ঢাকা শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
২৬ °সে

কোনো শিশু যেন ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি দিনও না কাটায় —ফাতিহা আয়াত

কোনো শিশু যেন ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি দিনও না কাটায় —ফাতিহা আয়াত

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকা প্রবাসী সাত বছর বয়সী ফাতিহা আয়াত। জাতীয় পর্যায়ের গণিত প্রতিযোগিতায় এরই মধ্যে পেয়েছে অনারেবল মেনশন। জাতিসংঘের বিভিন্ন সম্মেলনে নিয়মিত কথা বলে শিশুদের অধিকার নিয়ে। গত মাসেও জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছে। সে চায় পৃথিবীটা ছোটদের জন্য নিরাপদ হোক, কোথাও কোনো ভেদাভেদ না থাকুক। তারই কথা জানব আজ আমরা কচি-কাঁচার আসরের পক্ষ থেকে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন—জাজাফী

বাংলা জান? সাক্ষাত্কারটা বাংলায় নিই?

ফাতিহা :অবশ্যই, আমি তো বাসায় বাংলাতেই কথা বলি। আমার ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ যেন ইংরেজি হয়ে না যায়, সে বিষয়ে বাবা-মা ভীষণ নজর দিতেন। টিবিএন২৪ চ্যানেলে আমি ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম বাংলাতেই। আমার ইচ্ছা, জাতিসংঘে আমার পরবর্তী ভাষণটা আমি বাংলায় দেব।

চমত্কার! আমরা জানতাম, তোমার প্রতিভা গণিত ও বিজ্ঞানে, কিন্তু হঠাত্ করে তুমি জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়া শুরু করলে কেমন করে?

ফাতিহা :শুরুটা অনেকটা নাটকীয়ভাবে। ১১ অক্টোবর হলো আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস। জাতিসংঘ ২০১৭ সালে বিশেষ কারণে এই দিবসের আয়োজন করে ১৩ অক্টোবর। সেদিন আবার আমার জন্মদিন ছিল। বাবা-মা আমাকে জন্মদিনে চমক দিতে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ইকোসক চেম্বারে নিয়ে যায়। সেখানে কানাডার নারী বিষয়ক মন্ত্রী মারিয়াম মোনসেফ তার অফিসিয়াল ভাষণে আমার কথা উল্লেখ করেন এবং হলভর্তি বিভিন্ন দেশের সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তি আমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। এরপর থেকেই আমার জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রোগ্রামে সুযোগ আসতে থাকে।

বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘে তুমি কোন কোন বিষয় তুলে ধরেছ?

ফাতিহা :সর্বশেষ আমি এবছর ১২ আগস্ট বিশ্ব যুব দিবসের অনুষ্ঠানে জাতিসংঘে ভাষণ দিই। সেখানে আমি আমাদের দেশে রোহিঙ্গা যুবকদের দ্বারা বনাঞ্চল ধ্বংস ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরি। এর আগে আমি ১৬তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলন ২০১৯, ইউএন ডে ২০১৭ এবং উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাজেন্ডা ২০১৭-তে অংশ নিই। আমি শিশু নির্যাতন, লিঙ্গ বৈষম্য, পারিবারিক সহিংসতায় শিশুদের সমস্যা, শরণার্থী শিশুদের অমানবিক জীবন নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরি। এমনকি আমি যেসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিই, সেখানেও আমি শিশুদের আনন্দময় শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলি।

আচ্ছা, প্রতিযোগিতার কথা যখন বললে, কেমন লাগে ওখানে চ্যালেঞ্জ নিতে?

ফাতিহা :প্রতিযোগিতার শুরুর দিকে সবসময় আমি খুব নার্ভাস থাকি। মা তখন আমাকে সাহস দেয়। যেমন ২০১৭ সালের ন্যাশনাল ম্যাথমেটিক্স পেন্টাথলন অ্যাকাডেমিক টুর্নামেন্টে ইভেন্ট ছিল পাঁচটি। আমি প্রথম দুটি ইভেন্টেই হেরে যাই। এরপর মা আমাকে খুব সাহস দেয়। মায়ের দেওয়া সাহস পেয়ে আমি বাকি তিনটি ইভেন্টে জয়ী হই এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওই প্রতিযোগিতায় ‘অনারেবল মেনশন’ খেতাব অর্জন করি।

গণিত বিষয়ক তোমার কিছু ভিডিও টিউটোরিয়াল দেখি ইউটিউবে। ওগুলো করার সময় কেমন মজা হয়?

ফাতিহা :আমি তো ভীষণ এনজয় করি। আমাদের বাসায় লিভিং রুমের এক কোণে আমার স্টুডিও আছে। আগে বাবা-মা হেল্প করত, এখন আমি নিজেই সাজুগুজু করে লাইট-ক্যামেরা রেডি করে ভিডিও রেকর্ড করি, নিজেই প্রিমিয়ার প্রো অথবা আই মুভিতে সেটা এডিট করে আপলোড দিতে পারি।

তুমি এত কিছু কর, তোমাকে যদি জিজ্ঞেস করি তোমার হবি কোনটা, কী বলবে?

ফাতিহা :ছবি আঁকা আর চিঠি লেখা। আমি যে সব গল্পের বই পড়ি, পড়া শেষে আইপ্যাডে প্রোক্রিয়েট অ্যাপস ইউজ করে সেই বইগুলোর প্রচ্ছদ আঁকি। রিসেন্টলি আমি আলাস্কা বেড়াতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে সেখানে পরিচয় হওয়া ফরেস্ট রেঞ্জার, গ্ল্যাসিয়ার পাইলট, অ্যাডভেঞ্চার গাইড, ইকো আর্টিস্টদের চিঠি লিখেছি। সবাই আমার চিঠি পেয়ে ভীষণ খুশি।

এটা তো গেল কী করতে পছন্দ কর, আর কী করতে পছন্দ কর না?

ফাতিহা :বলতে পারি, যদি মাকে বলে না দেন। আমার খেতে ভালো লাগে না। মনে হয়, খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা না থাকলেই বুঝি ভালো হতো। তবে আমি যেদিন প্রথম রোজা রাখি, ইফতারের আগে মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি সব খাবার আর পানি খেয়ে ফেলব। বাবা তখন আমাকে বলেছিলেন, আমার যেমন লেগেছে তেমনই ক্ষুধায় তৃষ্ণায় প্রতিদিন কাতর থাকে ইয়েমেন, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, সোমালিয়ার হাজারো শিশু। সেদিন থেকেই আমি আমার অ্যাম্বিশন বদলে ফেলেছি।

তোমার অ্যাম্বিশন তাহলে এখন কী?

ফাতিহা :নাসা’তে গিয়ে অ্যাস্ট্রনট ডন থমাস, ন্যাশনাল সায়েন্স ফেস্টিভ্যালে অ্যাস্ট্রনট নিকল স্ট্রট আর সায়েন্স পোর্টে গিয়ে বিজ্ঞানী ন্যাথান রুথম্যানের সাথে দেখা করার পর থেকে আমিও অ্যাস্ট্রনট হতে চাইতাম। মনে হতো মহাকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখার চেয়ে আনন্দের বুঝি আর কিছু নেই। কিন্তু বাবার মুখে বিশ্বব্যাপী শিশুদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি—বড় হয়ে এমন কিছু করব যেন আর কোনো শিশু ক্ষুধা বা তৃষ্ণায় একটি দিনও না কাটায়। ধরুন, যদি জিওলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হই, বৃষ্টির পানি নষ্ট না করে আরো বেশি করে ব্যবহারের জন্য রেইন ওয়াটার রিজার্ভার বানিয়ে সেগুলোকে এমনভাবে কানেক্টিভিটি দেব যেন পৃথিবীর সব অঞ্চলের শিশুদের তৃষ্ণা মেটানো যায়। কিংবা যদি জেনেটিক সায়েন্টিস্ট হই, বিভিন্ন খাবারের ডিএনএ প্রোফাইল আবিষ্কার করে সেগুলোকে শিশুদের জন্য আরো বেশি পুষ্টিকর করতে চাই। মোটকথা নিজেকে শিশুদের জন্য কাজে লাগাতে চাই।

বাহ্! তুমি আসলেই অনেকের অনুপ্রেরণা। ধন্যবাদ তোমাকে।

ফাতিহা :আপনাকেও ধন্যবাদ।

ইমেইল অ্যাড্রেস : [email protected]

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
৩০ মে, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন