ঢাকা বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
১৭ °সে


আন্তর্জাতিক

চৈনিক উপনিবেশের আলোছায়া

চৈনিক উপনিবেশের আলোছায়া

একটা সময় ছিল, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ব্রিটিশদের সুবিশাল রাজত্বে কোথাও না কোথাও সবসময় সূর্য উদীয়মান থাকত। সেসময়ের গল্প এখন ইতিহাস। ব্রিটিশদের সেই উপনিবেশের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। উপনিবেশের পরে এসেছে নয়া উপনিবেশ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী অস্ত্রের প্রয়োগে নয় বরং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মনোজাগতিক উপনিবেশের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বর্তমান সময়ে চীনের ফুলে-ফেঁপে ওঠা বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতি ব্রিটিশদের সেই পুরোনো গল্প মনে করিয়ে দিচ্ছে। চীনের রয়েছে পাহাড় সমান রিজার্ভ, আর সেই অব্যবহূত অর্থ সমানে বিনিয়োগ করে চলেছে বিশ্বের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। চীনাদের এই ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভ’ বিশ্বকে পরিবর্তন করে দেওয়ার একটি মাস্টারপ্ল্যান। এই প্রকল্পের আওতায় সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে যুক্ত হবে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের প্রায় ৬৮টি দেশ। চীনাদের এই ওবিওআর বিশ্বের মোট অর্থনীতির এক-তৃতীয়াংশকে নিয়ন্ত্রণ করবে। ৭৫% প্রাকৃতিক জ্বালানির রিজার্ভ এবং পৃথিবীর ৫০% জনগোষ্ঠী হবে ওবিওআর এর আওতাভুক্ত।

চীনের এই সম্প্রসারণবাদ কার্যক্রমের ভালো উদাহরণ হচ্ছে আফ্রিকা। চীন আফ্রিকায় প্রায় ৫৫৮৩ কিলোমিটার সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করেছে, যা আফ্রিকান অঞ্চলের ৫৪টি দেশকে সংযুক্ত করেছে। এই ঘটনা আফ্রিকান অঞ্চলে একটি মাইলফলক। বর্তমানে আফ্রিকায় প্রায় ১০ লাখ চীনা নাগরিক বসবাস করে। তারা অনেকেই বিয়ে করছেন আফ্রিকান নারীদের, সেখানে গড়ে উঠছে চীনভিত্তিক একটি মিশ্র প্রজন্ম।

চীনের এই নয়া উপনিবেশ মোটেও ভালোভাবে নিচ্ছে না মার্কিনিরা। ২০৪৯ সাল নাগাদ চীনের বিজয়ের ১০০ বছরপূর্তিতে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়নের কাজ শেষ হবে। এই মহাযজ্ঞ শেষ হলে মার্কিনিদের এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় বড়ো ধরনের পরিবর্তন আসবে। বেল্টভুক্ত দেশগুলোতে চীনের বাণিজ্য বাড়বে, ছোটো দেশগুলো হয়ে পড়বে ক্রমান্বয়ে চীননির্ভর। ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট চীনকে করে তুলবে আরো অপ্রতিরোধ্য।

চীনের এই অর্থনৈতিক সম্প্রসারণবাদের আরেকটি নিকটতম লক্ষ্য হচ্ছে চীন-ভারত-বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বেল্ট। বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৭.৩% আসে এই অঞ্চল থেকে। চীনারা তাই এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে বেশ আগ্রহী। মিয়ানমারের আরাকান স্টেটে গভীর সমুদ্রবন্দর এবং এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে ভারত ও চীনাদের আগ্রাসী মনোভাবের খেসারত দিতে হচ্ছে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে। আগামী দিনে হয়তো শ্রীলঙ্কার পরিণতি বরণ করতে হবে মিয়ানমারকে। একই কারণে বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন করতেও তাদের আগ্রহের কোনো কমতি নেই।

বিগত সময়ে চীন প্রযুক্তিগতভাবে অভাবনীয় উন্নতি করলেও বিশ্বব্যাপী প্রভাব ছিল মার্কিনিদের তুলনায় নগণ্য। বর্তমানে ঋণসম্রাট চীনের অর্থনৈতিক ওভারসিজ মিশন সেই বাসনাকে পূর্ণতা দিচ্ছে। চীনারা ঋণের পসরায় ছুটে চলেছে এক দেশ থেকে আরেক দেশে।

চীনা ঋণের কুফল থাকলেও আফ্রিকান অবকাঠামো উন্নয়নে চীনাদের অবদান রয়েছে, তাই অধিকাংশ আফ্রিকান নেতারা চীনের পক্ষে। অপরদিকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশেরও অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই চীনের এই অর্থনৈতিক আগ্রাসন অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি আলোছায়ার ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছে। অনেকের কাছেই বোধগম্য হচ্ছে না চীনের এই আগ-বাড়ানো সহায়তার হাত তাদের কতখানি উপকার করতে পারবে? আবার অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে মার্কিনিদের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিকল্প কিছুও নেই।

n লেখক :প্রকৌশলী

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১১ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন