ঢাকা শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
৩১ °সে


কাজলের ছবি আঁকা

কাজলের  ছবি আঁকা

স্কুলের পড়া তৈরি করছিল কাজল। কিন্তু কোনোভাবেই পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছে না। হালকা বাতাসে দোল খাওয়া নদীতীরের কাশফুল যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

কাজলের বাবা একজন মাঝি। নদী পারাপারের পাশাপাশি মাছ ধরে সংসার চালান। কাজলও মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে নদীতে যায়। বাবা-মা’র ইচ্ছা কাজল পড়াশোনা করে তাদের মুখ উজ্জল করবে। কিন্তু কাজলের ভালো লাগে জল, হাওয়া, মাটি আর সবুজের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে। নদীর কিনারে মাছের অপেক্ষায় বসে থাকা শিকারি বক হতে ইচ্ছে করে তার। নদীর জলে ডিঙি নৌকায় ভাসছে সে আর তার বাবা আশরাফ সিদ্দিক। বাবা জাল দিয়ে মাছ ধরছেন আর রুপালি মাছগুলো তুলে খলাইয়ে রাখছে কাজল—এমন একটি দৃশ্য সারাক্ষণ তার চোখের সামনে ঝুলে থাকে। মায়ের গলায় তার ভাবনায় ছেদ পড়ে—কাজল, তাড়াতাড়ি তৈয়ার হও, স্কুলের সময় হইছে।

মনটা খারাপ হয়ে যায় কাজলের। আহা! কী সুন্দর একটা দৃশ্যের ভেতরে ডুবে ছিল সে! মনে মনে ভাবে—এই সুন্দর দৃশ্যটা যদি সে আঁকতে পারত। কাজল মায়ের কাছে বায়না ধরে, মা, স্কুলে সবার রংপেনসিল আর আঁকার খাতা আছে। বাবারে কও না আমারেও কিইনা দিতে।

ঠিক আছে, আইজই বলব। তুই তাড়াতাড়ি স্কুলের জন্য তৈয়ার হইয়া নে। তোর বাবা কিছুক্ষণের মধ্যেই আইসা পড়ব। কাজল বইখাতা গুছিয়ে স্কুলের জন্য তৈরি হতে চলে যায়। এরই মধ্যে বাবা এসে হাজির।

মা জানতে চান, কী গো আইজ এত দেরি ক্যান? মাছ পাওনাই নাকি?

পাইছি তো। বেইচ্চা আইছি। কাজল কই, তৈয়ার হইছে?

হইতেছে। মাইয়া কইছে তার জইন্য রংপেনসিল আর আঁকনের খাতা কিইনা আনতে হইবো।

ততক্ষণে কাজল স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে এসেছে।

বাবার হাত ধরে যেতে যেতে কাজল জানতে চায়, বাবা, মায় তোমারে কিছু কয় নাই?

কইছে তো। খাতা আর রংপেনসিল আইজই কিইনা দিমু, কিন্তু পড়াশোনাডা মন দিয়া করতে হইবো মা। আর ইশকুলে দুষ্টামি করা যাইবো না।

আমি তো দুষ্টামি করি না বাবা। তাই সব্বাই আমারে পরি বইলা ডাকে।

বাবা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেন—হ রে মা, তুই তো আমগো পরিই!

স্কুলশেষে বাড়ি ফিরে বাবার কিনে দেওয়া রংপেনসিল আর খাতা নিয়ে বসে যায় কাজল। আঁকতে বসে খাওয়া-দাওয়ার কথাও ভুলে যায় সে। পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আবারও আঁকতে বসে। কিন্তু যে দৃশ্যটা তার মনে গেঁথে আছে, তা সে কোনোভাবেই আঁকতে পারছে না। এভাবে তিন-চার দিন চেষ্টার পর ছবিটা ফুটে ওঠে—নদীর জলে ডিঙি নৌকায় ভাসছে কাজল আর তার বাবা। দুই পাড়ে কাশফুল, নদীর কিনারে ওত পেতে আছে বক। দূরে সবুজ দিগন্ত ছুঁয়ে আছে আকাশ। বাবা জাল দিয়ে মাছ ধরছেন আর কাজল মাছগুলো তুলে খলাইয়ে রাখছে।

ছবি আঁকার আনন্দে নাচতে থাকে কাজল।

স্কুলের গণিত স্যার গতকাল কাজলদের বাড়ি এসে মাকে বলে গেছেন—কয়দিন ধরে কাজল পড়াশোনায় বেশ অমনোযোগী। মা কাজলকে বেশ বকাঝকা করেন। বাবা বলেন, পোলাপান মাঝে মইধ্যে এমন একটুআধটু করতেই পারে।

ছবি আঁকার আনন্দে রাতে ঘুম হয় না কাজলের। পরদিন স্কুলে গিয়ে ক্লাস টিচারকে ছবিটি দেখায়। ক্লাস চিটার মুগ্ধ হয়ে বলেন, কাজল, ছবিটা আমার কাছে রেখে যাও। আগামীকাল নিয়ে যেও।

এক সপ্তাহ পর। শুক্রবার। স্কুল বন্ধ। মা-বাবাসহ খেতে বসেছে কাজল। এসময় বাড়িতে এসে হাজির গণিত স্যার। স্যারের ভয়ে এক দৌড়ে গিয়ে লুকায় কাজল। না-জানি আবার কী অভিযোগ নিয়ে এসেছেন স্যার। স্যার হাসতে হাসতে বাবাকে বলেন, আশরাফ, তোমাদের কাজল তো গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছে। দেখ, তার আঁকা ছবি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ‘কচি-কাঁচার আসরে’ প্রকাশিত হয়েছে! একথা শুনে কাজলের মা-বাবা তো খুশিতে আত্মহারা। কাজল বুঝতে পারে—এটা ক্লাস টিচারের কাজ। কাজল আনন্দে আর লজ্জায় নদীর তীরের দিকে দৌড়াতে থাকে...

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৫ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন