ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
২৫ °সে


বেশি দামে বিদ্যুত্ বিক্রি করছে পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি

ভর্তুকিও বেশি পায় সমিতিগুলো  চাপ পড়ছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর  লাইফলাইন গ্রাহক দেড় কোটি
বেশি দামে বিদ্যুত্ বিক্রি  করছে পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি

দেশে ছয়টি বিতরণ সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে কম পাইকারি মূল্যে বিদ্যুত্ কেনে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। গ্রামীণ ও অপেক্ষাকৃত কম আয়ের জনগণের কাছে বিদ্যুত্ সরবরাহ করায় সংস্থাটিকে কম মূল্যে পাইকারি বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু যে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কম দামে বিদ্যুত্ দেওয়া হয়, তারা এর সুফল পাচ্ছে না। বরং অন্য কোম্পানির নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের চেয়ে আরইবির পল্লী বিদ্যুত্ সমিতিগুলোর গ্রাহকদের বেশি দামে বিদ্যুত্ কিনতে হচ্ছে।

বিদ্যুত্ ব্যবহারের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর এবং এর হার কমিয়ে আনা যায়।শিক্ষার হার বাড়ে। কুসংস্কারের চর্চা কমে। তাই নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিদ্যুতের সুবিধা নিশ্চিত করতে অপেক্ষাকৃত কম দামে এটি সরবরাহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার। এই শ্রেণির গ্রাহকেরা বিদ্যুতের সংযোগ পেলেও সামর্থ্য কম থাকায় বিদ্যুত্ কম ব্যবহার করে। মাসে ৫০ কিলোওয়াটের নিচে বিদ্যুত্ ব্যবহারকারী এই শ্রেণিকে ‘লাইফলাইন গ্রাহক’ নামে ডাকে সংস্থা-কোম্পানিগুলো।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০১৭ সালের নভেম্বরে বিদ্যুতের মূল্যহার পুনর্নির্ধারণকালে সব কোম্পানির গ্রাহকদের জন্য অভিন্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তখন লাইফলাইন গ্রাহক শ্রেণিতে প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট) বিদ্যুতের দাম সাড়ে তিন টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আদেশ অনুযায়ী, আরইবির যে সমিতিগুলোতে লাইফলাইন বিদ্যুতের দাম সাড়ে তিন টাকার বেশি, সেগুলো ঐ বেশি হারেই বিদ্যুত্ বিক্রি করতে পারবে। আদেশে থাকা এই নির্দেশনার কারণেই গ্রামের কম আয়ের মানুষকে শহরের কম আয়ের মানুষের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুত্ কিনতে হচ্ছে।

এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি ঘোষিত ঐ মূল্যহার অনুযায়ী ঢাকায় বিদ্যুত্ বিতরণকারী ডিপিডিসি ও ডেসকো এবং অন্যান্য শহর-মফস্সল অঞ্চলে বিতরণকারী বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), ওজোপাডিকো ও নেসকোর লাইফ লাইন গ্রাহকদের জন্য প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের দাম সাড়ে তিন টাকা। গ্রামীণ ও মফস্সল এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহে নিয়োজিত পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) সবচেয়ে বেশি লাইফলাইন গ্রাহক রয়েছে। অথচ সংস্থাটির এই শ্রেণির গ্রাহকেরা অন্য কোম্পানিগুলোর গ্রাহকদের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, এই মূল্যহার অন্যায্য। দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ও ন্যায্যতাবোধ এতে প্রতিফলিত হয়নি।

বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেন, সর্বশেষ আদেশে বিদ্যুতের ন্যূনতম চার্জ প্রত্যাহার করায় অনেক গ্রাহক লাভবান হয়েছেন। সব কোম্পানির লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের দাম সাড়ে তিন টাকা নির্ধারণ করা হলেও পল্লী বিদ্যুতের সমিতিগুলোকে এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা হয়েছিল তাদের আয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে।

বিদ্যুত্ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সমিতির আয় বাড়াতে গিয়ে কম আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত খরচের চাপ পড়ে গেছে। অথচ নিম্ন আয়ের মানুষের কথা ভেবেই আরইবিতে সরকারের ভর্তুকির হার বেশি। আর আরইবির এক সদস্য বলেন, বিইআরসি সুযোগ রেখেছে বলেই সমিতিগুলো বেশি দামে বিদ্যুত্ বিতরণ করতে পেরেছে।

সারাদেশে ৮০টি পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুত্ বিতরণ করে আরইবি। সমিতিগুলোর লাইফলাইন গ্রাহকদের মূল্যহার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পল্লী বিদ্যুতের লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট) বিদ্যুতের গড় দাম পড়ছে ৩ টাকা ৭৮ পয়সা, যেখানে অন্য কোম্পানিগুলো লাইফলাইন গ্রাহকদের কাছ থেকে সাড়ে তিন টাকা করে আদায় করছে। কয়েকটি সমিতি আবার প্রতি ইউনিট লাইফলাইন বিদ্যুতের দাম ৩ টাকা ৮৭ পয়সা পর্যন্ত আদায় করছে। সাড়ে তিন টাকার বেশি দামে বিদ্যুত্ বিতরণ করে সমিতিগুলো বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করছে। মাত্র পাঁচটি সমিতি প্রতি ইউনিট সাড়ে তিন টাকা করে আদায় করছে। এর মধ্যে তিনটি ঢাকার, অন্য দুটি গাজীপুর ও ময়মনসিংহের।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকা ও এর কাছাকাছি অবস্থিত এ দুটি জেলার জনগোষ্ঠীর আয় রাজধানী থেকে দূরে থাকা জেলাগুলোর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা থেকে বেশি। অর্থাত্, পল্লী বিদ্যুতের যে পাঁচটি সমিতির গ্রাহকেরা বঞ্চনার শিকার হননি, তারাও আর্থসামাজিক বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত এগিয়ে।

আরইবি সূত্র জানায়, সারাদেশে আরইবির আড়াই কোটি গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই, অর্থাত্ দেড় কোটি গ্রাহক ৫০ ইউনিটের কম বিদ্যুত্ ব্যবহার করে। এই ৬০ শতাংশ গ্রাহক আরইবির বিক্রীত মোট বিদ্যুতের মাত্র ২৪ শতাংশ ব্যবহার করে। বাকি ৪০ শতাংশ গ্রাহক ৭৬ শতাংশ বিদ্যুত্ ব্যবহার করে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৪ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন