এটিএম আমদানিতে বিপুল রাজস্ব ফাঁকি!

থেমে গেছে তদন্ত প্রক্রিয়া, কাষ্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজশ, মুদ্রা পাচারের অভিযোগ

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বিশেষ প্রতিনিধি

ব্যাংকিং খাতে অটোমেটেড ট্রেলার মেশিন (এটিএম) আমদানিতে ব্যাপক শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কত কয়েক বছরে এ খাতে অন্তত পাঁচশ কোটি টাকা ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কাস্টমস এর একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এ কাজটি দীর্ঘদিন ধরে চললেও কর্তৃপক্ষ নীরব ভূমিকা পালন করছেন। বছর দুয়েক আগে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছিল কাস্টমস এর শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। কিন্তু সেটিও চাপা পড়ে গেছে।

সূত্র জানায়, শুরুর দিকে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কম্পিউটারের খুচরা যন্ত্রাংশ নাম দিয়ে এটিএম এর যন্ত্রপাতি আমদানি করতো। কম্পিউটারের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক না থাকায় ব্যবসায়ীরা এ পন্থা অবলম্বন করতো। কিন্তু এ নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট আসার পর অসাধু ব্যবসায়ীরা এখন ভিন্ন পথ অবলম্বন করছেন। রপ্তানিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে তারা এখন মূল্য কম দেখিয়ে এটিএম মেশিন আমদানি করছেন। বাকি টাকা আমদানিকারকরা হুন্ডির মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের কাছে পাঠাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চীনা একটি এটিএম (শুধু টাকা তোলা) ফ্যাক্টরি থেকে রপ্তানিমূল্য দুই লাখ ৫৫ হাজার টাকা। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা এলসিতে ওই পণ্যের দাম দেখাচ্ছে মাত্র এক লাখ টাকা। দেশের  বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে তা আবার বিক্রি করা হচ্ছে ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এটিএমের বাকি অর্থ রপ্তানিকারককে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে।

অপরদিকে চীনা রিসাইক্লার এটিএম এর (টাকা তোলা এবং জমা দেওয়া যায়) ফ্যাক্টরি থেকে রপ্তানিমূল্য ১০ লাখ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা তা মাত্র দুই লাখ ১২ হাজার পাঁচশ টাকায় আমদানি করছেন। দেশীয় ব্যাংকগুলো এসব মেশিন ন্যূনতম ২০ লাখ টাকায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিনছে। এক্ষেত্রেও রপ্তানিকারকদের কাছে হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল অংকের বাকি অর্থ পাঠানো হচ্ছে।

উল্লেখ্য, এটিএম আমদানিতে শুল্কের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মূলত শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার উদ্দ্যেশ্যে ব্যাবসায়ীরা এটিএম এর ঘোষিত মূল্য কম দেখিয়ে থাকে।

এদিকে শুধু শুল্ক ফাঁকি নয়, অনেক সময় তথ্য গোপন করেও এটিএম এর যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে যে পরিমাণ এটিএম আমদানির তথ্য রয়েছে বাজারে প্রকৃত এটিএম এর সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। এ হিসাব মেলাতে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগও হিমশিম খাচ্ছে। তারা মনে করছে চোরাচালানের মাধ্যমে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে এসব মেশিন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বিষয়টি তদন্ত করার উদ্যোগও নিয়েছিল শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে প্রকৃত এটিএম আমদানির হিসাব চাওয়া হয়েছিল। আবার এটিএম আমদানির জন্য বিভিন্ন ব্যাংক যে এলসি খুলেছিল সেটিও জানতে চাওয়া হয়। সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলো শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত পরিদপ্তরের কাছে তাদের হিসাব পাঠিয়েছিল। এতে দেখা যায়, এলসি করে যে পরিমাণ এটিএম আমদানি করা হয়েছে, প্রকৃত এটিএম সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। এরপর কোনো এক আজানা কারণে বিষয়টির তদন্ত বন্ধ রাখেন শুল্ক গোয়েন্দারা। এখন অসাধু ব্যবসায়ীরা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে নির্বিঘ্নে এটিএম আমদানি করলেও বিষয়টি তদন্ত করছে না কোনো মহল। এতে করে প্রকৃত আমদানিকারকরা এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মার খাচ্ছেন। শুল্ক কর্তৃপক্ষ এবং ব্যাংক কর্মকর্তারা এ বিষয়ে সচেতন থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীদের এই উদ্যোগকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান ডিজিটাল যুগে এনবিআর  ইচ্ছে করলেই এ খাতে শুল্ক ফাঁকি এবং মুদ্রা পাচারের ঘটনা উদঘাটন করতে পারে। বাণিজ্যিক ব্যাংক, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের অন্যান্য সংস্থা একটু তত্পর হলেই সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব  পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।