ঢাকা শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬
৩৩ °সে


বাড়ি নম্বর নিরানব্বই ঝাড়ি নম্বর একশ

বাড়ি নম্বর নিরানব্বই ঝাড়ি নম্বর একশ

অয়েজুল হক

রজায় হাতুড়ি পেটার মতো শব্দ হচ্ছে। এমনিতেই মফিজ সাহেব মেজাজী মানুষ। দুইতলা পুরাতন বিল্ডিং ভেঙে এগার তলা ফ্লাট করার পর মেজাজ-দেমাগ এগার গুণ বেড়েছে। বিকট শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি লাফ দিয়ে দরজার দিকে ছুটে যান। মনে মনে ভাবেন, যে ফ্লাটের যে গাধাই হোক, দরজা খুলেই কান পেঁচিয়ে একটা থাপ্পড় দেবেন। তাঁর এ বিলাসবহুল আবাসিক ভবনে যার ডোরবেল চোখে পড়ে না অথবা ব্যবহার জানে না এমন ছাগল মার্কা মানুষের উপযুক্ত প্রাপ্তি আরো কঠিন হওয়া দরকার।

দরজা খুলে দেখেন বেশকিছু মানুষ। ফ্লাটের কেউ না। পোশাকআশাকে মার্জিত, ভদ্রতার ছাপ। হয়তো কোনো ফ্লাটের অতিথি। ভুল করে তাঁর দরজায় ঘা-গুঁতা শুরু করেছে।

‘দেখে তো ভদ্রলোকের মিছিল মনে হচ্ছে।’

একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক ঘাড় নেড়ে সায় দেয়, ‘হ্যাঁ, ভদ্রলোক। মিছিল?’

‘তা ডোরবেল চোখে দেখেন না?’

‘হ্যাঁ।’

‘তো ঘা-গুঁতা শুরু করলেন কেন?’

পেছন থেকে একজন বললেন, ‘কথা কম বলেন।’ আরেকজন বললেন, ‘কেবল দরজায় ঘা-গুঁতা হয়েছে, আপনারগুলো এখনো বাকি।’

মফিজ সাহেব চমকে ওঠেন। বলে কী! কড়া উত্তর দেওয়ার আগেই সামনের ভদ্রলোক নরম সুরে বলেন, ‘সিঁড়ি কই?’ মেজাজ হিটার হয়ে ধুপ করে জ্বলে ওঠে, ‘সিঁড়ি কই মানে! উপরে উঠে এসেছেন না! হেলিকপ্টার নিয়ে তো আর আসেননি। আকাশ থেকে পড়ার কথাও নয়। হয় সিঁড়ি না হয় লিফট। বাড়ির মালিক কিন্তু আমি। মফিজুর রহমান।’

মফিজ সাহেব লেখাপড়া না জানলেও দু-একশ লেখাপড়া জানা মানুষ কিনে পকেটে পুরে রাখার যোগ্যতা তাঁর আছে!

‘হ্যাঁ, আপনার কাছেই জানতে চাই, সিঁড়ি কই?’

কী বলে! কিসের সিঁড়ি! এতগুলো গাঁজাখোর তাঁর বাড়িতে কেন? ভাবনার উত্তর মিলে যায় পর মুহূর্তে।

‘আমরা সরকারি লোক। তদন্তে এসেছি। আপদকালীন সময়ের জন্য যে বিকল্প সিঁড়ি থাকার কথা, সেটা কই?’

বিষয় উপলব্ধি করতেই গরম মেজাজ একেবারে এয়ারকুলারের ঠাণ্ডা বাতাস হয়ে নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। বিনয়ের সঙ্গে মফিজ সাহেব বললেন, ‘আমি নিরীহ মানুষ। আপদ-বিপদে জড়াতে চাই না। এড়িয়ে চলি। এজন্য ওই আপদকালীন সিঁড়ি করিনি।’

‘ও, আচ্ছা।’

বাড়ি পর্যবেক্ষণের পর প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে থাকেন বড়কর্তা, ‘ফায়ার অ্যালার্ম কই?’

‘ফায়ারের সময় অ্যালার্ম না বাজিয়ে দৌড়ে পালানো বুদ্ধিমানের কাজ।’

‘আচ্ছা।’

আরেকজন বললেন, ‘এত চিপা চিপা গলি কেন?’

‘স্যার, ঢাকা শহরে বাস করি। বাপ-দাদার ভিটা। চিপাচাপায় অভ্যস্ত হয়ে...’

মফিজ সাহেবের কথা শেষ না হতেই ভিন্ন প্রশ্ন, ‘গ্যাস কই?’

‘কী যে বলেন! বাড়ির সবাই আস্ত একেকটা সিলিন্ডার। গ্যাসের বড়ি, ক্যাপসুল ফেল মেরে যাচ্ছে।’

একজন ধমক দেন, ‘ফাজলামো না করে ভদ্রভাবে জবাব দেন।’

‘আগুন নেভানোর গ্যাস—সিলিন্ডার—ফায়ার এক্সটিংগুইশার।’

এতগুলা মানুষ, হুমকি ধামকি আর অদ্ভুত কথায় মফিজ সাহেব কিছুটা হতবিহ্বল। কী বলবেন আর কে খেঁকিয়ে উঠবে কে জানে! তবু বলতে হবে। মিনমিন করে বললেন মফিজ সাহেব, ‘আগুন নেভানোর গ্যাস-সিলিন্ডার মানে! আর গুঁইসাপ কী এই ঢাকা শহরের কোনো বাড়িতে খুঁজে পাবেন?’

কেউ হাসে, কেউ গালি দেয়, কেউ খেঁকিয়ে ওঠে। মফিজ সাহেব নির্বিকার।

বড়কর্তা আবার প্রশ্ন করেন, ‘বাড়ির নাম্বার কত?’

‘নিরানব্বই স্যার।’

‘নকশার সাথে বাড়ির বিন্দুমাত্র মিল নেই। পাঁচতলার অনুমোদনে করেছেন এগার তলা। আপনার মতো ভদ্রবেশী মানুষকে আসলে ইচ্ছামতো পেটানো দরকার।’

বিরাট অংকের জরিমানা, মামলা কোনোটা বাদ রাখলেন না বড়কর্তা। যাওয়ার সময় নিচে থাকা কর্মচারীদের বললেন, ‘সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিন।’

কিছুক্ষণের ভেতর চলে যায় তদন্তকারী দল। মফিজ সাহেব দাঁড়িয়ে থাকেন অনেকটা কংক্রিটের মতো, শক্ত হয়ে।

রফিকুল পঞ্চম তলার ফ্লাটের বাসিন্দা। অফিসের জন্য বেরোবেন। নিচে নেমেই দেখেন একটু দূরে মফিজ সাহেব। হাসছেন না কাঁদছেন, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে দুটোর ভেতর একটা নিশ্চিত—তিনি হয় কাঁদছেন না হয় হাসছেন। হাসা বা কাঁদার অনেক কারণ থাকতে পারে। এগার তলা ফ্লাটের মালিক মফিজ সাহেবের অবস্থা দেখে কৌতূহল নিয়ে কাছে গিয়ে দাঁড়ান রফিকুল। প্রশ্ন করেন, ‘কী হয়েছে?’

মফিজ সাহেব ইশারায় বিলবোর্ড দেখান। বড় করে লাল রঙে লেখা—বাড়িটি ঝুঁকিপূর্ণ। অনুমোদিত নকশায় নয়। যেকোনো দুর্ঘটনায় বাসিন্দাদেরও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।

‘হুঁ।’

‘কেউ কী আর থাকবে?’

‘প্রশ্নই আসে না। আপনার বাড়ি থেকে মরবে নাকি মানুষ! যারা বাঁচবে তাদের আবার জেরার সম্মুখীন হতে হবে!’

‘যান মিয়া। ভাবসাবে তো মনে হয় কোনোদিন মরবেন না।’

‘দেখুন, বাজে কথা বলবেন না। একটা থাপ্পড় মেরে দেব কিন্তু।’

মফিজ সাহেব অবাক হন। বুকটা বেলুন ফাটার মতো ফটাস করে ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে গেছে। সরকারি-বেসরকারি ঝাড়িতে একেবারে নাজেহাল দশা তাঁর।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৩ আগস্ট, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন