ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
২৩ °সে


ঈশ্বরদীর পথে পথে

ঈশ্বরদীর পথে পথে

n মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

অনেকটা হুট করেই ছুটে গিয়েছিলাম ঐতিহাসিক জেলা পাবনার ঈশ্বরদী। সকাল ৬টায় ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে বেলা ১১টার মধ্যেই পৌঁছে যাই। ফোন পেয়ে আগেই আলহাজ মোড়ে অপেক্ষায় ছিলেন ফেসবুক বন্ধু বাবু ভাই। সরাসরি এই প্রথম তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্। কুশলাদি বিনিময় পর্ব শেষে খাঁটি গরুর দুধের চা দিয়ে আপ্যায়ন শুরু করলেন। এরপর বাসায় নিয়ে চলল আরেক দফা আপ্যায়ন। আর দেরি নয়, এবার বিশাল আয়তনের ঈশ্বরদী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের কম্পাউন্ডে থাকা দুর্লভ প্রজাতির গাছগুলো দেখতে বের হই।

বেশ সাজানো গোছানো পরিবেশ। এত এত গাছ কিন্তু আবর্জনাপূর্ণ ঝরা পাতার স্তূপ নেই। ৬০.৪০ হেক্টর আয়তনের কেন্দ্রটির পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারটা বেশ ভালোই লাগল। হাঁটতে হাঁটতে দেশীয় বিলুপ্ত প্রজাতির বৃক্ষ বাগানে ঢুকি। থোকায় থোকায় নানা রঙের জামরুল, করমচা, চেরি, কলা, এই জনমে না দেখা সুগন্ধিযুক্ত ছোট্ট দানা সাইজের লেবুসহ আরো কত ফল গাছে গাছে ঝুলে রয়েছে। অসম্ভব সুন্দর দুর্লভ বৃক্ষ সংরক্ষণের সব আয়োজন রয়েছে এখানে। আশ্চর্য হলাম গাছের মধ্যেই ঝুলতে থাকা হলদে রঙা পাকা কলার ছড়ি দেখে। দেশে কার্বাইড আর ফরমালিনের অপব্যবহারের সময়েও এরকম দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। যাই এবার আম, জাম, জাম্বুরা, কাঁঠাল আর ড্রাগন ফলের পাশে। সব গাছ ছাড়িয়ে তত্কালীন জমিদার আমলের কিছু আম গাছ এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রয়েছে নারিকেল-সুপারি গাছের সারি সারি। আরো রয়েছে নিশ্চিন্ত মনে বসে থাকা ঝাঁকে ঝাঁকে সারস প্রজাতির শামুকখোল পাখি। পাখিগুলোর অবাধ বিচরণ সত্যিই ভালোলাগার। নানা ফুল-ফলের মৌ মৌ ঘ্রাণে বিমোহিত হয়ে, আমরা গাছতলা দিয়ে হেঁটে বেড়াই। প্রহরীরা ঝরে পড়া টসটসে পাকা ফল কুড়িয়ে এনে দেয়। মধুর ঘ্রাণ সহ্য করতে না পেরে ভরা পেটেও উদরপূর্তি চলল। আসর নামাজ শেষে ছুটলাম পদ্মার পাড়ে। মাঝখানে কিছুটা সময়ের জন্য লক্ষীকুণ্ডা গ্রামে গাড়ি থামিয়ে চিতল মাছের অভয়াশ্রম দেখি। পড়ন্ত বিকালে পাকশী গিয়ে পৌঁছাই। ব্রিটিশ আমলে তৈরি হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দিয়ে এখনো হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন চলাচল করে। এখন পর্যন্ত এটিই বাংলাদেশের একমাত্র দীর্ঘ রেল সেতু। ব্রিজটির নির্মাণকাল ১৯০৯ হতে ১৯১৫ সাল। সেতুটি দেখতেও বেশ চমত্কার। পাশেই ২০০৪ সালে উদ্বোধন করা লালন শাহ্ সেতু। পদ্মার বুকে পাশাপাশি দুটো সেতু যেন মানিকজোড়। বঙ্গবন্ধু সেতুর পর এটিই দীর্ঘতম সড়ক সেতু। বর্তমানে পদ্মা নদীর তীরে, সেতুদুটোর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য দূরদূরান্ত হতে আসা পর্যটকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সেই সুযোগে বিনোদনের নামে জুয়ার আসরও মিলেছে বেশ জমজমাট। যা সাধারণ দর্শনার্থীদের বেশ অস্বস্তিতে ফেলে। মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে ছুটলাম কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। আজ রাতে সেখানকার অতিথি ভবনেই আমাদের থাকার সুযোগ মিলেছে। কেন্দ্রের ভিতর সন্ধ্যা বাতি জ্বেলে দেওয়ার পর যেন এক অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য ভর করল। চারপাশ সুনসান নিরিবিলি। মাঝেমধ্যে নিশাচর প্রাণীর হাঁকডাক নিস্তব্ধতা ভাঙছে। রাত ১০টায় খাবার খেতে গিয়ে চোখ চড়কগাছ। মিসেস নাসরিন সুলতানা নানা পদের খাবার পরিবেশন করে পুরো ডাইনিং টেবিলে জট বাঁধিয়ে দিয়েছে। তারপরেও তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারছেন না। আন্তরিকতার সঙ্গে পরিবেশন খাবারের স্বাদও বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। ভোজন শেষে তথাকথিত ধন্যবাদ জ্ঞাপন না করে মিষ্টি হাসি বিনিময়ের মধ্যেই বিদায় নিলাম।

রুমে এসে সবারই চটজলদি ঘুমানোর প্রচেষ্টা। খুব সকালেই যেতে হবে দাশুরিয়া গ্রামে। ভোর ৫টার মধ্যেই সবার ঘুম ভাঙে। সোলায়মান ভাইর কল পেয়ে রুম ছাড়ি। গাড়ি স্টার্ট, যাচ্ছি দেখতে সাইফুল ভাইয়ের পুকুরে থাকা মাছের লম্ফঝম্ফ আর কলাবাগান। উপঢৌকন হিসেবে মিলল সদ্য গাছ থেকে পাড়া একছড়ি শবরি কলা। আহ কি মজা! তবে তার চাইতেও ভালোলাগা কলাবাগানের ঝিরঝির বাতাসে সোনামাখা রোদ সঙ্গী করে হেঁটে চলা।

যাবেন কিভাবে :নিজস্ব গাড়ি দিয়ে ঈশ্বরদী বাস বা ট্রেনে যাওয়া যায়। ভাড়া গাবতলী হতে ননএসি বাস ঈশ্বরদী ৩৫০ টাকা। ট্রেনে কমলাপুর হতে ঈশ্বরদী ৩০০ টাকা। চাইলে এসি বাস/ট্রেনের বগিতেও যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে ভাড়া বেশি গুনতে হবে।

থাকা-খাওয়া :ঈশ্বরদী শহরে বেশ কিছু ভালোমানের আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। পছন্দনীয় খাবারের হোটেলও রয়েছে অনেক। পূর্ব পরিচিত কেউ থাকলে নামমাত্র ভাড়ায় গবেষণা কেন্দ্রের অতিথি ভবনেও থাকা যাবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৩ মে, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন