ঢাকা সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৩ °সে


ভালো কাজ

ভালো কাজ

সফিক সাহেব জুম্মার নামাজ শেষে বাসায় ফিরেছেন কিছুক্ষণ আগে। দুপুরের খাবার খাবেন, কিন্তু তার ডাইনিং টেবিলের সঙ্গী নাতি সিয়ামকে না পেয়ে ডাকাডাকি শুরু করলেন। ‘কোথায় আমার দাদু ভাই? ‘তাড়াতাড়ি এস, ক্ষুধা পেয়েছে খুব। কোথায়?’ শ্বশুর মশাইয়ের এমন হৈ চৈ শুনে পুত্রবধূ রায়হানা এসে হাজির। ‘বাবা, আপনি খান, ও আসবে না, রাগ করে বারান্দায় বসে আছে।’

কেন কিসের রাগ, কী এমন হলো যে রাগ করে একাই বসে থাকতে হবে!’ এ কথা বলে সফিক সাহেব নাতিকে নিয়ে আসতে উদ্যত হলেন। রায়হানা বাধা দিয়ে বলল, ‘আপনি বসেন বাবা, আগে কারণটা বলে নিই।’ সফিক মাস্টার কারণটা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়লেন। ‘বলো তো মা, কী ব্যাপার? আগে শুনে নিই।’

‘কয়েক মাস ধরে ওর একটা বাতিক হয়েছে বাবা। কোনোভাবেই তা দূর করা যাচ্ছে না।’ ‘বাতিক! কিসের বাতিক? তা ডাক্তার দেখাচ্ছ না কেন? এ তো ভালো কথা না, আজই ওকে ডা. রহমানের কাছে কাছে নিয়ে যাব। কী হয়েছে এটা জানা দরকার।’ রায়হানা বাধা দিয়ে বলল, ‘সে রকম কিছু না বাবা। সায়েম ভালো আছে। বাতিকটা অন্যরকম। ‘আরে বাবা, সেটাই বলো না, বাতিকটা কী ওর?’

‘সায়েম এখন প্রায়ই ওর বাপের কাছ থেকে টাকা চেয়ে নেয়। তাও আবার ৫০-১০০ টাকা না, ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। এর আগে দুইবার নিয়েছে। গতকাল ওর আব্বুর কাছে ৩০০ টাকা চেয়েছে। দেয়নি ও। পরে আমার কাছে চেয়েছিল। আমিও দেইনি বলে রাত থেকে রাগ করে আছে। ও নাকি নাস্তা, ভাত কিছুই খাবে না। একরকমের অনশন করছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যাবে।’ সফিক সাহেব জানতে চাইলেন, ‘টাকা দিয়ে ও কী করে?’ ‘জানি না বাবা। শুধু বলে লাগবে। ভালো কাজ করবে। ওর স্যার বলেছেন, পারলে তোমরা ভালো কাজ করবে, দুঃখী মানুষদের পাশে দাঁড়াবে।’ সফিক সাহেব ব্যাপারটা অনেকটা আঁচ করতে পেরেছেন। তাই পুত্রবধূকে অভয় বললেন, ‘ভেবো না মা, আমি দেখছি’।

সায়েম মন খারাপ করে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তার দূরে গাছগুলোর দিকে। দাদার ডাক শুনে ফিরে তাকাল। সফিক সাহেব ‘দাদু ভাই’ বলে পরম আদরে তার কাঁধে হাত রাখলেন। ‘খাবে’ বলে নাতিকে ডাইনিং টেবিলে এনে বসালেন। এরপর জানতে চাইলেন, ‘টাকা নিয়ে তুমি কী করো দাদু ভাই?’ ‘ভালো কাজ করি’ সায়েমের উত্তর। ‘আহা, বুঝলাম তো, ভালো কাজ করো। তা কাজটা কী? একটু বুঝিয়ে বলো আমাকে।’ সায়েম সবিস্তারে বলতে লাগল, ‘দাদা ভাই, মানুষতো মানুষের জন্য কাজ করে, তা-ই নয় কি?’ ‘হ্যাঁ, তা-ই তো।’ ‘আমি প্রথমবার আব্বুকে বলে ২০০ টাকা নিয়ে আমাদের ক্লাসের ছোটনকে দিয়েছি—ওর ব্যাগ কেনার জন্য। ওরা তো খুব গরিব, তাই। এরপর ৩০০ টাকা নিয়ে আমাদের আয়াকে দিয়েছি—ওর ছেলের চিকিত্সার জন্য। এবার ২০০ টাকা চেয়েছি দারোয়ান মামাকে দিব—ওনার চোখের চিকিত্সার জন্য। ওনার নাকি চোখের ছানি অপারেশন করতে হবে। কিন্তু আম্মু আমাকে খুব বকা দিয়েছে। আমি কিছু খাব না দাদু, তুমি আগে এ সমস্যার সমাধান করবে, তারপর অন্যসব।’

সফিক সাহেব নাতির কথা শুনে একটু হাসলেন। মানুষের জন্য সায়েমের সহানূভূতি দেখে তিনি খুবই খুশি হলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ দাদু ভাই, তুমি ভালোই করেছ। মানুষ মানুষের জন্য। এতে স্রষ্টাও খুশি হন। শোন, এবারের টাকাটা আমিই তোমাকে দেবো।’ বলতেই সায়েম দাদুর গলা জড়িয়ে ধরল। রায়হানা দাদু-নাতির সমঝোতা দেখে হাসছে। সফিক সাহেব ধমকের সুরে রায়হানাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগলেন, শোনো বউমা, আমার দাদু ভাই ভালো কাজ করছে। এটা কোনো বাতিক না। তাই এ ব্যাপারে তোমরা ওকে সাহায্য করবে। এ বলে দাদা ও নাতি দুপুরের খাবার খেতে শুরু করল।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৮ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন