ঢাকা সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
২০ °সে

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

কিছুদিন আগে আমাদের ক্রিকেট টিম যখন দিল্লিতে ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিল তখন হঠাত্ করে দিল্লির ভয়ংকর বায়ুদূষণের খবর আসতে শুরু করল। দেখতে শুরু করলাম দিল্লির ঝাপসা ছবি। দূষণের মাত্রা এতই ভয়ংকর যে এর ভেতর দিয়ে সামনে দেখা যায় না। ৩০টির মতো বিমানের ফ্লাইট রানওয়ে স্পষ্ট দেখতে না পেয়ে অন্য এয়ারপোর্টে গিয়ে অবতরণ করতে বাধ্য হলো। বায়ুদূষণ-সংক্রান্ত রোগবালাই এতই বেড়ে গেল যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলতে শুরু করলেন, দিল্লি এখন একটা গ্যাস চেম্বার। শহরে লক্ষ লক্ষ মাস্ক বিতরণ করা হলো, স্কুলগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হলো। হাইকোর্ট জানতে চাইল, কেমন করে শহরটিতে এরকম বায়ুদূষণ হতে পারে?

নিজের দেশে বসে তখন আমাদের ক্রিকেট টিমের জন্য মায়া হতে শুরু করল। ভাবতে লাগলাম, আমাদের এই ক্রিকেট টিম খেলতে গিয়ে কী রকম বিপদের মধ্যে পড়ল, এই ভয়ংকর পরিবেশে থেকে তাদের কী না কী হয়ে যায়। কখন তারা এই অভিশপ্ত শহর থেকে মুক্তি পাবে, নিঃশ্বাস নেবার যোগ্য একটি শহরের খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারবে?

ঠিক তখন হঠাত্ করে খবরের কাগজে পৃথিবীর রাজধানী শহরগুলোর বায়ুদূষণের মাত্রা নিয়ে একটা প্রতিবেদন আমার চোখে পড়ল। পিএম ২.৫ নামে বাতাসের দূষিত ভাসমান কণার পরিমাণ দিয়ে বায়ুদূষণের পরিমাণ বের করা হয়। সেই মাত্রার পরিমাণে প্রথম স্থান দখল করেছে দিল্লি (প্রতি কিউবিক মিটারে ১১৪ মাইক্রোগ্রাম) এবং তার খুবই কাছাকাছি হচ্ছে আমাদের ঢাকা (৯৭ মাইক্রোগ্রাম)। এর পরের শহরটি (কাবুল) ঢাকা থেকে দূষণের মাত্রায় ৩০ মাইক্রোগ্রাম কম এবং অন্যান্য দূষিত রাজধানী শহর সবই এর কাছাকাছি। Dhaka is the second most air polluted city in the world নামে গ্রিনপিস এবং এয়ার ভিসুয়ালের এই প্রতিবেদনটি এখনো ডেইলি স্টারের অনলাইন সংস্করণে খুঁজে পাওয়া যাবে। দিল্লি ও ঢাকার দূষণের মাত্রা গ্রাফে যখন দেখানো হয়েছে তখন বুকের মাঝে ধক করে একটা ধাক্কা লাগে; কারণ পৃথিবীর দূষিত রাজধানী শহরগুলোর বায়ুদূষণের মাত্রা খুবই কাছাকাছি। শুধু দুটি দেশ একেবারে আলাদা, বায়ুদূষণের তালিকায় অন্য দেশগুলোর প্রায় দ্বিগুণ, সেই ভয়ংকর বায়ুদূষণের শহর দুটি হচ্ছে দিল্লি ও ঢাকা।

সামনে ডিসেম্বর মাস আসছে, আমাদের দেশের সেমিনার-কনফারেন্সের মাস। তখন বিদেশ থেকে অনেকেই দেশে আসেন। অনেকের সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাত্ হয়, পরিচয় হয়। তারা দামি হোটেলের নিরাপদ বাতাসে দিন কাটান। তার পরও যদি খোলামেলাভাবে কথা বলতে দেওয়া হয় তারা অবধারিতভাবে খুব বড়ো বড়ো যন্ত্রপাতি নাড়ছে, ঘটঘট শব্দ করছে ধুলা উড়ছে এবং আমরা সবাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি। আশা করছি, একসময় এই নির্মাণকাজ শেষ হবে, ঢাকা শহর তার আগের সৌন্দর্য ফিরে পাবে। বাতাস একটুখানি হলেও পরিষ্কার হবে।

বায়ুদূষণের আরেকটা বড়ো কারণ হচ্ছে যানবাহন। গাড়ি, টেম্পো, বাস-ট্রাক কিংবা মোটরবাইক। এটি শুধু আমাদের দেশের সমস্যা নয়, এটি সারা পৃথিবীর সমস্যা। আমাদের আলাদা করে এর সমাধান করতে হবে না, পৃথিবীর অনেক দেশ সেই সমস্যার সমাধান করে রেখেছে; আমাদের শুধু সেই সমাধানটি বেছে নিতে হবে।

বড়ো শহরের যানবাহন সমস্যার সবচেয়ে সুন্দর সমাধান আমি দেখেছি ডেনমার্কের কোপেনহেগেন এবং নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম শহরে। এই দুটি শহরের যানবাহনের সমস্যার সমাধান একই রকম। সেটি হচ্ছে সাইকেল! এই শহরগুলোতে সবাই সাইকেলে যাওয়া-আসা করে, শিশুটির জন্ম হওয়ার পর সে হাসপাতাল থেকে বাসায় আসে সাইকেলে, যখন বড়ো হতে থাকে তখন সাইকেলে যাতায়াত করে, বয়স নব্বই হোক আর এক শত হোক সে সাইকেল ছাড়া আর কিছুতে ওঠে না। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে—মৃত্যুর পর তার মৃতদেহটি পর্যন্ত কবরস্থানে নেওয়া হয় সাইকেলে। যার ১০টি গাড়ি কেনার ক্ষমতা আছে সেও সারা জীবনে গাড়ি কেনে না, সাইকেলে ঘুরে বেড়ায়। আমার ধারণা, এটি এখন শুধু এই দুটি শহরের জন্য সত্যি নয়, সারা পৃথিবীতেই এই সাইকেল কালচার শুরু হয়ে যাচ্ছে; তাহলে আমাদের দেশ কেন পিছিয়ে থাকবে?

৩.

ঢাকা শহর সাইকেলের জন্য খুবই উপযোগী একটা শহর তার একটা বড়ো কারণ হচ্ছে পুরো শহরটা সমতল, পৃথিবীর অনেক দেশের মতো উঁচুনিচু নয়। যে কোনো মানুষ একেবারে সাধারণ একটা সাইকেলে করে এই শহরে চক্কর দিতে পারবে। আরেকটি কারণ হচ্ছে ঢাকা শহরের জনবসতির বয়স। অনেক বড়ো একটা অংশ হচ্ছে কম বয়সি তরুণ ও তরুণী। তাদেরকে যদি সাইকেলে যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়া হয় তারা সাগ্রহে এবং সানন্দে সেই সুযোগটা লুফে নেবে। সাইকেলে যাতায়াত করলে শুধু যে বায়ুদূষণ কমবে তা নয়, ট্রাফিক জ্যামও কমবে। আমরা যখন গাড়িতে যাতায়াত করার সময় আশপাশে তাকাই তখন দেখতে পাই, একটা গাড়িতে একজন মানুষ যাচ্ছে। মাত্র একজন মানুষ যদি তার গাড়িতে করে এতখানি জায়গা দখল করে রাখে, তাহলে ট্রাফিক জ্যাম না হয়ে উপায় কী? কিন্তু সেই মানুষটি যদি সাইকেলে যেত, তাহলে কত স্বল্প জায়গা নিয়ে চলাচল করত, কেউ চিন্তা করে দেখেছে কি? শুধু তা-ই নয়, কম বয়সি ছেলে ও মেয়েরা তরুণ ও তরুণীরা সাইকেলে করে স্কুলে যাচ্ছে, কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে কিংবা কাজে যাচ্ছে—এর থেকে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে?

ঢাকা শহরের বিশাল এই সমস্যার খুব সহজ এই সমাধানটি আসলে একটি জায়গায় আটকে আছে। সেটি হচ্ছে, ঢাকা শহরের মানুষ সাইকেল চালাবে কোথায়? কোপেনহেগেন ও আমস্টারডামে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন করে দেওয়া আছে। সবাই সেই লাইনে নিরাপদে সাইকেল চালায়। পেছন থেকে বিশাল একটা ট্রাক তার ঘাড়ের ওপর চেপে বসবে সেটা নিয়ে কাউকে দুর্ভাবনা করতে হয় না। ঢাকা শহরেও যদি আমরা সাইকেল দিয়ে যানবাহনের একটা বড়ো সমাধান করে ফেলতে চাই, তাহলে সাইকেলের জন্য আলাদা একটা লেন করে দিতে হবে। বড়ো বড়ো রাস্তায় পাশে ছোটো একটুখানি জায়গা আলাদা করে দেওয়া যেখানেই সবাই নিরাপদে সাইকেল চালাতে পারবে।

অন্যদের কথা জানি না, যদি আমাদের দেশে সত্যিই কখনো সাইকেলের লেন করে দেওয়া হয়, তাহলে আমি সবার আগে সেখানে সাইকেলে করে নেমে যাব। আমি এই ধূসর আকাশ আর বিষাক্ত বাতাস থেকে মুক্তি চাই।

আমরা এই বিষাক্ত বাতাসের অভ্যস্ত হয়ে গেছি, টের পাই না। যারা বাইরে থেকে আসেন তারা টের পান। আমরা যে একেবারে টের পাই না সেটা পুরোপুরি সত্যি নয়, আমাদের পরিচিত অনেক শিশুর আজকাল নানা ধরনের অ্যালার্জি, শ্বাসপ্রশ্বাসের অসুখ, হাঁপানি যেগুলো নিশ্চিতভাবে বায়ুদূষণের কারণে হচ্ছে। আমরা সহজ করে বলি বায়ুদূষণের কারণে গড় আয়ু কমে যাচ্ছে।

একসময় আমাদের আকাশের রং ছিল নীল। মাঝে মাঝে যখন বিদেশ যাই—যে দেশে বায়ুদূষণ নেই তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যাই। তাদের আকাশটা এখনো আশ্চর্য নীল। কিন্তু আমাদের আকাশ আর নীল নেই, এটি ধূসর! যদিও-বা কখনো নীল আকাশ চোখে পড়ে সেই নীল বিবর্ণ। শৈশবে যখন অমাবস্যার রাতে আকাশের দিকে তাকিয়েছি, সেখানে দেখেছি লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র, আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছায়াপথ, আমাদের গ্যালাক্সি। এখনো সুযোগ পেলেই আমি আকাশের দিকে তাকাই, সেখানে এক-দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ছাড়া আর কিছু নেই। ছায়াপথকে খুঁজে পাই না, শেষবার কখন ছায়াপথকে দেখেছি মনে করতে পারি না। বাতাসের ভাসমান দূষিত কণা আমাদের প্রকৃতির আসল রূপটিকে ঢেকে ফেলেছে, দেখতে চাইলেও সেই প্রকৃতিকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

২.

আমি বায়ুদূষণের বিশেষজ্ঞ নই। তবে পত্রপত্রিকা পড়ে জেনেছি, আমাদের দেশের, বিশেষ করে ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের কারণগুলো হচ্ছে ইটের ভাটা, কলকারখানা, নির্মাণকাজ এবং যানবাহনের ধোঁয়া। আমরা যারাই ঢাকা থেকে বাইরে যাই কিংবা বাইরের শহর থেকে ঢাকায় আসি তারাই এই আতঙ্ক-জাগানিয়া ইটের ভাটাগুলো দেখেছি। একটি দুটি নয়, শত শত ইটের ভাটা। কোনো একটা ফসলের জমি দখল করে ইটের ভাটা তৈরি করা হয়েছে, সেখানে শ্রমিকেরা কাচা ইট তৈরি করছে। অন্য পাশে ইট পোড়ানো হচ্ছে, বিশাল কুিসত চিমনি। সেই চিমনি দিয়ে কুচকুচে কালো ধোঁয়া গলগল করে বের হচ্ছে। আমি নিশ্চিত, আশপাশে যে গ্রাম আছে সেখানকার মানুষের ওপর আকাশ থেকে প্রতিমুহূর্তে কালো ধোঁয়ার কণার বৃষ্টি হচ্ছে। আমি হাইওয়ে ধরে যাই এবং বড়ো বড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলি।

মাঝে মাঝে খবরের কাগজে দেখি যে পরিবেশবান্ধব ইটের ভাটা তৈরি করার উপায় আছে, কখনো কখনো দেখি ইটের বদলে কীভাবে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করা যায়। পত্রপত্রিকায় আমাদের কাঁদুনি শুনে ইটের ভাটা রাতারাতি পরিবেশবান্ধব হয়ে যাবে না, কিন্তু সরকার চাইলে সেটা হতে পারে। যে দেশে সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ হয় সেই দেশ কি তার আত্মমর্যাদার জন্য একটু চেষ্ট করবে না?

কলকারখানা নিয়েও একই ব্যাপার। একসময় দেশ রীতিমতো দরিদ্র ছিল, অর্থনীতি একটুখানি সচল করার জন্য যে যেখানে যেভাবে পেরেছে কলকারখানা বসিয়েছে। সেই কলকারখানার কারণে পরিবেশের কী ক্ষতি হয়েছে সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামানোর চেষ্টা করেনি। কিন্তু এখন তো অন্য ব্যাপার, পরিবেশ রক্ষা করা বাধ্যতামূলক হতে হবে। কলকারখানার মধ্যে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।

আমাদের বায়ুদূষণের আরেকটা বড়ো কারণ হচ্ছে নির্মাণকাজ। উন্নয়নের একটা পর্যায়ে মনে হয়, পৃথিবীর সব দেশকেই এই যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। শুধু ঢাকা শহরেই যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি কিছু একটা তৈরি হচ্ছে।

n লেখক : শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন