স্বীকারোক্তিতে মনির

‘আমিও স্টাম্প দিয়ে পিটিয়েছি’

দিনাজপুর থেকে আরেক আসামি সাদাত গ্রেফতার

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ইত্তেফাক রিপোর্ট

 ‘বড়ো ভাইদের নির্দেশে আবরারকে তার রুম থেকে ডেকে আনি। এরপর ২০১১ নম্বর কক্ষে আনার পর অন্যদের সঙ্গে আমিও চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি ও স্টাম্প দিয়ে পিটিয়েছি। তবে সে মরে যেতে পারে এটা বুঝতে পারিনি।’ বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মনিরুজ্জামান মনির গতকাল মঙ্গলবার ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের এমনই বর্ণনা দিয়েছেন। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম সরাফুজ্জামান আনছারী তার জবানবন্দি গ্রহণ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এছাড়া গতকাল শামসুল আরেফিন রাফাতকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠায় ডিবি। আদালত রাফাতের পুনরায় চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এছাড়া গতকাল রিমান্ড শেষে আকাশ হোসেনকে আদালতে নেওয়া হলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এদিকে আবরার হত্যার ঘটনায় এজাহারভুক্তহ আরো একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তার নাম এএসএম নাজমুস সাদাত। তিনি বুয়েটের যন্ত্রকৌশল                বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক ছিলেন। গতকাল ভোরে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার কাটলা ইউনিয়ন সংলগ্ন সততা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির অফিস থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় ঢাকার ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সাদাতসহ এই ঘটনায় ২০ জনকে গ্রেফতার করল ডিবি। এর মধ্যে ১৬ জন এজাহারভুক্ত আসামি। এজাহারভুক্ত তিন জন এখনো গ্রেফতার হয়নি। এরা সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িত রয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এরা হলেন মো. জিসান, মো. মোর্শেদ ও মো. তানিম। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ছয় জনকে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি। মনিরুজ্জামানসহ আবরার হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ছয় জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

জবানবন্দিতে যা বলেছেন মনির: ‘১৫তম ব্যাচের বড়ো ভাইরা ডাকতে বলেছিলেন। তাই ওরে (আবরার) ডেকে নিয়েছিলাম। অনিক ও সকাল বেশি পিটিয়েছে। অনিক, রবি ও রাসেলের নির্দেশে আমি আবরারকে তার রুম থেকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে যাই। এ সেখানে অনিক ও রবিন ছাড়াও আরো অনেকে উপস্থিত ছিল। আবরারের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপে থাকা তথ্য দেখে আবরারকে শিবির হিসেবে সন্দেহ করা হয়। এরপর আবরারের কাছ থেকে হলে আরো কারা কারা শিবিরের ঘনিষ্ঠ জানতে চাওয়া হয়। এ সময় প্রথমে চুপ থাকলে তাকে প্রথমে হুমকিধমকি দেওয়া হয়। এরপর যে যার মতো চড়থাপ্পড় মারে। একপর্যায়ে অনিক স্টাম্প দিয়ে আবরারকে পেটাতে থাকে। ওই সময় আমিও আবরারকে চড়থাপ্পড় মারতে থাকি।’

মনির স্বীকারোক্তিতে আরো বলেন, ‘সকাল, জিসান, তানিম, সাদাত, মোরশেদ বিভিন্ন সময় ওই কক্ষে আসে এবং আবরারকে পেটায়। মোয়াজ, বিটু, তোহা, বিল্লাহ ও মুজাহিদও ঘুরে ফিরে এসে আবরারকে পেটায়। একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কয়েকবার বমিও করে। এতেও পেটানো বন্ধ করা হয়নি। একপর্যায়ে আবরারকে ধরাধরি করেন তানিম, মোয়াজ, জেমি সিঁড়ির দিকে নিয়ে যায়। পেছনে মোরশেদ, মুজাহিদ, তোহা, বিল্লাহ, মাজেদও ছিল। পরে ডাক্তার ডাকা হয়। ডাক্তার এসে বলেন, আবরার মারা গেছে।’

উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর রাত ৮টার পর ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারকে আনার পর তাকে শিবির বলে সন্দেহ করে স্টাম্প দিয়ে সবাই মিলে পেটায়। মুজাহিদ ও কয়েকজন স্কিপিং দড়ি দিয়েও পেটান। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

দিনাজপুরে সাদাত গ্রেফতার : আমাদের দিনাজপুর অফিস ও বিরামপুর সংবাদদাতা জানান, বিরামপুর সীমান্ত থেকে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নাজমুস সাদাতকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল বিরামপুর থানার কাটলা সীমান্ত থেকে সাদাতকে গ্রেফতার করা হয়।

সাদাত জয়পুরহাট জেলার কালাই থানার উত্তরপাড়া এলাকার হাফিজুল ইসলামের ছেলে ও বুয়েটের যন্ত্র-কৌশল বিভাগের ১৭তম বর্ষের ছাত্র।

বিরামপুর থানা সূত্রে জানা যায়, বিরামপুরের কাটলা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য কাটলা এলাকার রফিকুল ইসলামের বাড়িতে অবস্থান করছিল সাদাত। গোয়েন্দা পুলিশ খবর পেয়ে বিরামপুর থানা পুলিশের সহযোগিতায় অভিযান চালায়। পরে সীমান্তবর্তী একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা) কর্মরত রফিকুল ইসলামের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। রফিকুল ইসলামের বাড়িটি একই সঙ্গে বাড়ি ও এনজিওর কাজে ব্যবহূত হয়।