ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬
৩০ °সে

করোনার উপসর্গ নিয়ে দেশে দুই জনের মৃত্যু

পরীক্ষা নিয়ে হ-য-ব-র-ল
করোনার উপসর্গ নিয়ে দেশে দুই জনের মৃত্যু

করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার তথ্য গোপন বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে দ্রুত ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে। সংক্রমিত ব্যক্তিরা অনেকের সংস্পর্শে গেছেন। এভাবে কত মানুষ যে তার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছে তার হিসাব নেই। যাদের সংস্পর্শে গেছেন তাদের সবারই কোয়ারেন্টাইনে থাকা উচিত। খুলনায় তথ্য গোপন করার পরিপ্রেক্ষিতে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ঐ রোগী কয়েক সপ্তাহ আগে ঢাকায় থাইরয়েডের অপারেশন করেছিলেন। ঐ সময় তাকে আইসিইউতে থাকতে হয়। ঐ আইসিইউতে এক করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে খুলনায় চিকিত্সা নিতে গিয়ে পূর্বের তথ্য গোপন রেখেছিল ঐ রোগী। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মোস্তাহিদুর রহমান (৪৫) নামের জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ঐ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। চিকিত্সকদের ধারণা ঐ রোগী করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। এছাড়া খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের আইসোলেশনে থাকা এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ঐ যুবকও করোনায় আক্রান্ত বলে চিকিত্সকরা ধারণা করছেন। আক্রান্ত আরো ৫ :এদিকে করোনা ভাইরাসে দেশে নতুন করে আরো পাঁচ জন আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪ জন। সব মিলিয়ে সুস্থ হয়েছেন ১১ জন। আর মারা গেছেন পাঁচ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত অনলাইনে লাইভ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ১২৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৯২০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। নতুন করে যাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন পাঁচ জন। নতুন আক্রান্তদের এক জন বিদেশ থেকে এসেছেন, তিন জন আগে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে থেকে সংক্রমিত হয়েছেন, অন্য জনের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। নতুন আক্রান্ত সবাই পুরুষ। এর মধ্যে ৩০-৪০ বছর বয়সি দুই জন, ৪১-৫০ বছর বয়সি দুই জন এবং ষাটোর্ধ্ব এক জন। এ ভাইরাসে নতুন করে কারো প্রাণহানি হয়নি। ডা. ফ্লোরা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় আইইডিসিআরের হটলাইনে কল এসেছে ৩ হাজার ৩২১টি। এর সব কটিই করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত। ব্রিফিংয়ে করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে নাগরিকদের করণীয়ও তুলে ধরেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহানে প্রথম শনাক্ত হওয়া করোনা ভাইরাস এখন বৈশ্বিক মহামারি। বাংলাদেশে এ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে গত ৮ মার্চ। এরপর দিন দিন এ ভাইরাসে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে। মহামারি করোনা মোকাবিলায় ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিরে গেছেন ঢাকার অস্থায়ী বাসিন্দারা। যারা ঢাকা ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেছেন তাদের প্রত্যেকের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাধ্যতামূলক বলে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান।

তথ্য গোপনে বিপদ বাড়তে পারে

চীনে ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ করোনা ভাইরাসের উপসর্গ গোপন করলে কিংবা ভুল তথ্য দিলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে? আর এর শাস্তি হিসেবে এমনকি মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে? ভ্রমণের তথ্য লুকালেও তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে? ব্রিটেনের প্রিন্স চার্লস, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী সোফি গ্রেগয়ের ট্রুডো, মার্কিন কংগ্রেসের দুই আইনপ্রণেতা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু তারা কেউই তথ্য গোপন করেননি। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, করোনার উপসর্গ দেখা দিলে চিকিত্সকের কাছে যেতে হবে। এক্ষেত্রে তথ্য গোপন করলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

মাত্র ৪ জায়গায় হচ্ছে পরীক্ষা

এদিকে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগী বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আইইডিসিআরের নমুনা পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় দেরি নিয়ে ক্ষোভের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০টি পরীক্ষাগার চালুর ঘোষণা এক সপ্তাহ গড়ালেও এ পর্যন্ত চালু হয়েছে মাত্র তিনটি। আইইডিসিআরের নিজস্ব পরীক্ষাগার ছাড়াও আরো যে ১০টি পরীক্ষাগার স্থাপন করা হচ্ছে সেগুলো হলো—ঢাকায় জনস্বাস্থ্য হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস, কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর মধ্যে মাত্র তিনটিতে কেবল পরীক্ষা করা যাচ্ছে। এগুলো হলো রাজধানীর মহাখালীর জনস্বাস্থ্য হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল এবং চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসেস হাসপাতাল।

পরীক্ষা নিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা

করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ব্যাপক অভাব দেখা দিয়েছে। সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা নন-মেডিক্যাল পারসনদের অনভিজ্ঞতা কিংবা মতলববাজির কারণে অনেকটা হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে মাঠ পর্যায়ের চিকিত্সকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। সমন্বয়ে আরো বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। এদিকে একমাত্র চট্টগ্রাম ছাড়া বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে করোনা শনাক্তকরণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে ঢাকার বাইরে কেউ আক্রান্ত হলে ঐ ব্যক্তির ঢাকায় আসতে পরিবহন ব্যবহার করবে, সেক্ষেত্রে সংক্রমণ আরো বেশি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ঢাকার বাইরে প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ, জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা কর্নার স্থাপন করে সেখান থেকে টেনশিয়ানদের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তির বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা যেতে পারে। এই ব্যবস্থা করলে দ্রুত কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এই সব কার্যক্রম করছি, করা হচ্ছে বলা হলেও বাস্তবে এখনো করা হয়নি। তাই সন্দেহভাজনদের পরীক্ষার জন্য সবাই এখন আইইডিসিআরের দিকেই তাকিয়ে আছে।

অপরদিকে পরীক্ষানিরীক্ষার কিটের সংকট রয়েই গেছে। যেখানে প্রায় ৭ লাখ বিদেশফেরত দেশে অবস্থান করছে, সেখানে মাত্র ১ হাজার জনেরও পরীক্ষা করা হয়নি। কমপক্ষে ৩ লাখ লোকের পরীক্ষা করা হলে বোঝা যেত কী পরিমাণ লোক সংক্রমিত হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ জানান, ঢালাওভাবে পরীক্ষা করার দরকার নেই। জ্বর, সর্দি, কাশি, গলায় ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হলেই করোনা নয়। দেখতে হবে তার আগের ইতিহাস। তিনি বিদেশফেরত কারোর সংস্পর্শে গেছেন কি না, আক্রান্ত দেশ থেকে এসেছেন কি না—এসব ইতিহাস ও উপসর্গ দেখে করোনার পরীক্ষার করতে হবে। তবে বয়স্করা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি জ্বর, সর্দি, কাশি ও নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে গেলে তাকে করোনা পরীক্ষা করতে হবে।

হোম কোয়ারেন্টাইনে ২ চিকিত্সক

হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ঢাকার একটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দুই চিকিত্সক। তারা দুই জনই ঐ হাসপাতালের হূদেরাগ বিভাগের চিকিত্সক। কর্তৃপক্ষ তাদের নাম জানাতে চাননি। ঐ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধে উদ্বেগ

এদিকে করোনার অজুহাত দেখিয়ে অনেক চিকিত্সক প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে দিয়েছেন। চিকিত্সাসেবা জরুরি সার্ভিসের মধ্যে পড়ে। তাই প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করা অমানবিক বলে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ দাবি করেছেন। বিএমএর মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক দুলাল জানান, প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করা ঠিক হয়নি। যে কোনো দুর্যোগের পরিস্থিতিতে চিকিত্সকের কাজ হলো সেবা দেওয়া।

খাগড়াছড়িতে যুবকের মৃত্যু

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, জেলা সদর হাসপাতালের আইসোলেশনে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়ার ১০ ঘণ্টা পর এক মারমা যুবকের মৃত্যু ঘটেছে। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রচণ্ড জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে সাজাই মার্মা (৩০) নামে ঐ যুবক হাসপাতালে ভর্তি হন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খাগড়াছড়ি ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মিটন চাকমা।

সিভিল সার্জন জানান, আপাতত করোনা রোগী ধরেই লাশটির সত্কার করার জন্য পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সক ডা. পূর্ণ জীবন চাকমা জানান, বিষয়টি সম্পর্কে দুপুরেই আইইডিসিআরকে অবহিত করা হয়েছিল। মৃত ব্যক্তির রক্তের নমুনা করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে। এদিকে রোগীর সংস্পর্শে আসায় হাসপাতালের দুই জন চিকিত্সক, দুই জন নার্স ও এক জন আয়াকে হাসপাতালে প্রাতিষ্ঠানিক হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

খুলনায় মৃত রোগী করোনায় আক্রান্ত!

খুলনা অফিস জানান, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মোস্তাহিদুর রহমান (৪৫) নামে জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টায় তার মৃত্যু হয়। তিনি করোনা আক্রান্ত ছিলেন বলে চিকিত্সকরা ধারণা করছেন। মোস্তাহিদুর রহমান খুলনা মহানগরীর হেলাতলা এলাকার সাইদুর রহমানের ছেলে। খুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ টি এম মঞ্জুর মোর্শেদ জানান, এই হাসপাতালে আসার আগে ঐ রোগী ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। একই আইসিইউতে চিকিত্সাধীন করোনা আক্রান্ত এক জন রোগী মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু ঐ রোগী এখানে ভর্তির সময় সেই তথ্য গোপন করেন। এ কারণে ঝুঁকি বেড়ে গেল।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০৭ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন