ঢাকা মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২১ °সে


‘বিষাক্ত বাতাস, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ’

‘বিষাক্ত বাতাস, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ’

বায়ুদূষণের ভয়াবহতা জানা সত্ত্বেও আমরা হরহামেশাই দূষিত করছি প্রকৃতির এই মহামূল্যবান দান। শিল্পকারখানা, অবকাঠামো নির্মাণ, জৈব জ্বালানি, যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটার জ্বালানির কারণে বাতাসে মিশে যাচ্ছে জীবজগতের জন্য ক্ষতিকারক ধূলিকণা, কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন, মিথেন, সিসা, কার্বন মনো-অক্সাইডের মতো মারাত্মক সব গ্যাস। বায়ুদূষণের কারণে বিশ্ব জুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। আর বাংলাদেশের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ বিষাক্ত বাতাস।

উত্পাদনমুখী শিল্পকারখানাগুলোর ধোঁয়ায় বাতাসের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন গ্যাসীয় উপাদান থাকে। শিল্পের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ বায়ুমণ্ডলে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন করছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইন্ডিয়া সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসারণ করছে। শিল্পের মাধ্যমে উন্নত দেশগুলো বায়ুমণ্ডলের বিশাল ক্ষতি করলেও কুফল ভোগ করতে হয় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। মুম্বাই, দিল্লি ও ঢাকার মতো বিশ্বের অপরিকল্পিত বড়ো বড়ো শহরের বায়ুদূষণের একটি বড়ো কারণ হলো যানবাহন। যানবাহনের ধোঁয়া কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড ও সিসাজাতীয় পদার্থ নিঃসারণের পাশাপাশি বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ বৃদ্ধি করে। শহরগুলোতে প্রায় ১৮ শতাংশ বায়ুদূষণের কারণ যানবাহনের কালো ধোঁয়া। প্লাস্টিকের ক্ষতি সম্পর্কে আমরা অনেকেই অবগত। আমাদের ব্যবহূত প্লাস্টিকজাতীয় বস্তু মাটিও নিঃশেষ করতে পারে না, তাই অনেকেই এটা পুড়িয়ে ফেলে। এছাড়া রিসাইক্যাল করতেও প্লাস্টিক পোড়ানো হয়। পলিথিন ও প্লাস্টিক পোড়ানোর মাধ্যমে ক্ষতিকারক কার্বন মনো-অক্সাইড, সালফার, নাইট্রোজেনের পাশাপাশি ডাইঅক্সিনক্স নামক গ্যাস উত্পন্ন হচ্ছে। এই ডাইঅক্সিনক্স খুব ভয়াবহ একটি গ্যাস এবং এটি মানবদেহে ক্যানসার সৃষ্টি করে। গত ১০০ বছরে বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পরিমাণ বেড়েছে ১৪ শতাংশ। বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পরিমাণ ৪০০ পিপিএম ছাড়িয়েছে কয়েক বছর আগেই। এছাড়া ক্ষতিকর ধূলিকণার পরিমাণও বাড়ছে। যেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাস দূষিত করতে ১০০ মাইক্রোগ্রাম ধূলিকণা যথেষ্ট, সেখানে বর্তমানে রয়েছে ৩০০ মাইক্রোগ্রাম কোথাও কোথাও ৪০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত, অর্থাত্ প্রায় চার গুণ বেশি ধূলিকণা। শিল্পায়নের ফলে গত ১০০ বছরে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য গ্যাস বায়ুমণ্ডলে মিশে গেছে, শিল্পায়নের পূর্বে সমপরিমাণ ক্ষতি হতে লেগেছিল ১ হাজার বছর। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক শতাব্দী পর পৃথিবীর অনেক শহর-নগর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাবে।

আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটায় বছরে প্রায় ২০ লাখ টন জ্বালানি কাঠ ও ২০ লাখ টন কয়লা ব্যবহূত হয়। এই বিপুল পরিমাণ জৈব জ্বালানি থেকে বাতাসে বিষাক্ত কার্বন মনো-অক্সাইড এবং বছরে প্রায় ৯০ লাখ টন গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে মিশে যাচ্ছে। ইটভাটাগুলো নির্ধারিত উচ্চতা মেনে না চলার কারণে আশপাশের পরিবেশের বিপর্যয়, কৃষি উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মানুষ শ্বাসকষ্ট, হূদেরাগ, ফুসফুসে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের শহরগুলো বিশেষ করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার বাতাসে বিভিন্ন গ্যাস মিশে দূষণ দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকায় প্রায় ১ কোটি মানুষের বসবাস। তাদের আবাসস্থলের জন্য দালানকোঠা নির্মাণের কারণে যে অল্প কিছু গাছ ছিল, সেগুলোও দ্রুত কমে যাচ্ছে। এছাড়া অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার ধোঁয়া, সর্বোপরি নির্মাণাধীন অবকাঠামো থেকে ধূলিকণার পরিমাণ বেড়ে চলেছে। সারা দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ৪ লাখ ৫৮ হাজার এবং ঢাকাতেই এসব গাড়ির সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার। এসব গাড়ির কালো ধোঁয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জের বাতাসও ভারী হয়ে উঠছে। শুধু ধূলিকণা নয়, ঢাকার বাতাসে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ক্যাডমিয়াম, সিসা, ম্যাঙ্গানিজের মতো বিষাক্ত কণার পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি, যার জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে নগরবাসী, বিশেষ করে শিশুরা। বায়ুমণ্ডলের অন্যতম ক্ষতিকারক উপাদান পিএম ২.৫-এর মাত্রা বাড়ার কারণে শিশুরা শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি, অ্যাজমা ও ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা নেহাত কম নয়। প্রয়োজনীয় গাছপালার অভাবে ঢাকার বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ৩৫০ পিপিএমের ওপরে, যেখানে বিশুদ্ধ বাতাসের জন্য ২৯০-৩০০ পিপিএমের বেশি থাকা উচিত নয়। একদিকে বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস ও ধূলিকণার পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে ডিফরেস্টেশনের জন্য এসব গ্যাস ও ধূলিকনা বায়ুমণ্ডলে মিশে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বৃদ্ধি করছে।

সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশ বায়ুদূষণ ও এর কুফল ভোগ করার দিক দিয়ে অন্যতম। কোনো কোনো সমীক্ষা অনুযায়ী দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান শীর্ষে। উন্নত দেশগুলো ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। এই মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পরিকল্পিত শহর, ফিটনেসবিহীন গাড়ি অপসারণ, দ্রুততম সময়ে অবকাঠামো নির্মাণ, জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও সবুজায়নের দিকে জোর দিতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১০ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন