ঢাকা শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬
২৭ °সে


পরিবেশবান্ধব হয়নি চামড়া পণ্যের উত্পাদন কমছে রপ্তানি

পরিবেশবান্ধব হয়নি চামড়া  পণ্যের উত্পাদন কমছে রপ্তানি

দেশের বড়ো রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল লেদারের চার বছর আগে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৪০ কোটি টাকার সমপরিমাণ। সর্বশেষ গত বছর তা নেমে এসেছে মাত্র ৬০ কোটি টাকায়। সুইডেন, জার্মানি ও ইতালির নামকরা অনেক ব্র্যান্ডের কাছে চামড়া, চামড়ার তৈরি জুতা ও ব্যাগ রপ্তানি করলেও এখানে উত্পাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের ঘাটতির কারণে পণ্য কিনতে আগ্রহী হচ্ছে না তারা।

বেঙ্গল গ্রুপের মতো দেশের অন্যান্য চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিকারকের রপ্তানি কমছে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই অর্থবছর ধরে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমছে। সর্বশেষ গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৬ কোটি ৫৭ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ। এর আগের অর্থবছরেও রপ্তানি কমেছিল প্রায় ১৪ কোটি ৮৬ লাখ ডলার বা ১ হাজার ২৪৮ কোটি টাকার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১০১ কোটি ৯৭ লাখ ডলারে।

বেঙ্গল লেদারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিপু সুলতান ইত্তেফাককে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানির ক্ষেত্রে তাদের স্থানীয় মানদণ্ড নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিওজি) সনদ প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ এখনো সে সনদ পায়নি। অন্যদিকে ইউরোপেরও এ ধরনের মানদণ্ডে আমরা পিছিয়ে। ফলে তাদের ক্রেতারা আমাদের কাছ থেকে সরাসরি চামড়া কিনতে পারছে না। শুধু তাই নয়, আমাদের স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত হওয়া চামড়াও তারা কিনছে না। আমরা এখন যে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করি, তার ৯০ শতাংশই আমদানিকৃত চামড়া প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে। এ খাতে বিশাল বিনিয়োগের পর এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বলে জানান তিনি। এ খাতের রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ছিল। এ পণ্যের কাঁচামাল (কাঁচা চামড়া) স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করার সুযোগ থাকায় এ খাতে মূল্য সংযোজনের হার গার্মেন্টস পণ্যের চাইতেও বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশি চামড়ার মান সম্পর্কে ক্রেতাদের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে।

নতুন করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চালু হওয়া বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে মার্কিন ক্রেতাদের বেশকিছু ক্রয়াদেশ বাংলাদেশ পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে বছরে ১২ বিলিয়ন ডলারের (১ হাজার ২০০ কোটি ডলার) চামড়াজাত পণ্য আমদানি করে থাকে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে চীনের ওই পণ্যের বাড়তি ১০ শতাংশ হারে শুল্ক বসিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে এসব মার্কিন ক্রেতার একটি অংশ বাংলাদেশ পেতে পারত।

কিন্তু চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কার্যক্রমটি পরিবেশের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে (কমপ্লায়েন্ট) উন্নীত না হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা চাইলেও সরাসরি বাংলাদেশি চামড়া কিংবা চামড়ায় তৈরি পণ্য কিনতে পারছেন না। চামড়াজাত পণ্যে প্রচুর লবণ ও অন্যান্য কেমিক্যাল ব্যবহার হয়। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যক্রমটি পরিবেশগত মানদণ্ডকে বিবেচনায় রেখে করতে হয়। পরিবেশগত সমস্যার কারণে ট্যানারি কারখানা রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারসহ (সিইটিপি) পরিবেশবান্ধব উপায়ে প্রক্রিয়াকরণের লক্ষ্যে সরকার গত কয়েক বছর ধরে কাজ করে এলেও কার্যকর ফল মেলেনি। অথচ দুই বছর আগে একরকম জোর করেই ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তর করা হয়।

সরকারি হিসেবেই সিইটিপি এখনো পুরো প্রস্তুত হয়নি। ৯৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে সিইটিপির কাজ ৯৭ শতাংশও হয়নি। সিইটিপির চারটি মডিউলের সবগুলো এখনো প্রস্তুত হয়নি। এর বাইরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আরো কিছু কাজ এতদিনেও সম্পন্ন হয়নি। ফলে এখানকার তরল বর্জ্য গিয়ে পড়ছে পাশের ধলেশ্বরী নদীতে। এছাড়া কঠিন বর্জ্যও যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। ফলে সেখানে নদীসহ আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। নদীতে কতটুকু সল্ট কনটেন্ট থাকতে পারবে তারও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আছে। কিন্তু ট্যানারি বর্জ্যের ক্ষেত্রে এসবের কিছুই মানা হচ্ছে না।

সম্প্রতি ঢাকায় এ খাতের কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পরিবেশগত মানদণ্ডকে এড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চামড়া পণ্য রপ্তানিতে সফল হতে পারব না। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ট্যানারি শিল্পের মানদণ্ডের বিষয়ে স্বীকৃতি আসতে হবে। সরকার কেবল হাজারীবাগ থেকে স্থানান্তরে মনযোগ দিয়েছে, কিন্তু পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেই।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের এলডব্লিওজিসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত সনদ পাব না। ভবিষ্যতে আমাদের রপ্তানি আরো কমতে থাকবে। ফলে অন্যান্য ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও কেবল পরিবেশগত সমস্যার কারণে আমরা পিছিয়ে যাব।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ আগস্ট, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন