ঢাকা সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬
২৪ °সে

‘ভাব দিয়ে খোল ভাবের তালা’

সাঁইজির আখড়ায় বিদায়ের সুর
‘ভাব দিয়ে খোল ভাবের তালা’
লালন সাঁইয়ের টানে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া এভাবেই ভক্ত-সাধকদের পদচারণায় ভরে উঠেছিল —ইত্তেফাক

শরীর ভেঙে প্রাণের সাঁইকে ভক্তি দিয়েছেন তিনদিন তিন রাত। গানে গানে চলেছে জ্ঞানের আদান-প্রদান। গুরুর মাজারে আসার বেলায় অনেক আনন্দ থাকলেও বিদায়ের বেলায় কষ্ট। বিদায় বেলায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে এমন কথা জানালেন বাউল ভক্ত নারী-পুরুষরা। তাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল আখড়াবাড়ির পরিবেশ। গুরুকে বারবার প্রণাম ও নানা রকম ভক্তি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিদায় নেন শিষ্যরা। গুরু ভক্তি আর সিদ্ধ মন নিয়ে বিদায় নেওয়ার সময় অনেক বাউল তাদের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। আবার দেখা হবে সাঁইজির উদাসী ডাকের টানে এ প্রত্যাশা নিয়ে পা বাড়ান ফেরার পথে।

ফকির লালন শাহ শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে এমনই এক ঐন্দ্রজালিক মোহময়তা বিস্তার করে রেখেছেন। দিন দিন তার সে ঐন্দ্রজালিক বলয়ের বিস্তৃতি ঘটছে। অগণিত মানুষ তার বিশাল সৃষ্টি জগতে প্রবেশ করে সন্ধান করছেন যেন লালনেরই। বাউল বলাই শাহ বলছিলেন, ‘সবাই লালনের সেই জ্ঞানের স্পর্শ পেতে চায়। চেষ্টা করে। যে যেমন পারে দূরত্বে পৌঁছায়।’

বিছানাপত্র হাতে নিয়ে কথা বলেন দিনাজপুরের বাউল গুরু আকবর শাহ। প্রায় একযুগ বাড়িতে ফেরেন না তিনি। সংসার ধর্ম টানে না তাকে। বাড়ির কোনো খবর রাখেন না। সারা বছর পথেই কেটে যায় এ ফকিরের। তবে মাঝে মধ্যে আসেন সাঁইজির ধামে। মনের তৃষ্ণা মেটাতে। তবে অনেক বাউল, সাধু আখড়া ছাড়লেও অনেকে গুরুর বাড়িতে থেকে যাবেন আরও কদিন।

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার এক গভীর জঙ্গলে সাধক শিরোমণি ফকির লালন শাহ তার অনুসারী ভক্তদের নিয়ে যে আখড়া গড়ে তুলেছিলেন তা এখন সারা বিশ্বের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ফকির লালন শাহ তার গানের বাণীর ভেতর দিয়ে একটি সুসঙ্গবদ্ধ জীবন বিধানের নির্দেশনা দিয়েছেন। তার গান এক গভীর দ্যোতনায় এই বিশ্ব-সংসার, মানবধর্ম, ঈশ্বর ও ইহলৌকিক ও পারলৌকিকতা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য করে। সব মরমী সাধকেরই পরম্পরা থাকে। তবে লালনের দ্যুতি এমনই তীব্র ও রহস্যময় যে তারপরে আর কোনো মরমী সাধক নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি। দুই শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আজো লালন মরমী জগতের সার্বভৌম ব্যক্তি। লালনের গানে সবার ওপরে রয়েছে মানুষ। তিনি মানুষের মাঝেই সত্য সুন্দরের রূপ খুঁজে পেয়েছেন:

মানুষরে দেখরে ভাই দিব্যজ্ঞানে

পাবি রে অমূল্য নিধি এই বর্তমানে

ম’লে পাবো বেহেস্তখানা তা শুনে আর মন মানে না

লালন কয়, বাকির লোভে নগদ পাওনা কে ছেড়েছে এই ভুবনে।

গুরু নহির শাহ জানান, সাঁইয়ের জীবদ্দশায় শুধু তার ভক্ত আর শিষ্যদের নিয়ে মূলত আড়াই দিনের উত্সব করতেন। সে নিময় মেনেই বাউলরা ভাটায় আসে উজানে ফিরে যায় যে যার আপন নিবাসে। প্রকৃত ভেকধারী বাউলরা সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যাপারে খোঁজ-খবরও রাখেন না। তাদের মঞ্চে ডাকলেও তারা আসন ছেড়ে উঠেন না।

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে ভেঙেছে সাধুদের ভাবের হাট। তিন দিনের লালন স্মরণোত্সবের শেষ দিন শুক্রবার দুপুর থেকে বিকালের মধ্যে বারামখানা ছেড়ে চলে যায় সাধু-ভক্তরা। সকালে আখড়া ঘুরে দেখা গেছে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা বাউলরা নিজ নিজ আস্তানা ছেড়ে বিছানাপত্র গুছিয়ে রওনা হয়েছেন। তবে যাওয়ার আগে একে অপরের সঙ্গে ভাব বিনিময়, ভক্তি-শ্রদ্ধা শেষে বেদনা-কষ্ট নিয়ে সকল বাউল ফকির ফিরে যাচ্ছেন যার যার গন্তব্যে। এমন গুরুবাদী, দেহতত্ত্ব গানের আসর থাকবে না, থাকবে না এই বাউল ফকিরদের ভিড়।

গতকাল শুক্রবার তিন দিনব্যাপী স্মরণোত্সবের সমাপনী দিনে আলোচনা সভায় কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো: আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন