ঢাকা সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২০ °সে


সেভ দ্য চিলড্রেন, সিডা-সুইডেন, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স ও ইত্তেফাক আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

শিশু নির্যাতনের কঠিন বৃত্ত ভাঙতে হবে

শিশুর সুরক্ষায় পৃথক মন্ত্রণালয় ও কমিশন গঠনের দাবি
শিশু নির্যাতনের কঠিন বৃত্ত ভাঙতে হবে
গতকাল দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়ে মজিদা বেগম মিলনায়তনে ‘শিশু সুরক্ষা এবং শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল —ইত্তেফাক

‘শিশু সুরক্ষা এবং শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেছেন, শিশুর ওপর নির্যাতন বন্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এটাকে ঘিরে সমাজে নীরবতার যে কঠিন বৃত্ত, সেটা ভাঙতে হবে। শিশুদের সুরক্ষায় সরকার, বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তারা বলেন, মানসিক নির্যাতনের শুরুটা হয় ঘর থেকে। তাই মা-বাবা ও অভিভাবকদের সচেতনতা আগে জরুরি। এর পাশাপাশি আইনি কাঠামোয় শিশু নির্যাতনের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা, শিশুকে শাস্তি না দিয়ে কীভাবে তাদের বিকাশ ঘটানো যায়, সে ব্যাপারে মা-বাবা ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মনোভাব বদলাতে দেশ জুড়ে সামগ্রিক সচেতনতা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। শিশুদের ওপর সহিংস নির্যাতন সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার সেভ দ্য চিলড্রেন-বাংলাদেশ, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (সিডা-সুইডেন), ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স এবং দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়ের মজিদা বেগম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা থেকে শিশু সুরক্ষায় সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি জানানো হয়। সেই সঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের মতো পৃথক ‘শিশু কমিশন’ গঠনেরও দাবি জানান বক্তারা।

বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জুয়েনা আজিজ এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব উম্মে কুলসুম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইট গভর্ন্যান্স ও চাইল্ড প্রটেকশন বিভাগের ম্যানেজার একরামুল কবীর। আলোচনায় শিশু প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন ন্যাশনাল চিলড্রেন টাস্কফোর্সের আহনাফ আনাম অর্ক। সঞ্চালনা করেন ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি জামাল উদ্দীন।

মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া অন্যায়, অপরাধও। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, ‘শিশুদের প্রতি নির্যাতন করাটা আমাদের মজ্জায় মিশে রয়েছে। এটা মানুষের মানসিকতার এতটা গভীরে প্রোথিত যে একে দূর করতে সমাজে ব্যাপক সংস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের গবেষণার ক্ষেত্রেও বড়ো দুর্বলতা রয়েছে।’

তাসমিমা হোসেন বলেন, ‘শিশু সুরক্ষায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ধারণারও বদল ঘটেছে। মানসিকতারও পরিবর্তন ঘটছে। আমরা বুঝতে শিখছি, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা অপরাধ। শিশুর স্বাভাবিক ও সুস্থ বিকাশ তার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তা আমরা বুঝতে পারছি। সেই সচেতনতা সমাজের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের মাঝে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং পরিবারের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। শিশুদের নির্যাতনকে ঘিরে সমাজে যে নীরবতার কঠিন বৃত্ত গড়ে উঠেছে, তা ভাঙতে হবে। শিশুদের সুরক্ষায় সরকার, বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’

মূল প্রবন্ধে একরামুল কবীর বলেন, ৭০টি দেশের ১৫০টি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে শিশুদের ওপর নির্যাতনে শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনে ক্ষতি বেশি হয়; যা তাকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, গত বছর ১ থেকে ১৪ বছরের প্রায় ৮৯ শতাংশ শিশু মা-বাবা ও অভিভাবকদের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক শাস্তির শিকার হয়েছে। এ বছরের গত ১০ মাসে ৪৩ জন শিক্ষার্থী শিক্ষকদের নির্যাতনের কারণে আহত হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একজন ফোকাল পারসন নিয়োগের প্রস্তাব করেন তিনি।

জুয়েনা আজিজ বলেন, আইনে শাস্তির বিধান রাখতে হবে। তিনি শিক্ষক, মা-বাবা যে-ই হোক না কেন, মা-বাবা অবশ্যই শাসন করবেন। কিন্তু কঠোর নির্যাতন করা হলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তিনি বলেন, শিশুদের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

উম্মে কুলসুম বলেন, শুধু আইন থাকলেই হবে না। মানুষের মনোভাবও বদলাতে হবে। পরিবারের মানুষের মানিসক নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক সন্তান আত্মহত্যা করে। তাই শিক্ষক, মা-বাবা—এদের শিশু বিকাশ ও লালন-পালনের জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

শিশু প্রতিনিধি আহনাফ আনাম অর্ক শিশুদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও মানবাধিকার কমিশনের মতো পৃথক ‘শিশু কমিশন’ গঠনের দাবি জানান।

বিশেষজ্ঞ হিসেবে আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, শিশুকে প্রতিমুহূর্তে দিতে হবে মধুর অভিজ্ঞতা, সুন্দর সাজানো সময়। বড়োরা যদি শিশুদের প্রতি দয়া, সুবিবেচনা ও ভালোবাসা দেখায়, তবে শিশুরাও এসব দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। পিইসি-জেএসসি পরীক্ষা শিশুদের জন্য মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের চেয়ারপারসন অধ্যাপক কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, সরকারের জাতীয় পরিকল্পনায় শিশু নির্যাতনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেই সঙ্গে শিশুর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করার বিষয়টি দলীয় নির্বাচনী মেনিফেস্টো ও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইট গভর্ন্যান্স ও চাইল্ড প্রটেকশন বিভাগের পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন বলেন, শিশুর প্রতি নির্যাতন বন্ধে পরিবারের দায়িত্বই প্রধান। শিশুদের সুরক্ষার জন্য সার্বিক গবেষণা খুব একটা নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, “আমাদের শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য পরিবারগুলোর ভূমিকা কী হবে, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী হবে—এই রূপরেখা প্রণয়নে গবেষণা প্রয়োজন।”

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুস শহীদ মাহমুদ বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের আচরণ কী হবে, সেটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।

গণমাধ্যম প্রতিনিধি মিথিলা ফারজানা বলেন, ‘শিশুর ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে আমাদের মানসিকতার পরির্বতন প্রয়োজন, প্রয়োজন সামগ্রিক সচেতনতার।’

আলোচনায় আরো অংশ নেন সাবেক সচিব মো. আনোয়ারুল ইসলাম শিকদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার সাবিনা সুলতানা, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শামীম ফেরদৌস, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের শিশু সুরক্ষা সমন্বয়ক রাফেজা আক্তার শাহীন, কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাসিমা আক্তার জলি, ইনসিডিন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম মুসতাক আলী, ব্লাস্টের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ফারজানা ফাতেমা, আইনজীবী আমিনুল হক প্রমুখ।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন