ঢাকা সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
২১ °সে

পুঁটির জীবন

পুঁটির জীবন

হেমন্তের আকাশে টুকরো মেঘের পানসি ভেসে বেড়ায়। কুয়ার জলে মা মাছের সাথে ঘুরে বেড়ায় ছোট্ট পুঁটি। এইতো সেদিনই জন্ম হলো। গায়ে নরম নরম আঁইশ। ভারি আদুরে মুখখানা। বেশ কয়েকজন ভাইবোন আছে তার। তবে এই পুঁটির গায়ের রং সবার থেকে আলাদা। চোখের ধারে কালো কালো ফুটকি। লেজের দিকটায় বাঘের মতন ডোরাকাটা। পেটের খানিকটা জায়গা সোনালি আর রুপালির মিশ্রণ। লেজ নেড়ে নেড়ে জলে ঢেউ তুলে সে যখন মায়ের পেছনে ছুটে চলে, অন্য মাছেরা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে।

কুয়াটা কচুরিপানায় ভরতি। তাই সূর্যের আলো পৌঁছায় না কুয়ার জলে। কখনো কখনো কচুরিপানা এদিক ওদিক সরে গেলে সূর্যের আলো দেখতে পায় মাছেরা। তখন কী যে উল্লাস! মাছেরা একবার এদিকে ছোটে তো আরেকবার ওদিকে ছোটে। ছোট্ট পুঁটিও তখন আনন্দে নাচানাচি করে, খলবল করে। ফুড়ুত্ করে ওপরে ওঠে আবার ডুবসাঁতার কেটে মায়ের কাছে চলে আসে। মা মাছ সন্তানের দুরন্তপনায় ভয় পায়। বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘অত ছোটাছুটি করে না বাবা। শেষে বিপদে পড়বে।’

‘জানো মা, আকাশটা ভারি সুন্দর। আমার যে আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে করে!’ মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে বলে ছোট্ট পুঁটি।

‘ধুর বোকা! আকাশ কি ছোঁয়া যায়! আমরা জলের প্রাণী। জল ছাড়া বাঁচতে পারব না।’ মা মাছ আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ছোট্ট পুঁটিকে। ‘তুমি এখনো ছোট। বাড়ি থেকে একদম বাইরে যাবে না।’

মায়ের কথা মন দিয়ে শুনলই না পুঁটি। রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে।

পরের দিন ভোরেই যেন তার স্বপ্ন সত্যি হয়ে গেল। দেখে চারদিকে ফকফকা আলো। জলের ওপর মাথা তুলতেই সূর্যটাকে দেখতে পেল। মজাই মজা! এতদিন মাথার ওপরে ভেসে থাকা কচুরিপানাগুলো উধাও! সব মাছেরা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। মা মাছেরা বুঝতে পারে আসল ঘটনা। মানুষের দল কচুরিপানা তুলে কুয়া পরিষ্কার করেছে। এখন জাল ফেলে সব মাছ তুলে নেবে। জোর গলায় চিত্কার করে ওঠে মা মাছেরা, ‘বাচ্চারা... জলদি গর্তে আসো। নইলে মারা পড়ব সবাই—খুব বিপদ আমাদের!’

ছোট্ট পুঁটি আকাশ ছোঁয়ার আনন্দে ভেসে ভেসে বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে এল। মায়ের ডাক তার কানেই যায় না।

হঠাত্ করে ছোট্ট পুঁটির মাথায় জোরে আঘাত লাগে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারায় সে।

প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে জ্ঞান ফিরে পেল ছোট্ট পুঁটি। আলো আর আলো! কাচঘেরা টলটলে জল। রঙিন নুড়ি ছড়িয়ে আছে নিচে। মোটা একটা টিউব থেকে বুদ্বুদ উঠছে জলে। আশপাশে আরো কত মাছ! বাহারি রঙের গোল্ড ফিস, তারামাছ, ক্যাটফিস! বড়ো বড়ো চোখ করে সবাই তাকে দেখছে। ক্যাটফিস তো ভারি বদমাশ! সুযোগ বুঝেই দিল এক ঢুস ছোট্ট পুঁটির শরীরে। ছিটকে পড়ে সে কাচের দেয়ালে। সে এক ভয়ানক অবস্থা! পুঁটির প্রাণ যায় যায়! শেষে গোল্ডফিশ এসে সান্ত্বনা দেয় পুঁটিকে। খাবার এনে পাশে রাখে।

কিছুই খায় না পুঁটি। চারদিকে তার কত্ত কত্ত খাবার। অন্য মাছেরা হুটোপুটি করে, লুকোচুরি খেলে। পুঁটির কোনো কিছুতেই মন বসে না। কেবলই মায়ের কথা মনে পড়ে। কুয়ার জীবনটা কত আনন্দের ছিল। ভাইবোনেরা মিলে খেলা করত। রাতে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকত। বুকটা ব্যথায় টনটন করে পুঁটির। এই কাচের জলাধারে খাবারের অভাব নেই, আলোর অভাব নেই। তবুও পুঁটির ওই অন্ধকার কুয়াটার কথাই মনে পড়ে।

দিনে দিনে নিস্তেজ হয়ে পড়ে শরীর। তার অসহায় অবস্থা দেখে ক্যাটফিস সুযোগ পেলেই গুঁতো মারে। জারের এক কোণে নুড়ির ওপর পড়ে থাকে পুঁটি। দমটা যায় আর আসে। চোখের সামনে কেবল মায়ের মুখ ভেসে ওঠে। ‘মা, মা’ করে কাঁদতে থাকে পুঁটি।

এদিকে পুঁটির নড়াচড়া দেখতে না পেয়ে মরে গেছে ভেবে মানুষেরা পুঁটিকে সেই কুয়ায় ফেলে দিয়ে আসে। কুয়ায় ফিরে দুর্বল শরীরে প্রথমে পুঁটি কিছুই বুঝতে পারে না। শরীরে একটু বল ফিরে আসতেই সব চিনতে পারে পুঁটি। লেজ নেড়ে নেড়ে ঠিক ফিরে চলে নিজের বাড়িতে। ওদিকে পুঁটিকে হারিয়ে তার মা কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। দরজায় পৌঁছে ছোট্ট পুঁটি যখন ‘মা’ বলে ডেকে ওঠে, সবাই ছুটে আসে ঘরের বাইরে। মা মাছ বুকে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট পুঁটিকে। আবার সবাই মিলে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে থাকে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন