ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
৩১ °সে


শেয়ার বাজার বানাইলা মোরে...

শেয়ার বাজার বানাইলা মোরে...

কোনোভাবেই রক্ষা করা গেল না। প্রথমে গেল সরকারি চাকরির বয়স। তাতে সমস্যা হয়নি। বেকারত্বের উপলব্ধি হচ্ছে। কিছু টাকা আছে। শিগগিরই উদ্যোক্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা যাবে। তখন দেশ-বিদেশের নানা পদক মিলবে আর বিভিন্ন (সেরার) তালিকায় নিজের নাম ওঠানোর সুযোগ থাকবে।

তারপর গেল গার্লফ্রেন্ড। তাতেও তেমন একটা ক্ষতি-বৃদ্ধি হয়নি। সরকারি চাকরি হয়নি বলে গার্লফ্রেন্ড চলে গেলেও, যে পয়সা আছে, তাতে অন্তত বিয়ে হবে। আর নিজের গার্লফ্রেন্ড চলে (অন্যের হয়ে) যাওয়ার মানে আরেকজনের এক্স-গার্লফ্রেন্ডকে বউ হিসেবে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে গেল!

সবশেষে গেল শেয়ার বাজারে পুঁজি করা সমস্ত অর্থ! সঙ্গে করে নিয়ে গেল ‘জীবিত’ ও ‘মৃত’ থাকার সুযোগও। উদ্যোক্তা হয়ে সফলকাম হলে ভালো একটা ভবিষ্যত্ হতো আর ভালো ভবিষ্যত্ হলে বিয়েটাও হতো! আর কে না জানে বিবাহিত পুরুষ মাত্রই মৃত!

অনেকদিন ধরেই লাগাম ধরেও শেয়ার বাজারের পতন ঠেকানো যাচ্ছিল না। এখন নামতে নামতে খাদে নামার দশা। সেদিন পাড়ার মাকুম ভাইয়ের চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম আমরা। অবশ্যই সিঙ্গেলকাপে ভরতি চা! আগে শেয়ারে চা খেতাম আমরা। তখন শেয়ার বাজারই ছিল আমাদের ধ্যানজ্ঞান। এখন এমন অবস্থা হয়েছে—শেয়ার বাজারে লগ্নি হারিয়ে শেয়ারে চা খেতেও বড্ড ভয় পাচ্ছি।

আমাদের শেয়ার বাজার নিয়ে হতাশাজনক কথাবার্তা শুনে মাকুম ভাই বললেন, ‘শেয়ার বাজারের ধস কমাতে সরকার বিদেশ থিকা ক্রেন কিনা আনবার পারে!’

আমরা অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, ‘ক্রেন দিয়ে কী হবে?’

মাকুম ভাই বিগলিত হাসি হেসে বললেন, ‘শেয়ার বাজারের ধস ঠেকাতে, কহনো কহনো ধসে পড়া অবস্থা থিকা তারে টাইনা তুলতে ক্রেনই সেরা উপায় হইবার পারে!’

আমরা বাগরুদ্ধ হয়ে প্রত্যুত্তরে আর কোনো কথা বলতে পারলাম না। অনেকক্ষণ বাদে একজন বলল, ‘বুঝলাম না—ক’দিন আগেও বাজার কীরাম চাঙ্গা আছিল। এখন হঠাত্ কী হইল? এতটা ধস! ক্যামনে কী!’

মাকুম ভাই আবারও সেই বিগলিত হাসি হেসে বললেন, ‘ঢাকার তীব্র জ্যামে বইসে থাইকচেন কহনো?’

‘ঢাকার জীবন তো জ্যামেই কাটে।’

‘তাইলে তো জানেনই। গাড়িগুলা যহন জ্যামে আইটকা থাহে, তহন দ্যাখবেন দুইডা গাড়ির মইধ্যে এট্টুও ফাঁকা নাই। কিন্তুক যহন ‘সিগন্যাল’ ছাড়ার সময় আহে, দ্যাখবেন, পোরথোমে গাড়িগুলান বিকট শব্দ কইরা স্টার্ট মারে। হ্যারপর ট্রাফিক সিগন্যাল দেওয়ার আগেই গাড়িগুলা একটু কইরা সামনে আউগায়। এহন বলেন তো দেহি, এত গাদাগাদির মইধ্যে গাড়িগুলা এই সামনে আউগাইন্যার জায়গাডা পায় কইত্তে?’

‘বুঝলাম। কিন্তু এর সাথে শেয়ারের কী সম্পর্ক?’

‘বুঝবার পারলেন না? শেয়ার বাজারের ধস ব্যাপারটা ওই জ্যামের মইধ্যের ফাঁকা জায়গার মতোন। ঘাপটি মাইরা থাহে। যহনই শেয়ারের সূচক উপ্রে উঠবার লাগে, তহনই তার খোলস বের হইয়া আহে!’

মাকুম ভাইয়ের অদ্ভুুত যুক্তি শুনে মাথা পুরাই আউলা-বাউয়া হয়ে গেল। দোকান থেকে বেরিয়ে আনমনে হাঁটতেছিলাম। হঠাত্ ওপাড়ার আব্দুল হাই ভাইয়ের সাথে দেখা। নামে হাই হলেও উচ্চতায় যথেষ্ট পিছিয়ে। পাঁচ ফিট হতেও তিন ইঞ্চি গ্রেজ দেওয়া লাগে। মানে পায়ে সর্বদা তিনইঞ্চির হাইহিলযুক্ত জুতো পরতে হয় তাকে।

ভাই বললেন, ‘কী ব্যাপার, চেহারাখানা পাতিলের তলার মতো অন্কার কেন?’

মনের ক্ষোভ ঝাড়তে বললাম, ‘উত্তপ্ত চুলায় বসেছিলাম, তাই।’

‘কাহিনী কী? খুলে বলো।’

সব শোনার পরে আব্দুল হাই ভাই বললেন, ‘পরাজয়ে ডরে না বীর।’

মেজাজ এমনিতেই খারাপ। শেষমেশ আর ধরে রাখতে পারলাম না। বললাম, ‘ভাই, মোটিভেশনাল স্পিচ শুনতে চাই না। এক কাজ করেন—বই লেখেন। আগামীবার বইমেলায় বেস্টসেলার লেখক হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না।’

আব্দুল হাই ভাই চাপা হাসি হেসে বললেন, ‘শোনো, আমরা প্রত্যেকেই কষ্টে আছি, বুঝলা। শেয়ার বাজারে পতন হলেই কেবল মানুষ কষ্ট পায়, তা নয়। কখনো কখনো শেয়ার বাজারের ঊর্ধ্বগতিও মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে।’

অবাক হয়ে তার মুখের পানে তাকিয়ে রইলাম। ভেবে কুল পেলাম না—ইনিও কি শেয়ার বাজারে লগ্নি করেছিলেন? সব হারিয়ে শেষমেশ কি পাগল বনে (পড়ুন শহরে) গেছেন!

ভাই নিজে থেকেই এর ব্যাখ্যা দিলেন, ‘তোমার ভাবি আর আমি মিলে একটা যৌথ শেয়ার খুলেছিলাম। একখান প্লাস্টিকের ব্যাংক কিনে তাকে টাকা জমাচ্ছিলাম দুজনে। তোমার ভাবি রোজ টাকা রাখত, আমার মানিব্যাগ থেকে নিয়ে। আর আমি রাখতাম নিজের পকেট থেকে। এভাবে দিনদিন দুজনের যৌথ শেয়ারটি বেশ চাঙা হয়ে উঠছিল। ভেবেছিলাম—এই টাকা দিয়ে ফ্রিজ কিনুম। যৌথ শেয়ার। ঘরের যৌথ কাজে লাগে এমন কিছু কিনলেই তো ভালো। অবশ্য টিভিও কিনতে পারতাম। কিন্তু কেনার পরে সেটা তোমার ভাবির একচ্ছত্র ভোগদখলে চলে যাবে—এই ভেবে আর ওপথ মাড়াইনি। কিন্তু ও আজ কী বলল জানো?’

‘কী?’

‘একটা ডায়মন্ডের রিং কিনে দিতে বলল। বলল, ওই টাকায় না হলে আমি যেন বাকিটা নিজের পকেট থেকে যোগ করে নিই!’

আব্দুল হাই ভাইকে বিদায় দিতে না দিতেই দেখি ছোটভাই লিমন পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড়ে আসছে। মনে আফসোস জন্মাল—ইশশ, শেয়ার বাজারটা যদি এভাবে ঘোড়ার মতো তেজস্বী হতো!

লিমন আফসোসের সুরে বলল, ‘ভাই সর্বনাশ হয়ে গেছে। একজনের লগে ফেসবুকের পাসওয়ার্ড শেয়ার করছিলাম। সে আমার অ্যাকাউন্টই হ্যাক করে দিছে।’

আমি বত্রিশ দন্তের হাসি দিয়ে বললাম, ‘বেশ হয়েছে। দুনিয়ায় শেয়ার জিনিসটাই ভয়ংকর। দেখিস না—ফেসবুকে কোনো কিছু শেয়ার দিলে লাইক কম আসে! একটা গান শোন তাহলে...

যে জন শেয়ারের দরদ (কষ্ট) বোঝে না... তার সাথে নাই লেনাদেনা...’

লিমন যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকেই চলে যেতে উদ্যত হলো। যেতে যেতে ও বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ‘ভাই পাগল হয়ে গেছে রে... যাই, নিউজটা সবার কাছে শেয়ার করি গিয়ে!’ g

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ মে, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন