ঢাকা শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
২৬ °সে

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হোক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হোক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য

মাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের একটি ভাস্কর্য উদ্বোধন করেছেন। এই ভাস্কর্যটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’। ইত্তেফাকে সেটির ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর এমন একটি ভাস্কর্যের স্বপ্ন আমিও দেখি। এটি নিয়ে এর আগেও সরকারের কাছে প্রস্তাবনা রেখেছি কিন্তু সেটি সম্ভবত তাদের নজরে আসেনি, তাই আরো একবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছি। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরটির কথা মনে আসলেই সব থেকে আগে চোখে ভেসে ওঠে যে স্থানটি সেটি ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। পাহাড়ের উপর দুই হাত প্রশস্ত করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক পাথরের ভাস্কর্য যেটির নাম ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। ব্রাজিলে গেলে কোনো পর্যটকই এই স্থাপত্যশিল্প না দেখে ফিরে আসে না।পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। ব্রাজিলীয়রা মনে করে পাহাড়ের উপর স্থাপিত যিশুখ্রিস্টের দুই হাত প্রশস্ত করে রাখা ভাস্কর্যটি যেন তার প্রশস্ত হাত দিয়ে পুরো শহরটাকেই আগলে রেখেছে।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের বিশ্বস্বীকৃতি মিলেছে। পৃথিবীর অগণিত পর্যটক যখন আমাদের দেশে আসবে তখন সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হয়তো কেউ যাবে কেউ যাবে না। কারণ তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের মতো তেমন কিছু সেখানে খুঁজে পাবে না ভেবেই তারা আগ্রহ হারাবে। যদিও সেখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যাদুঘর এবং শিখা অনির্বাণ রয়েছে তার পরও সবার আগ্রহ আসবে না।

রিও ডি জেনিরো শহরের সঙ্গে ঢাকা শহরের বিস্তর পার্থক্য। ওই শহরটা পাহাড় অরণ্যে ঘেরা পক্ষান্তরে আমাদের ঢাকা শহরের একশো কিলোমিটার আশপাশেই কোনো পাহাড় এমনকি উঁচু টিলাও নেই। ফলে দূর থেকে চোখে পড়ার মতো তেমন কিছু নেই এখানে। আমি অনেকদিন থেকে ভেবেছি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে স্থানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে একটি সুউচ্চ টাওয়ার স্থাপন করা উচিত এবং সেই টাওয়ারের উপরে থাকবে তর্জনী উঁচু করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য। টাওয়ারটির উচ্চতা যদি কোনোভাবে ২০ তলা ভবনের সমান করা যায় এবং বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটি যদি ৩০ ফুট উঁচু করা যায় তবে ঢাকা শহরের যে-কোনো প্রান্ত থেকেই সেটা চোখে পড়বে। এই দেশে আগত পযর্টকদের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের জায়গাটি। তারা একই সঙ্গে চিনবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এমনকি যে সব দেশি-বিদেশি তাদের প্রয়োজনে ঢাকাতে আসবে তারাও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুরে যেতে চেষ্টা করবে। দেশি-বিদেশি যারাই বিমান থেকে অবতরণ করবে তাদের চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যটি। স্বাভাবিকভাবেই তাদের আগ্রহ হবে স্থানটিতে ঘুরে যাওয়ার। এতে করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে উঠবে অন্যতম পযর্টন কেন্দ্র।

দেশে যে যে দলই করুক না কেন উপরে যাই বলুক না কেন ভিতরে ভিতরে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর অবদান সম্পর্কে সবাই অবগত এবং শ্রদ্ধাবনত। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে পৃথিবী কেন একজন বাঙালিও মনে রাখতো না যদি সেখানে বঙ্গবন্ধু তর্জনী উঁচু করে ভাষণ না দিতেন এবং সেই ভাষণই বাঙালির স্বাধীনতার ভিত গড়ে দিয়েছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধুর উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ বাঙালিকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। ওই স্থানটি তাই বাঙালির জন্য স্মরণীয় হয়ে গেছে। সুতরাং ওখানে ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের মতো বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য স্থাপন করলে কারো দ্বিমত থাকবে বলে মনে হয় না। যদি তা না হতো তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে স্থাপিত অপরাজেয় বাংলা,টিএসসির রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু করে গাজীপুর চৌরাস্তায় স্থাপিত জাগ্রত চৌরঙ্গী কোনোটিই টিকে থাকতো না। এর আগে অনেক স্থানেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে কিন্তু সেগুলোর আকার এবং অবস্থান ঐতিহাসিক নিদর্শন বহনের জন্য যথেষ্ট নয়। বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে নামে যে প্রবাদটি আছে অনেকটা সেরকমই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের জন্য সব থেকে উত্তম জায়গা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং সেই ভাস্কর্যটি হওয়া চাই ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের মতো সুউচ্চ যেন দূর থেকেও সবাই দেখতে পায় ঐ তো বাঙালির স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন।

এখন কথা উঠতে পারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই ধরনের স্থাপনার জন্য যদি জায়গা বরাদ্দ করা হয় তাহলে উদ্যানের জায়গা কমে যাবে। আমি মনে করি ওই জায়গাটা ওই ভাষণ সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত। আজ আমরা সব দল যে ওখানে সভা-সমাবেশ করার সুযোগ পাচ্ছি তার একমাত্র কারণ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ। যদি সেদিন ওখানে ভাষণ না হতো তাহলে হতে পারতো ঢাকা শহরের অন্যান্য স্থানের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও গড়ে উঠতো আজ জনবসতি এবং তখন আমরা সভা-সমাবেশ করার সুযোগ পেতাম না। আর তাছাড়া স্থানটিতে একটি টাওয়ার নির্মাণ করলে নিশ্চয়ই পুরো অঞ্চলটি ছেয়ে যাবে না। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ একুশে বইমেলাতে আসে। সেই সব অগণিত বইপ্রেমীদের মনেও ধরা দিবে এই ভাস্কর্যটি। ওয়ারেন বাফেটের একটি কথা খুব মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন- ‘আগে জমাও,তার পর যদি কিছু থাকে সেটা খরচ করো’। আমিও মনে করি সবার আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হোক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্মৃতিচিহ্নের ধারক ও বাহক। তার পর যদি বাকি কিছু স্থান থাকে তো বাকি কাজে ব্যবহার করা যাবে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জায়গা বেশ অনেক। একুশে বইমেলার স্থান বাদেও চারপাশে অগণিত স্থান পড়ে আছে। আমার মতে যে স্থানটিতে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে ওখানেই একটি নির্দিষ্ট এরিয়া নির্বাচিত করে সেখানে একটি সুউচ্চ টাওয়ার নির্মাণের এখনি সময় এবং সেই টাওয়ারটা অন্তত চার থেকে পাঁচ হাজার স্কয়ারফিট দৈর্ঘ্য প্রস্থের হওয়া চাই এবং টাওয়ারে ওঠার ব্যবস্থাও থাকা চাই। ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারে যেমন ভাস্কর্যের বেদীতে গিয়ে মানুষ সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারে এটিতেও সেই ব্যবস্থা থাকা উচিত। তবে একটি বিষয়ে শুধু পার্থক্য রাখতে হবে তা হলো- ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের ভাস্কর্যের ভিতরেও প্রবেশের সুবিধা আছে অর্থাত্ সিঁড়ি দিয়ে সরাসরি ভাস্কর্যের হাতের উপর বা মাথার উপরও ওঠা যায়। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে এই সুবিধাটি রাখা উচিত হবে না। যেন শুধু বেদী পর্যন্ত ওঠা যায় সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে।

এখন কথা হলো চার পাঁচ হাজার স্কয়ারফিট জায়গা নেওয়ার পর কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের তামাম জায়গা পড়েই থাকবে সুতরাং চিন্তিত হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। এই টাওয়ারটি নির্মাণ করার আগে ভাস্কর্যশিল্পী এবং এর সঙ্গে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ারদের উচিত রিওডিজেনিরোতে গিয়ে ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার ভাস্কর্যটি ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসা। ঠিক কিভাবে কোন কোন উপাদান দিয়ে এই টাওয়ারটি নির্মাণ করলে দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং অন্তত একই সঙ্গে এক হাজার বা তার বেশি মানুষকে অনায়াসে ধারণ করতে পারবে সেদিকেও নজর দিতে হবে। কেননা ঘুরতে আসা প্রত্যেকেই টাওয়ারে উঠতে আগ্রহ দেখাবে। টাওয়ারের একদম উপরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বেদীর চারপাশের রেলিংএ শক্ত কাচের দেওয়াল দিয়ে ঘিরে দিতে হবে যেন পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় কেননা অনেকেই রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ঢাকা শহরটি দেখতে চাইবে। মূল কথা হলো ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার পর্যবেক্ষণ করলেই বাকিটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এখন আসি নির্মাণ ব্যয় প্রসঙ্গে। অনেকেই বলবেন সরকারি অর্থে এটা নির্মাণ করা কতটা যৌক্তিক? আমি বলতে চাই বঙ্গবন্ধু যদি না থাকতেন তাহলে আজকের এই বাংলাদেশ কি থাকতো? আওয়ামী লীগ,বিএনপি,জাতীয় পার্টি কোনো দল কি থাকতো? কোনো সরকার কি থাকতো? তাহলে বঙ্গবন্ধুই তো সব সরকারের মধ্যমণি হওয়ার কথা। তাঁর জন্য একটি ভাস্কর্য নির্মাণের ব্যয় কেন তবে সরকার বহন করতে পারবে না? যারা বলবেন দেশে অগণিত সমস্যার পিছনে টাকা খরচ না করে একটি ভাস্কর্য নির্মাণে এতো গুলো টাকা ব্যয় করা যুক্তিযুক্ত নয় তাদের বলতে চাই সমস্যা সব সময়ই ছিল এবং থাকবে। তাই বলে এটিকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। আমি তো মনে করি দেশে দলমত নির্বিশেষে অগণিত বঙ্গবন্ধু প্রেমী আছেন যাদের কাছে প্রস্তাব রাখলে এই ভাস্কর্য ও টাওয়ার নির্মাণের পুরো ব্যয় তারা বহন করবে। চাঁদা তুলে হলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু ওয়াচ টাওয়ার এবং সেটির উপরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে। তবে এই পন্থা অবলম্বন করলে সেটি হবে জাতির জন্য কলঙ্কের নাম। যাঁর জন্য দেশ স্বাধীন হলো তাঁর একটি ভাস্কর্য স্থাপনের জন্য যদি চাঁদা উঠাতে হয় সেটি অবশ্যই লজ্জাকর ব্যাপার বলে আমি মনে করি। তবে হ্যাঁ ঘোষণা দেওয়ার পর কেউ যদি স্বেচ্ছায় এই আয়োজনে আর্থিক সহযোগিতা করতে আগ্রহী হয় তবে সেটি অবশ্যই গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি আগত পর্যটকদের মধ্যে যারা টাওয়ারে উঠবে তাদের থেকেও একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত টিকিটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে এতে করে এই স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ কাজ আরো সহজ হবে। এবং হরহামেশা যে কেউ উঠে স্থাপনাটিকে দুর্বল করতে পারবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রতিটি মানুষ আশা করি এ বিষয়টি বিবেচনায় নিবেন। আমি স্বপ্ন দেখি সেই দিনটার যেদিন ঘুম থেকে জেগে বেলকনিতে দাঁড়াতেই সকালে সূর্যটা যেমন চোখে পড়বে তেমনি চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী উঁচু করা ভাস্কর্যটি।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
৩০ মে, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন