ঢাকা বুধবার, ২২ মে ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
৩২ °সে


লেখকের মুক্তিযুদ্ধ

লেখকের মুক্তিযুদ্ধ

কাবার্ড থেকে কর্নফ্লেক্সের বাক্সটা বের করতে গিয়ে কবিরের মনে হলো এত বেলায় প্রাতরাশ না করে একেবারে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলেই বোধকরি ভালো হতো। টানা সাতদিন একনাগারে লাইব্রেরিতে কাটিয়ে কিছু একটা যে দাঁড় করানো গেছে—এটাই স্বস্তির বিষয়। প্রস্তাবনাটা প্রফেসর টার্নারকে সন্তুষ্ট করবে বলে আশা করা যায়।

হাতঘড়িটায় সময় দেখাচ্ছে প্রায় ১২টা। ফ্রিজ খুলে দেখা গেল কিছুই নেই তাতে। থাকবেই বা কী করে। দু’দিন হাঁড়ি চড়েনি। এটা-ওটা খেয়ে চলছে এ ক’দিন। পিএইচডি’র জন্য অভিসন্দর্ভটা লিখতে গিয়ে কালঘাম বেরিয়ে যাচ্ছে। যাকে বলে একেবারে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা।

ছুটির দিনগুলোতে প্রতিনিয়তই ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়। পাঠক্রমের ধরা-বাঁধা ছক ভেঙে কবিতা, সাহিত্য কিংবা দর্শনের বইগুলো ছুটির দিন ছাড়া পড়ার ফুরসত কোথায়? রাত জেগে কবির পড়ে সিমোন দ্য বুভেয়ার, সার্ত্রে, ভলতেয়ার, রুশো, কিংবা জর্জ এলিয়ট। এতেই তার হূদয় সত্যি সত্যি পরিশ্রুত হয়।

দুধভর্তি জামবাটির এক বাটি দুধের মধ্যে কর্নফ্লেক্স ঢালতে গিয়ে কবিরের খেয়াল হলো রান্নাঘরটি প্রায়ান্ধকার হয়ে আছে। বাইরে ঝকঝকে রোদ অথচ ঘরের ভেতর অন্ধকার। জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেই ঘরের ভেতর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে অগণিত আলোর ফোয়ারা। বাইরে চোখ মেলতেই দেখা গেল দূরে আকাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে পাইন, ওক আর চেস্টনাট গাছের সারি। বাগানে আলো করে ফুটে আছে হর্থন, লাইল্যাক আর লাবার্নাম ফুল। গ্রীষ্মের আগমনে আপেল গাছগুলোও মঞ্জুরিত হয়ে উঠেছে।

হঠাত্ কবিরের চোখ আটকে যায় বার্জ গাছের নিচে বসা দুজন মানুষের ওপর। একজনকে তো দিব্যি চেনা যাচ্ছে কিন্তু শেরদিলের পাশের মেয়েটি কে? শেরদিল এসেছে পাকিস্তান থেকে। কবিরের ডর্মে থাকে। মাস্টার্স করছে তড়িত্ প্রকৌশল বিষয়ে। এখানে পড়তে এসে কবিরকে যখন পোলক ছাত্রাবাসগুলোর অন্যতম গ্র্যান্ডভবনে থাকতে দেয়া হলো তখন তো কবিরের আনন্দের সীমা নেই। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চোখ-ধাঁধানো প্রাকৃতিক নৈসর্গে ঘেরা ছোট্ট স্বপ্নময় আবাসন। এত সুন্দর পরিপাটি করে গোছানো ছাত্রাবাসটি দেখে প্রথমে আনন্দে একেবারে আত্মহারা হয়ে উঠেছিল। সেই আনন্দে কেউ যেন একঘড়া বিষ ঢেলে দিলো যখন সে দেখল তার ফ্ল্যাটেরই একটি কক্ষ দখল করে আছে শেরদিল নামের এই পাকিস্তানি।

জানালা দিয়ে কবির লক্ষ করল, অবিশ্রান্ত গতিতে কথা বলে চলেছে শেরদিল। তরুণীটি শুধু মাথা নাড়ছে। হাত নেড়ে নেড়ে মেয়েটিকে যেন কী সব বোঝাচ্ছে।

কবির মনে মনে হাসে। সুন্দরী ওই তরুণীটিকে অন্তত একটি রাতের জন্য জয় করার অভিলাষে নিশ্চয়ই উন্মত্ত হয়ে উঠেছে শেরদিল। মুখ দিয়ে নিশ্চয়ই ছুটছে অজস্র মধুর মিথ্যার ফুলঝুরি। শেরদিল নিশ্চয়ই মেয়েটিকে বলছে—জানো আমরা চৌদ্দ পুরুষ ধরে জমিদার। আমাদের জমিজিরাত হেলিকপ্টারে করে সম্পূর্ণ একদিন ঘুরে দেখলেও ফুরোয় না ইত্যাদি, ইত্যাদি।

এই সুন্দরী তরুণীটি যদি শেরদিলের ঘরে যায় তবে ও কী করবে? মেয়েটিকে ধরে জোর করে চুমো খাবে? মেয়েটির সোনালি চুলের ঘ্রাণ নেবে? নাকি ধর্ষণ করবে। কবিরের মনে হলো বুঝিয়ে সুজিয়ে ওকে ঘরে নিতে পারলেই শেরদিল ওকে ধর্ষণ করবে। কবিরের মনে হতে লাগল পাকিস্তান ধর্ষণ, পাকিস্তান ধর্ষণ, ধর্ষণ...। আচ্ছা পাকিস্তানিরাও কি মুগ্ধ হয়? তাদেরও কি মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা আছে কিংবা আছে সৌন্দর্যবোধ? কবির নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে।

ক্ষুধায় পেট চোঁচোঁ করছে। এক্ষুনি কিছু একটা রান্না না করলেই নয়। শুধু কর্নফ্লেক্সে ক্ষুধা পুরোপুরি নিবৃত্ত হয়নি। হঠাত্ করেই প্রবলভাবে মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছে করছে তার। কতদিন মায়ের হাতের রান্না খাওয়া হয় না!

গত সপ্তাহে দুটো মুরগি কেনা হয়েছিল; সুপারমার্কেট থেকে। ফ্রিজ থেকে তারই একটি বের করা হলো। রান্নার জোগাড়যন্ত্র নিয়ে কবির যখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই শেরদিল ঘরে ঢোকে সেই তরুণীটিকে নিয়ে।

ডর্মে প্রবেশের দিন থেকে অদ্যাবধি কবির শেরদিলকে হাই কিংবা গুডমর্নিং কিছুই বলেনি, হয়নি একটি বাক্যবিনিময়ও। দুজন দুজনের প্রতি পোষণ করেছে সীমাহীন ঘৃণা। দিন দিন তা যেন আরো তীব্র হয়ে উঠছে। কবির মনে মনে অসংখ্যবার খুন করেছে শেরদিলকে। শেরদিলও নিশ্চয়ই তাকে। ২৬ মার্চের পর থেকে পাকিস্তান শব্দটি উচ্চারণ করলেই জিহ্বায় অনুভূত হয় একধরনের তিক্ততা। আসলে ২৬ মার্চ বলাটা ভুল হলো। পরিণত বয়স থেকে যখন সে বুঝতে শিখেছে পাকিস্তান মানেই হচ্ছে অত্যাচার, নিপীড়ন আর বৈষম্যের প্রতীক, ঠিক তখন থেকে। তরুণীটি ঘরে ঢুকেই কবিরকে বলল—হাই, কবিরও সপ্রতিভ কণ্ঠে বলল, হাই। মেয়েটি প্রলম্বিত পদক্ষেপে একটি টেবিলে গিয়ে বসল। শেরদিল সম্ভবত মধ্যাহ্নভোজের জন্য নিমন্ত্রণ করেছে তরুণীটিকে। মেয়েটিকে মুগ্ধ করতে মহাসমারোহে রান্নার আয়োজন শুরু করল শেরদিল। কখনো ফ্রিজ খুলে বের করছে কয়েক টুকরো পনির। কখনো ক্রঁসোয়া কিংবা আবার কখনো প্লেটে সাজাচ্ছে শুকনো পাউরুটির টুকরো। শেরদিল যেন চিরাচরিত মেজাজে হয়ে উঠেছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, উন্মাদ এক কামুক।

মেয়েটি কবিরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে—কোন দেশ থেকে এসেছ তুমি? বাংলাদেশ, সোত্সাহে জবাব দেয় কবির। মেয়েটি এবার বিস্ময়ে চিত্কার করে ওঠে। আমি তোমার দেশকে চিনি। ওখানে তো এখন ভীষণ যুদ্ধ হচ্ছে তা-ই না? অনেক লোক মারা যাচ্ছে পাকিস্তানি যোদ্ধাদের হাতে। শেরদিল চোয়াল শক্ত করে তাকায় মেয়েটির দিকে। শেরদিলের অভিব্যক্তিতে মেয়েটি বিপন্নের মতো এদিক-ওদিক তাকায় দু-একবার। সে হয়তো ভুলেই গিয়েছিল আজ সে শেরদিলের নিমন্ত্রিত অতিথি।

মেয়েটি জানায় সে এসেছে ফরাসি দেশ থেকে। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর করছে ইংরেজি সাহিত্যে। কবির সপ্রতিভ কণ্ঠে বলে—আমিও তোমার মতো সাহিত্যের ছাত্র তবে ইংরেজি নয়, বাংলার। আমার মাতৃভাষার। এখানে আমি স্কলারশিপে পিএইচডি করতে এসেছি, ভাষাতত্ত্বে।

কবির নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল—স্কলারশিপ কথাটির মধ্যে কি ঈষত্ আত্মঅহং কিংবা আত্মশ্লাঘা প্রকাশ পেল? পেলে পাক, তাতে কী আসে যায়। পৃথিবীতে শুধু মেধা, মনন, সৃষ্টিশীলতা ও শিল্পবোধ নিয়েই উচ্চকিত হওয়ার ন্যায্যতা থাকা উচিত। বিত্ত, বৈভব, সৌন্দর্য, বংশমর্যাদা কিংবা অন্য আর কিছু নয়।

তরুণীটি সাগ্রহে জিজ্ঞেস করে—তোমার নামটা কি জানতে পারি? সসপ্যানে খুন্তি চালাতে চালাতে কবির বলল, হুমায়ুন কবির। মেয়েটি জানায় ওর নাম হেনরিয়েট ডিবন। ও এসেছে ফ্রান্সের তুলুস থেকে, প্যারিস থেকে গাড়িতে ছ-সাত ঘণ্টার পথ।

হেনরিয়েট দেখতে নিপুণ কোনো শিল্পীর পটে আঁকা ছবির মতো। সরল উন্নত গড়ন, মসৃণ ত্বক। দু’গালে যেন গোলাপি রুজ পাউডার লেপে দিয়েছে কোনো জাতশিল্পী।

বেশ কয়েক প্রকার ব্যঞ্জন প্লেটে সাজিয়ে সেগুলো টেবিলে এনে রাখে শেরদিল। মুরগি ভাজা, রুটি ও চিজ পনিরের সঙ্গে রেড ওয়াইন। শেরদিল যখন রেড ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল কবিরের মনে হচ্ছিল ওয়াইনে নয় শেরদিল আসলে পান করছে বাংলাদেশের মানুষের রক্ত। কামড় দিয়ে যখন মাংস ছাড়িয়ে নিচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল পাকিস্তানি হায়েনা কামড় বসিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার পবিত্র শরীরে।

হেনরিয়েট কাটা চামচ দিয়ে সন্তর্পণে খাবার মুখে তুলে নিচ্ছে। ও পরে আছে গাঢ় নীল রঙের লংস্কার্ট। ধবধবে সাদা শার্টের ওপর অরুণ বর্ণের ছোট ছোট ফুল আঁকা। দারুণ লাগছে দেখতে। শেরদিলের পোশাক-পরিচ্ছেদও মন্দ না। আকাশি রঙের শার্টের ওপর এস কালারের ব্লেজার। কালো রঙের ট্রাউজার। পায়ে অক্সফোর্ড সুজ। হেনরিয়েট শেরদিলের দিকে তাকিয়ে বলে—তোমার ব্লেজারটা কিন্তু বেশ সুন্দর। শেরদিল বলে, এটা ‘ইয়াপ সেইন্ট লরেন’ ব্র্যান্ডের। কত নিয়েছে জানো? একশ’ পাউন্ড। আমি যে শার্টটি পরেছি এটা ‘ল্যানবিন’ ব্র্যান্ডের। বামহাতটি হেনরিয়েটের মুখের সামনে এগিয়ে দিয়ে হাতঘড়িটির দিকে ইঙ্গিত করে শেরদিল বলে—দেখ তো এটা কী ব্র্যান্ডের চেনো কি-না? হেনরিয়েট স্মিত হেসে বলল—‘পিয়েরে কারডিয়ান’। এগুলো তো সব ফরাসি ব্র্যান্ড চিনব না কেন? তুমি আমাকে এগুলোর দাম শুনাচ্ছ কেন? আমি কিন্তু এগুলোর মূল্য জানতে চাইনি। তোমার জানা উচিত ছিল এটা ভীষণ রকম অভদ্রতা। হেনরিয়েটের এসব কথায় শেরদিলের চোখে-মুখে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। শেরদিল লজ্জাহীন, নীরব, নির্লিপ্ত ও নির্বিকার।

শেরদিলের এসব কাণ্ডকারখানায় বেশ কৌতুকবোধ হচ্ছিল কবিরের। ছেলেটি মূর্খ নাকি উন্মাদ? মগজহীন মানুষের কাছ থেকে নিজের বিত্ত-বৈভবের স্তুতি ছাড়া আর কি-ই বা আশা করা যায়। বেঅকুফটার মাথায় যদি এতটুকু ঘিলু থাকত তাহলে সুন্দরী এই তরুণীর হূদয় জয় করার জন্য এসব অসাড় জিনিসপত্রের কীর্তি জাহির করায় লিপ্ত হতো না নিশ্চয়ই।

কবির ঈষত্ কৌতূহলী কণ্ঠে হেনরিয়েটকে জিজ্ঞেস করে, তুমি বাংলাদেশ সম্পর্কে আর কী জানো? হেনরিয়েট এমনভাবে মাথা নাড়ায় যেন না-জানাটা বড় ধরনের অপরাধ। কবির প্রসন্ন গলায় বলে—আমি কিন্তু তোমার দেশ সম্পর্কে অনেক কিছু জানি। হেনরিয়েট বস্ফািরিত নেত্রে বলে, যেমন?

প্লেটে খাবার তুলতে তুলতে কবির বলে—এই যেমন ধরো অ্যার্তুর র্যাঁবো। হেনরিয়েট উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠল। আমার ভীষণ... ভীষণ... প্রিয় কবি। দরাজ গলায় কবির আবৃত্তি শুরু করে, তুষারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এক রাজসিক নারীমূর্তি/তার চারপাশে মৃত্যু/শিস, মৃদু নিঃশ্বাস এবং ফাঁপা সংগীতের চক্রে তার দেহ ভূতের মতো উত্থিত স্ফীত ও আন্দোলিত হয়/সুন্দর ত্বকে লাল-কালো দাগ ফুটে ওঠে...। হেনরিয়েটের কণ্ঠে সীমাহীন উত্ফুল্লতা। দারুণ! দারুণ! এই কবিতাটির শিরোনাম ‘সুন্দরী’ তা-ই না। আমি ঠিক বললাম কি-না বলো? কবির সহাস্যে বলে, হুম, ঠিক বলেছ। হেনরিয়েট স্মিত হেসে বলে, তুমি কি আমার উদ্দেশে কবিতাটি আবৃত্তি করলে? কবির মৌন রইল।

গিয়ম আপোলিনেয়ারের কবিতা কেমন লাগে তোমার? প্রশ্ন করে কবির। মুখে হাসির ফোয়ারা তুলে হেনরিয়েট বলে—আমার দ্বিতীয় প্রিয় কবি। জানো তো ওর শরীরে এক ফোঁটা ফরাসি রক্তও নেই। তারপরও আপোলিনেয়ার খাঁটি ফরাসি কবিদের মধ্যে অন্যতম। মা পোলিস আর বাবা ছিলেন ইতালিয়ান। হুম বেশ জানি, বলে কবির। তিনিই তো ফরাসি কাব্যে প্রথম স্যুররিয়ালিজমের ব্যবহার করেছিলেন। যথেচ্ছ প্রশংসা করে পিকাসোকে বানিয়েছিলেন চিত্রশিল্পী পিকাসো। ওঁর একটি কবিতার চারটি লাইন তাহলে শোন, ‘হায়রে আমার পরিত্যক্ত যৌবন/শুকনো ফুলের মালা/এখন অন্য ঋতুর আসার পালা/সন্দেহ আর জ্বালা। এটার শিরোনাম ‘ভালোবাসায় নিবেদিত জীবন’।

আচ্ছা হেনরিয়েট তুমি কি জানো ‘মোনালিসা’ চুরি করেছেন সন্দেহে পুলিশ একবার আপোলিনেয়ারকে গ্রেফতার করেছিল? হেনরিয়েটের চোখে-মুখে রাজ্যের বিস্ময়—কই, জানি না তো। সত্যি নাকি! কবির বলল, হুম। ১৯১০ কি ১৯১১ সালের কথা, সঠিক মনে পড়ছে না। সপ্তাহখানেক জেলও খেটেছিলেন আপোলিনেয়ার।

শার্ল বোদলেয়ার তোমার কেমন লাগে? হেনরিয়েটের কাছে জানতে চায় কবির। ভালো, তবে ও বড্ড অশ্লীল লেখেন। কবির ভ্রু কুঁচকে বলে—শিল্পের আবার শ্লীল-অশ্লীল কী!। শিল্প তো শিল্পই। একবার কী হয়েছে জানো? অশ্লীল কবিতা লেখার জন্য বোদলেয়ারকে তোলা হয়েছে কোর্টে। তো বিচারক ওঁকে জিজ্ঞেস করলেন—এই যে মান্যবর কবি, এত কিছু থাকতে আপনি অশ্লীল কবিতা লেখেন কেন বলুন তো। বিচারকের এমন প্রশ্নে বোদলেয়ার কী বললেন জানো? হেনরিয়েট ভ্রু কপালে তুলে বলে—কী বললেন? বোদলেয়ার বললেন, ধর্মাবতার, ফুল, ফল, গাছ, লতা, পাতা সবকিছু নিয়েই তো ইতোমধ্যে কবিতা লেখা হয়ে গেছে। নারীর শরীর নিয়ে লেখাই শুধু বাকি আছে এখন। কোর্টে উপস্থিত সবাই তো একেবারে তাজ্জব! কী বলে এই লোকটা!

কবির লক্ষ করল তাদের মধ্যেকার এই কথোপকথনগুলো শেরদিলের হূদয়ে কামানের গোলার মতো বিদ্ধ হচ্ছে। নানা ছুঁতোয় কীভাবে হেনরিয়েটকে ওখান থেকে সরিয়ে নেয়া যায় সে চেষ্টাই শুধু করছিল শেরদিল। এই অজুহাতে সে বারবার হেনরিয়েটের দুই বাহু স্পর্শ করে তাগাদা দিচ্ছিল আর বলছিল—ওঠো এবার। চলো সাগরপাড়ে গিয়ে বসি দুজন।

প্রেম ভালোবাসার মতো সূক্ষ্ম বিষয়গুলোতে সাধারণত ধৈর্য ধরতে হয়। সংযম দেখাবার মধ্যেও যে একটা অহংকার আছে এই উজবুকটা সেটা বুঝবে কেন? ও তো পাকিস্তানি। পাকিস্তানিদের মধ্যে সংযম বলে কিছু নেই।

হেনরিয়েট শেরদিলের উদ্দেশে বলে—এখান থেকে এখন এক পাও নড়ব না আমি। কবিরের সঙ্গে সাহিত্যচর্চা করব আজ সারাবেলা। এডিনবরায় আসার পর এতদিনে মনের মতো একজন মানুষ খুঁজে পেলাম। হেনরিয়েট কবিরের দিকে তাকিয়ে বলে—আরেকটা কবিতা হয়ে যাক। কবির আবৃত্তি করতে শুরু করে—তোমাকে চোখের মধ্যে রেখে কাঁদি, আমার দু’চোখে তুমি/বিগলিত ঠাণ্ডা হিম, তুমি কাঁদছ, দু’চোখের একান্ত ভেতরে/গ’লে যাচ্ছে কালো আঁখিতারা, গ’লে গ’লে একটি গাছের মতো/সবুজ, তোমার মতোন করুণ হয়ে যাচ্ছে অশ্রুমালা/তুমি নিথর নিরীহ দাঁড়িয়ে আছ আঁখিতারার ভেতরে,/তুমি, একাকিনী সবুজ পল্লব, কাঁপছ বাতাসে শাদা হিমে...।

অস্ফুট কণ্ঠে হেনরিয়েট বলে ওঠে—অপূর্ব! অপূর্ব! এটা কার কবিতা কবির? কবির সলজ্জ গলায় বলে, আমার।

তোমার!!! সম্পূর্ণ আবেগ ধরে রাখতে না পেরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় হেনরিয়েট। তুমি কবি? তুমি কবিতা লেখ? এত সুন্দর কবিতা! অনবদ্য। এ তো ক্রিস্তফ কিংবা পল ভার্লেইনের কবিতা বলেও দিব্যি চালিয়ে দেয়া যায়। তোমার কবিতার বই বেরিয়েছে? কবির বলে, হ্যাঁ। ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ নামে একখানা কবিতার বই বেরিয়েছে বছরখানেক আগে। তবে পরবর্তী বইগুলোতে কবির নামটা আর রাখব না ভাবছি। কবির নামটা ছেঁটে ফেলে আজাদ করে দেবো। আজাদ মানে হচ্ছে মুক্ত-স্বাধীন। পরিণত বয়স থেকে আমি নিজেকে শৃঙ্খলহীন মনে করি। আমার নতুন লেখক নাম হবে হুমায়ুন আজাদ। তোমাদের বিখ্যাত কবি স্তেফান মালার্মের মতো। ওর নাম তো ছিল এতিয়েন মালার্মে। পরে এতিয়েন বদলে স্তেফান করেছে। আর আমি প্রথমটুকু ঠিক রেখে শেষের অংশটা বদলে দেবো শুধু।

হেনরিয়েটকে রান্নাঘর থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়ে গজগজ করতে করতে নিজেই ওখান থেকে বেরিয়ে যায় শেরদিল।

হেনরিয়েট কিছুটা শিশুসুলভ গলায় বলে—আমার নামটাও কিন্তু ফরাসি একজন কবির নামে, জানো? কবির বিস্মিতকণ্ঠে বলে, তা-ই নাকি, বেশ তো। ওঁর দু’একটা কবিতা শোনাও। হেনরিয়েট আফসোসের স্বরে বলে—মুখস্থ নেই। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল হেনরিয়েট ডিবনের কবিতা। সেজন্যই তো আমার মা ওঁর নামের সঙ্গে মিলিয়ে আমার নাম রাখে হেনরিয়েট ডিবন।

হেনরিয়েট দেয়ালঘরির দিকে তাকিয়ে উত্কণ্ঠিত গলায় বলে—ওঠো। ওঠো এবার। চলো সমুদ্রের ধারে বেরিয়ে আসি। ওখানে বসে বসে নীল জল আর সমুদ্রচিলদের ডানা ঝাপটানো দেখব দুজন।

সমস্ত দিন লাইব্রেরিতে কাটিয়ে পরদিন ছাত্রাবাসে ফিরছিল কবির। শব্দহীন বিকেল। সূর্যাস্তের আভা মেঘের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছে কমলারঙ। গ্র্যান্ডভবনের সামনে লতাপাতা ও শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে দৈত্যের মতো যে উইলো গাছটা দাঁড়িয়ে আছে সেটারই তলায় হাঁটু মুড়ে বসে আছে হেনরিয়েট। দূর থেকেই তাকে দেখতে পেল কবির। বাগানের চেরি গাছগুলোতে বসেছে লাল, গোলাপি, ক্রিম আর বেগুনি রঙের ফুলের মেলা। ফুলের ঐশ্বর্যের মধ্যে হেনরিয়েটকে দেখেতে লাগছে ডানাহীন পরির মতো। কবির বিস্মিত গলায় বলে—এখানে বসে কী করছ হেনরিয়েট?

তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। সহাস্য বদনে কবিরের উদ্দেশে হেনরিয়েট বলে—আমার পাশে এসে বসো। কবিরও হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল হেনরিয়েটের পাশে। হেনরিয়েট বলে—জানো, কাল সারারাত তোমার কথা ভেবেছি। তোমাকে একবার দেখার জন্য একটু কথা বলার জন্য এখানে অপেক্ষা করেছি দু’ঘণ্টা ধরে। আচ্ছা কবির, তোমার কি এখানে ভালো লাগে? কবির চোখ বড় বড় করে বলে, মোটেও না। আমার দেশ ও আমার গ্রামের জন্য হূদয়ে অনুভূত হয় ব্যাকুলতা। শূন্য শূন্য লাগে সবসময়। জানো, ঢাকা থেকে মাত্র ২০ মাইল দূরে আমার গ্রাম। রাড়িখাল গ্রামটি ছিল অনেকটা পানির গ্রাম। ইতালির ভেনিসের মতো বলা যায়। সমস্ত গ্রামজুড়ে পুকুর আর পুকুর। বর্ষাকালে গ্রামটি পানির ওপর কচুরিপানার মতো ভাসে। মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষাই পছন্দ নয় আমার। নেহাত দায়ে পড়ে এসেছি পিএইচডি করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছি প্রভাষক হিসেবে। পিএইচডিটা না থাকলে প্রমোশন হবে না সহসা।

জানো হেনরিয়েট, আমি তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। পরীক্ষার খাতার একটি প্রশ্নের উত্তরে বন্ধুর কাছে লেখা চিঠিতে লিখেছিলাম ‘ইংলিশ ইজ এ কার্স অন আওয়ার সোসাইটি’। আমার প্রিয় শিক্ষক এবং সেই সঙ্গে যার প্রিয় ছাত্র ছিলাম আমি তিনিও ক্লাসে ডেকে নিয়ে আমাকে বলেছিলেন—ইংরেজি অভিশাপ হতে যাবে কেনরে বোকা। ওটা অভিশাপ নয় বরং আশীর্বাদ।

জানো হেনরিয়েট, মাঝে মাঝে বাড়ির জন্য ভীষণ কষ্ট হয়। আমার ঘরের জানালার পাশে একটি চালতা গাছ আছে। গ্রীষ্মকালে গাছটিতে ফোটে অসংখ্য সাদা রঙের ফুল। সেই ফুলের হালকা ও মিষ্টি গন্ধে ভরে যেত আমার পড়ার ঘর। বর্ষাকালে ফুটত থোকা থোকা কদমফুল। সেই ফুলের সেকি গন্ধ ও সৌন্দর্য তোমাকে কী করে বোঝাই!

হেনরিয়েট সন্তর্পণে তার ডানহাতটি রাখে কবিরের বামহাতের ওপর। তারপর বলে—শেরদিলের সঙ্গে আজ সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে এলাম। ওদের সঙ্গে যেহেতু তোমাদের যুদ্ধ চলছে সেহেতু একইসঙ্গে দুজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা চলে না। আমি জেনে-শুনে বর্বরদের সমর্থন করতে পারি না। আমার সবটুকু সমর্থন তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।

আচ্ছা কবির, আমরা কি আজ সারারাত কবিতা নিয়ে কথা বলতে পারি? কবির বলে, অবশ্যই। গাছতলা থেকে উঠে দুজনে ডর্মের দিকে এগোয়। ডর্মে ঢুকতেই ওরা দেখে শেরদিল বাক্সপেট্টা গুছিয়ে ডর্ম ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও।

শেরদিল অর্থাত্ যার দিলটা বাঘের মতো সে আজ ছাত্রাবাস ছাড়ছে বিড়ালের মতো। বেশ পুলকিত বোধ করে কবির। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় হেনরিয়েট। কবিরও গিয়ে দাঁড়ায় ওর পাশে। ঘরের ভিতর ঢুকে হেনরিয়েট কবিরের হাতে আলতো স্পর্শ করে বলে—আমার মনের মধ্যে কী চলছে তুমি কি বুঝতে পারো কবির? কবির বলে—হুম। হেনরিয়েট বলো, তাহলে এমন কিছু বলো যাতে আমার মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। কবির আবৃত্তি করতে শুরু করে—কী যে ভালোবাসি, প্রেয়সী, তোমার তনুবিতান!/অলস অঙ্গ-চালনে/মনোহর ত্বক রেশমের মতো কম্পমান/রশ্মির প্রতিফলনে!/সাগরের মতো গভীর, সুরভি তোমার চুলে,/যেখানে অনবরত/নীল, পাটকেল ঢেউ জেগে ওঠে বাউণ্ডুলে,/তিক্তস্মৃতির মতো। হেনরিয়েট প্রশ্ন করে, কার কবিতা এটা? শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা—হেনরিয়েটের কানে ফিসফিস করে বলে কবির। হেনরিয়েট বলে, দারুণ! অনবদ্য।

অলঙ্করণ :রাজিব

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ মে, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন