পার্বত্য অঞ্চলের সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে বিপুল অস্ত্র

অধিকাংশ অস্ত্র ঢুকছে মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত দিয়ে, অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারকারীরা পাহাড়ি সশস্ত্র গ্রুপের সদস্য, এ অবস্থার অবসান চান রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আবুল খায়ের

আঞ্চলিক বাহিনীগুলোর আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং অন্তঃকোন্দলকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামে একের পর এক হত্যাযজ্ঞ চলছেই। পাহাড়ে বসবাসরত সাধারণ মানুষ জিম্মি সশস্ত্র সন্ত্রাসী ক্যাডারদের হাতে। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা  দিয়ে খুব সহজেই ক্যাডারদের হাতে অস্ত্র আসছে। তাদের কাছে এমন সব অত্যাধুনিক সয়ংক্রিয় অস্ত্র রয়েছে— যা দেশের কোন কোন বাহিনীর কাছেও নেই। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে এমনটা জানা গেছে।      আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দারা আরো জানান, পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্তে ভারত ও মিয়ানমারের সাথে ৪৪ কিলোমিটার পথ অরক্ষিত রয়েছে। বিশাল সীমান্ত এলাকা পাহারায় নেই কোন ‘পর্যবেক্ষণ পোস্ট’। এমনকি টহল দেয়ার জন্য পায়ে হাঁটা পথও নেই। দুর্গম জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত টহল দিতে পারে না। তাই ওই সীমান্ত এলাকাটি থাকছে অরক্ষিত। কিছু সংখ্যক বর্ডার অভজারভেশন পোস্ট (বিওপি) থাকলেও সেগুলোর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ফলে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবাধে অস্ত্র ও মাদক ঢুকছে পার্বত্য অঞ্চলে। টেকনাফে কড়াকড়ির পর মাদক ও অস্ত্র চেরাচালানে এ পথে ব্যবহার করছে মাদক চোরাকারবারী ও সন্ত্রাসীরা।

এদিকে, গত সোমবার রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত হন নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আনসার সদস্যসহ সাতজন। এ ঘটনার রেষ কাটতে না কাটতেই  মাত্র চৌদ্দ ঘন্টার মধ্যে একই জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা। জানা গেছে, পাহাড়ে বিবদমান জেএসএস (সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ (প্রসীত) প্রতিপক্ষ হলেও এবার তারা এক হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে।  

এ নিয়ে গত তিনমাসে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে দুটি জোড়া খুনসহ ২০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটল। শান্তিচুক্তির পর এ যাবত্ কয়েকশ মানুষ হত্যা হলেও একটি ঘটনার বিচার হয়নি।

বাঘাইছড়িতে নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ও বিলাইছড়িতে আওয়ামীলীগ নেতাকে হত্যার জন্য রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা ইউপিডিএফ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস-সন্তু লারমা) দায়ী করছেন। পাহাড়ের সাধারণ মানুষদের জেএসএস (সন্তু লারমা),  ইউপিডিএফ (প্রসীত) সহ সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করতে শিগগিরই পার্বত্য চট্টগ্রামে হরতাল-অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয় নেতারা।

সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এই হামলা চালিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মূছা মাতব্বর, সহ-সভাপতি হাজী কামাল উদ্দিন, সহ-সভাপতি নিখিল কুমার চাকমা। আওয়ামী লীগ নেতারা কিছু গণমাধ্যমের সমালোচনা করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে কারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হলেও বারবার বলা হচ্ছে এটা দুর্বৃত্তদের কাজ। কেন জেএসএস ও ইউপিডিএফ এর নাম লেখা হচ্ছে না? তাহলে কী সাংবাদিকরা ভয় পাচ্ছেন?   আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি নিখিল কুমার চাকমা বলেন, পার্বত্য এলাকায় আঞ্চলিক দলের সন্ত্রাসীরা কে কোথায় থাকে এটা প্রশাসনসহ সকলেই জানে। আমরা বারবার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কথা বললেও কেউ অস্ত্র উদ্ধারে এগিয়ে আসে না, একারণেই মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটল।

পাহাড়ে যত খুন হচ্ছে তার বেশিরভাগই ‘পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র থাকার’ কারণে— গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য দিয়ে আসছেন রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার। তার দাবি, পাহাড়ের মানুষ নিরাপদ নয়। পার্বত্যাঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, গুম, হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। মূলত আঞ্চলিক দলগুলো অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে পাহাড়কে অশান্ত করে রেখেছে।

জানা গেছে, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনে আধিপত্য খাটিয়ে অস্ত্রের মুখে সন্ত্রাসী বাহিনীরা ভোট ছিনিয়ে নিতো। কিন্তু এবার তারা তা পারেনি। যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে কঠোর নিরাপত্তায় ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে এ বছর অস্ত্রের মুখে ভোট ছিনতাই করতে পারেনি সন্ত্রাসীরা। কৌশল হিসেবে এবার তারা ভোট বর্জন করে, সুযোগ বুঝে হত্যাযজ্ঞ চালায়। 

এ বিষয়ে র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলে এই সব সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করে নিষ্ক্রিয় করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।’ পুলিশের পক্ষ থেকে একই কথা বলা হয়েছে। আরো একাধিক আইন শৃঙ্খলা বাহিনী একই কথা বলেছে। তাদের অভিমত, সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র থাকলে পাহাড়ে লাশ পড়া বন্ধ হবে না।

ওই সকল বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, ৪৪ কিলোমিটার যে অরক্ষিত সীমান্ত আছে সেখানে রাস্তা তৈরি করে ২৪ ঘণ্টা টহলের ব্যবস্থা এবং কাঁটাতারের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব না করলে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য আসা বন্ধ হবে না।  পাহাড়ে সাধারণ মানুষ তাদের কাছে বন্দি থাকবে। অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।