ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬
৩২ °সে


কেউ পানি পান করতে চাইলে না দেওয়া কেমন দেখায় :প্রধানমন্ত্রী

আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে, ভারতে এলপিজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের লাভ
কেউ পানি পান করতে চাইলে না  দেওয়া কেমন দেখায় :প্রধানমন্ত্রী
গতকাল গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা —ফোকাসবাংলা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভারতের ত্রিপুরায় সাবরম এলাকায় খাবার পানির খুব অভাব। তারা আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি তোলে। ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি ত্রিপুরায় দেওয়া হবে। যার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এই নদী দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে প্রবাহিত। কেউ যদি পানি পান করতে চান, আমরা যদি সেই পানিটা না দেই সেটা কেমন দেখায়? তবে দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করে দেবে এটা কখনো হতে পারে না। ফেনী নদীর গতিপথ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ নদীর উত্পত্তিস্থল বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি। সেখান থেকে মাটিরাঙা হয়ে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত হয়ে এগিয়েছে এ নদী। এর ৯৪ কিলোমিটার পড়েছে দুই দেশের সীমান্তে। বাংলাদেশের ভেতরে আছে শুধু ৪০ কিলোমিটার, যেটা ফেনীর সোনাগাজী হয়ে সাগরে চলে গেছে।

গতকাল বুধবার গণভবনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। সম্প্রতি ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে অর্জিত সাফল্যগুলো তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরার ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরা যদি কিছু চায় তাদেরকে আমাদের দিতে হবে। তারা আমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিল, খাদ্য দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটা ঘাঁটি ছিল। ওখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করা হত। ত্রিপুরা আমাদের জন্য বিরাট একটা শক্তি ছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীমান্তবর্তী হওয়ার কারণে দুই দেশই ফেনী নদীর পানি ব্যবহার করে। সীমান্তবর্তী নদীতে দুই দেশেরই অধিকার থাকে। তিনি বলেন, এটা নিয়ে কেন এতো চিত্কার, আমি জানি না। যারা ক্ষমতায় থাকতে ন্যায্য হিস্যার দাবি করতে ভয় পায়, ভারত সফরে গিয়ে গঙ্গার পানিবন্টনের কথা বলতেই ভুলে যায়, সেই বিএনপির মুখে এসব সমালোচনা মানায় না। সাতটি আন্তঃসীমান্ত নদীতে যৌথভাবে ড্রেজিং করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এসব নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং অন্যান্য বিষয়ে নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সফরে ভারতের সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, তার সব জায়গায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে বলেন, বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে। যারা অপরাধী তারা অপরাধীই। অপরাধী কে কোন দলের, সেটা আমি কখনো দেখি না। অপরাধীদের বিচার হবেই। শুধু বুয়েটেই নয়, প্রয়োজনে সারাদেশেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হলে হলে তল্লাশি করে কোথাও কোনো ধরণের অপরাধমূলক কাজ হচ্ছে কি না তা খুঁজে বের করতে তিনি আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীকে নির্দেশ দেন।

ছাত্র রাজনীতি বন্ধ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা ঘটনা ঘটেছে বলেই ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হবে কেন? এটা তো সামরিক স্তৈরাচারদের মানসিকতা। আমিও ছাত্ররাজনীতি করেই এখানে এসেছি। তাই ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়। তবে বুয়েটসহ কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজেরা সেটি করতে পারে। বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ড প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ নৃশংসতা কেন? এই জঘন্য কাজ কেন? এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যতরকমের উচ্চ শাস্তি আছে সেটা দেওয়া হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দল-টল বুঝি না। অপরাধের বিচার হবেই। আওয়ামী লীগের কেউ এ ধরণের ঘটনা ঘটাবে, তা কখনোই মেনে নেবেন না উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ঘটনা জানার পর তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে ডেকে বলেছেন, জড়িতদের যেন বহিষ্কার করা হয়। এখানে আমি বিবেচনা করব না কিসের ছাত্রলীগ। আগেই আমি নির্দেশ দিয়েছি জড়িতদের গ্রেফতার করতে।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বুয়েটে যে ঘটনা ঘটেছে, এই ঘটনা খুব সকাল বেলা জানার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলাম আলামত সংগ্রহ করার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলেছিলাম যে, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে। তারা সেখানে পৌঁছে যায়। কিন্তু আমার প্রশ্ন, ফুটেজ সংগ্রহে বাধা দিল কারা? আন্দোলনকারীরা নাকি বলছে, ফুটেজগুলো পুলিশ নষ্ট করবে! তিনি বলেন, পুলিশ গেছে আলামত সংগ্রহ করতে। ডেডবডির যাতে ময়নাতদন্ত হয়, সেই ব্যবস্থা করা হলো। ছাত্ররা রাস্তায় নামার আগেই জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, জড়িত সবকটাকে গ্রেফতার করতে নির্দেশ দেই। পুলিশ যে কটাকে হাতে পেয়েছে সবগুলোকে গ্রেফতার করেছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় প্রশ্ন রেখে বলেন, পুলিশকে আসতে দেবে না, আলামত নিতে দেবে না কেন? আইজিপিকে বললাম- বলা যায় না এর মধ্যে কী যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা আছে? ফুটেজ পেলে পরে তারা ধরা পড়ে যাবে এজন্য কী তারা বাধা দিচ্ছে? পরে পুলিশ ফুটেজগুলো সংগ্রহ করে এবং একটা কপি কর্তৃপক্ষকে দিয়ে আসে। সেগুলো দেখে সনাক্ত করার দরকার ছিল, যেটা করা হচ্ছে এখন। শেখ হাসিনা বলেন, কে ছাত্রলীগ, কে ছাত্রদল, কে কী করে আমি সেটা বিবেচনা করিনি। আমি বিবেচনা করেছি অন্যায়ভাবে একটা ২১ বছরের ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে দেখা গেছে, বাইরে অত ইনজুরি নেই, সমস্ত ইনজুরি ভেতরে। যে জিনিসটা আমার মনে পড়ল ২০০১ (বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে) সালে বহু নেতাকর্মীকে এমনভাবে পিটানো হতো। বাইরে থেকে ইনজুরি নেই, তারা মারা যেত। তাই স্বাভাবিকভাবেই এটা সন্দেহের বিষয়, এরা কারা? ভারতে এলপিজি রপ্তানি নিয়ে বিএনপি নেতাদের সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বিদেশ থেকে এলপিজি গ্যাস এনে প্রক্রিয়াজাত করে ভারতে রপ্তানি করব। এটা প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। অন্য পণ্য যেমন আমরা রপ্তানি করি ঠিক তেমন। বরং রপ্তানি তালিকায় নতুন করে এলপিজি যুক্ত হলো। এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কিছু নেই।

আসামের নাগরিক পঞ্জি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসামের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত শান্তই। কোনো অসুবিধা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আমি যখন জানিয়েছি, তখন উনি বলেছেন, কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা না। যখন অসুবিধা হয়নি, তখন উদ্বিগ্ন হওয়ারও কিছু নেই। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ভারতকে ব্যবহার করতে দেওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীতে যত বন্দর আছে সেটা সব দেশ নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে। কেউ বন্দর বানিয়ে একা একা ব্যবহার করে না।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, কোনো অপরাধ ঘটলে অপরাধীদের ধরতে প্রধানমন্ত্রীকেই কেন নির্দেশনা দিতে হয়? কিংবা ছাত্রলীগের কেউ অপরাধ করলে তাকে বহিষ্কার করতেও কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই নির্দেশ আসতে হয়? এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি বুঝি না, কেন বারবার এ প্রশ্ন সামনে আসে। আমি সরকারপ্রধান, দেশের কোথাও কিছু ঘটলে অবশ্যই তা দেখার দায়িত্ব আমার আছে। আমাকে তো এটা কেউ চাপিয়ে দিচ্ছে না। আমি নিজের অনুভূতি ও কতর্ব্যবোধ থেকেই এটা করি। এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, এর আগে একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে রাতে ব্যস্ত হতেন। এগুলো দেখে আপনাদের (সাংবাদিক) বদঅভ্যাস হয়ে গেছে। আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না। নিজের ঘর থেকে শুরু করে সন্ত্রাস-মাদক ও বিতর্কিত কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে চলমান শুদ্ধি অভিযানের কম্পন কতদিন স্থায়ী হবে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। যেখানেই অনিয়ম হবে, সেখানেই ধরব। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বিশাল সংগঠন। অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে, এদের পরিহার করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম উপবিষ্ট ছিলেন।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন