমন কিছু না থাকায় এবং আমি খবরের কাগজটা নিয়ে দ্রুত বাথরুমে ঢুকে পড়ায় একটি দাম্পত্য কলহ খুব বেশিদূর এগুতে পারল না। মহুয়ার ভালো দিকটা স্বীকার করতেই হবে, দামি কোনো কিছু ভাঙে না। ছুড়েও মারে না। তার বড় কারণ খাট, ওয়ারড্রোব, সোফাসেট, ডাইনিং টেবিল—বড় বড় প্রায় সব জিনিসই আমার কেনা, ছুড়তে হলে ছোটগুলো ভালো, যার প্রায় সবই মহুয়ার কেনা। নিজের জিনিসের ওপর ঝুঁকিটা নিতে চায় না।

ঘণ্টা তিনেকের একটি সংক্ষিপ্ত সফরে মহুয়ার ছোটবোন ড্যাফোডিল আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ করছে। যাওয়ার সময় মহুয়া নাকি স্পষ্ট দেখেছে সিএনজি অটোতে উঠতে উঠতে ড্যাফোডিল আমার দিকে একটি ফ্লাইং কিস ছুড়ে মেরেছে।

মহুয়া এবার খুবই ঠাণ্ডা মাথায় বলল, ‘আচ্ছা, এক হাতে কি তালি বাজে?’

হাত ও তালির উপমাটির গন্তব্য তখনো ধরতে পারিনি।

মহুয়া বলল, ‘তুমি আস্কারা না দিলে ড্যাফোডিল তোমাকে ফ্লাইং কিস দেবার সাহস পায় কেমন করে?’

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তার অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে বলি, ‘তাই দিয়েছে নাকি? আমি তো কিছুই টের পেলাম না।’

মহুয়া বলল, ‘একচুয়ালি ফ্লাইং কিস দিলে কিছু টের পাবার কথা নয়। তার মানে তুমি টের পেতে চাচ্ছিলে, ফ্লাইংয়ে তোমার পোষায়নি, তুমি রিয়েল কিস চাচ্ছ।’

—আমি তো সেরকম কিছু বলিনি।

—তোমার বলতে হবে কেন, আমি তো ওই হারামজাদি আসার পর থেকেই চোখকান খোলা রেখেছি।

আমি বললাম, ‘মহুয়া এসব কী বলছ, ড্যাফোডিল তোমার আপন বোন!’

—আমার বোনকে আমি বলেছি, তাতে তোমার এত জ্বলছে কেন? কেইসটা আমি ঠিকই ধরেছি।

—বেশ তোমার স্টকে আরো খারাপ কোনো গালি থাকলে ওটাই দাও, ভালো করে দাও, একবারের জায়গায় সাতবার দাও। আমার কী, তোমার বোনকেই তো দেবে! দাও।

মহুয়া বলল, ‘যাই হোক, তুমি কিন্তু ধরা পড়ে গেলে। আমি শুধু তোমার রিঅ্যাকশন টেস্ট করলাম। রেজাল্ট পজেটিভ। আমি আজই জানিয়ে দিচ্ছি এ বাড়িতে ড্যাফোডিল অবাঞ্ছিত ঘোষিত হয়েছে। সে কখনো আর এই অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে পারবে না। আই উইল নট অ্যালাউ হার। তোমার একশ গজের ভেতর আসতে পারবে না।

মহুয়ার কাছ থেকে অন্তত একশ গজ দূরে, মহুয়ার বাবার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর মিলাদ মাহফিলের সামিয়ানার বাইরে ড্যাফোডিলকে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কি সত্য তুমি আমাকে ফ্লাইং কিস দিয়েছিলে, যা আমি দেখিনি কিন্তু মহুয়া দেখে ফেলেছে?’

ড্যাফোডিল বলল, ‘প্র্যাকটিস করছিলাম, অনেককেই দিয়েছি, আপনাকেও দিয়ে থাকতে পারি। সিএনজি ড্রাইভারকেও দিয়েছি। আবরার বলল আমার ফ্লাইং কিসটা তেমন স্মার্ট হয় না। গ্রাম্য মেয়েদের ফ্লাইং কিসের মতো। তারপর আমাকে দেখিয়ে দিল এবং সারাদিন প্র্যাকটিস করতে বলল।’

—আবরারটা কে?

—কে সেটা হয়তো বলা যাবে, একজন রিটায়ার্ড এয়ার কমোডোর ফকরুল হাসানের ওয়াইফের ছেলে। মানে ওয়াইফের আগে বিয়ে হয়েছিল সেই ঘরের ছেলে। এতে বরং আবরারের লাভই হয়েছে। দুই বাবার প্রপার্টিই পাবে। ফ্লাইং শিখছে পাইলট হবে। আপনি আসলে জানতে চাচ্ছেন আমার সাথে আবরারের কী সম্পর্ক? আপাতত বন্ধুর, তবে যে দিকে মোড় নিচ্ছে, আমরা এখনো ফ্লাইং কিস স্টেজে আছি, আর একটু এগোলেই নিউজটা ব্রেক করব। মা কিছু বলবে না কিন্তু মহুয়া আপু একটা না একটা ঝামেলা পাকাবেই। আপনি তো আপনার স্ত্রীকে ভালো করেই চেনেন। আবরার যদি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সুইপার হতো কিংবা বাসে ট্রেনে দাদ ও চুলকানির মলম বিক্রি করত, তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। মা না মানলেও মহুয়া মেনে নিত। কিন্তু তার বরের চেয়ে বড় কেউ, মানে যোগ্য কেউ আমার বর হলে মহুয়া তাকে ঠেকানোর জন্য যা কিছু করা দরকার সবই করবে।

ড্যাফোডিল যাই বলুক, এমনকি যদি তা সত্যিও হয়, স্বামী হিসেবে আমি এটাকে মহুয়ার গুণ বলেই বিবেচনা করব। নিজের স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক যত কলহেরই হোক তার শীর্ষ অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে যে নারী উদ্যোগী, সেই না যথার্থ স্ত্রী।

ড্যাফোডিল অধ্যায়টি খুবই সংক্ষিপ্ত। আবরার শেষে পর্যন্ত তাকে প্রত্যাখ্যান করায় মহুয়া বলল, ‘আমি জানতাম এটাই হবে।’

অতঃপর ড্যাফোডিল অস্ট্রেলীয় সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করতে ক্যানবারা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায় এবং বৃত্তির সময় হওয়ার পর গাফ হুইটলাম জুনিয়ার নামের এক সাদা অস্ট্রেলিয়ানকে বিয়ে করে সেখানেই রয়ে যায়। মহুয়ার অজান্তে আমাকে জানায়, তার স্বামী সাবেক প্রধনামন্ত্রী গাফ হুইটনামের দৌহিত্র। ড্যাফোডিলের পরামর্শেই মহুয়াকে বলি, ‘নাম শুনলেই তো মনে হয় ওখানকার সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ির হেলপার কি ড্রাইভার।’

মহুয়া জানাল, অস্ট্রেলিয়ার সাদারা নাকি নিয়মিত গোসলও করে না। ওয়াক থু!

এরকম সংক্ষিপ্ত দু-একটি এপিসোড হিসেবের মধ্যেই আনিনি।

মহুয়ার সঙ্গে আমার দাম্পত্য কলহের আশি ভাগ জুড়ে রয়েছে মমতাজ মহল, কুড়ি ভাগ জুড়ে মোনালিসা দোমিঙ্গোস। একদিন বা দুদিনের কলহের আশি কিংবা কুড়িভাগ নয়, মহুয়ার সঙ্গে একত্রিশ বছরের দাম্পত্য কলহের আশি ভাগ মমতাজ মহলকে নিয়ে এবং শেষে ষোল বছরের কলহের কুড়িভাগ পর্তুগিজ তরুণী মোনালিসা দোমিঙ্গোসকে নিয়ে।

আমাদের ঝগড়াটা যেভাবেই শুরু হোক, উপসংহারে মমতাজ মহল এসেই যাবে, যদি মমতাজ না হয় তবে মোনালিসা দোমিঙ্গোস।

দুই.

আমাদের বিয়ের তারিখটা ৩১ মার্চ।

আমরা ফার্স্ট হ্যাপি অ্যানিভার্সারি করে চাইনিজ রেস্তোরাঁয় খেয়ে হাসতে হাসতে হাত ধরাধরি করে বাড়ি ফিরে আসি। ঘরে ঢোকার এক মিনিটের কম সময় আগে মহুয়া বলল, ‘আমার বান্ধবী কনক প্রেগন্যান্ট, সামিয়া টুইন বেবির মা হয়েছে, নুরুন্নিসা খানমের ডেলিভারি দু-একদিনের মধ্যেই। আর দেরি নয় আনিস, নো মোর পিলস, নো মোর কনডমস, নো মোর অ্যানি আদার প্রোটেকশন, এবার বেবি নেবই।’

আমি বললাম, ‘ওয়ান্ডারফুল!’

মহুয়া বলল, ‘এটা আমার অ্যানিভার্সারি রেজ্যুলুশন। বেবিসহ সেকেন্ড অ্যানির্ভাসারি সেলিব্রেট করব।’

আমি বললাম, ‘দ্য আইডিয়া!’

মহুয়া বলল, ‘আজই।’

আমি উল্লাসিত ঘোড়ার মতো পা তুলে লাফিয়ে উঠে বলি, ‘ইয়েস।’

মহুয়া বলল, ‘তাহলে তোমাকেও একটা রেজ্যুলুশন নিতে হবে, নো মোর স্মোকিং।’

—গ্র্যাজুয়ালি কমিয়ে আনব।

—নো, র্যাডিক্যালি। আজ থেকেই। যখন ইচ্ছে করবে একটা করে চকোলেট খাবে। ব্ল্যাক চকোলেট হার্টের জন্যও ভালো।

—তাহলে শেষ সিগারেটটা খেয়ে আসি?

—মনে রেখো এটাই শেষ।

সিগারেট খেতে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তার শেষ মাথার কর্নার শপে চলে আসি। দিনে দু-তিনটের বেশি কখনো খাইনি। রাতের বেলা এখানে এসে একটা সিগারেট আর এক কাপ দুধচা খাওয়া আমার রুটিন খাবারেরই অংশ। কাল থেকে যদি ছেড়েই দিতে হয় শুধু চা খাবার জন্য এখানে আসব না। এখনই যাওয়ার সময় কনডেন্সড মিল্ক নিয়ে যাব।

চা মহুয়াও খায়। তারটা গ্রিন টি। আমার খেতে একটুও ইচ্ছে করে না। স্বাদটা বাজে।

মহুয়া ঢাকা শহরের ফার্মগেট এলাকার মেয়ে। বটমলি হোমস স্কুলে পড়াশোনা করেছে, আইএসসি হলিক্রস কলেজ থেকে, তারপর সায়েন্স থেকে সরে গিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইকোনমিক্স পড়েছে।

পুরো উপন্যাস ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৮ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন