ঢাকা শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
১৮ °সে

ভেজালে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করুন

ভেজালে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করুন

মীর আব্দুল আলীম

‘কচু ছাড়া সবকিছুতেই ফরমালিন’—নিরেট সত্য কথা বলেছেন আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এমন স্পষ্ট কথার জন্যই তিনি দেশবাসীর কাছে বেশ জনপ্রিয়। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, নির্ভেজাল খাবার পাওয়া এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। খাদ্য ভেজালের কারণে ক্যানসারসহ জটিল রোগ হচ্ছে। কিছু মানুষ দানব হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে মানুষকে ফেরাতে হবে। তার আরেকটি কথা খুব ভালো লেগেছে। খাদ্যে ভেজালকারীদের গণপিটুনি দেওয়ার কথা বলে রাষ্ট্রপতি বলেন, আগে শুধু পকেট মারলেই গণপিটুনি দেওয়া হতো, এখন খাদ্যে ভেজালকারীদেরও গণপিটুনি দিতে হবে। মানুষকে এ পথ থেকে ফেরাতে হবে। নইলে জাতি হিসেবে আমরা পঙ্গু হয়ে যাব। এদেশে নিরাপদ খাবার কি আদৌ আছে? সব খাবারই তো ভেজালে ভরা। ভেজাল খেয়ে খেয়ে গোটা জাতি আজ রোগাক্রান্ত। আমরা হাত বাড়িয়ে যা খাচ্ছি তার সবকিছুতে তো ভেজাল। এ যুগে, সভ্য সমাজে খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি একেবারে অকল্পনীয়। কিন্তু ভেজালের মাত্রা দিন দিন আমাদের কল্পনাকেও যেন ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব আছে, তাই দেশ খাদ্যে ভেজালমুক্ত হচ্ছে না। আমরা বরাবরই লক্ষ করছি যে, ভেজাল রোধে কোনো সরকারই সচেষ্ট নয়। তাই ভেজাল খাদ্যে ভরে গেছে গোটা দেশ।

এদেশে ভেজাল ঠেকাতে বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ বিভাগটির সুফল আশান্বিত হবার মতো নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভেজাল ও অননুমোদিত খাদ্যসামগ্রী উত্পাদন ও বিক্রির দায়ে বিএসটিআই মাঝে-মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। আদায় করে লাখ লাখ টাকা জরিমানাও। নিধিরাম সর্দারের মতো শুধু মামলা দায়ের ও জরিমানা আদায়ের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা। ফলে ভেজালের কারবারিরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতদিন মাছে ফরমালিন মেশানো হতো। এখন শিশুদের প্রধান খাদ্য দুধেও নির্বিচারে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন যাবত্ প্রকাশ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে পাকানো হচ্ছে আম, কাঁঠাল ও কলা। আর শুঁটকিতে স্প্রে করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ ‘ডার্টি ডজন’ পরিবারভুক্ত কীটনাশক ডিডিটি। আইসক্রিমসহ লোভনীয় সব মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহূত হচ্ছে চামড়া ও অন্যান্য শিল্পে ব্যবহূত বিপজ্জনক রং ও রাসায়নিক। বেকারি পণ্যে মিশানো হচ্ছে গাড়ির পোড়া মবিল আর মসলায় ইটের গুঁড়া। আর বাসি ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রীর ছড়াছড়ি তো দেশের সর্বত্রই। শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলমূলসহ নিত্যদিনের খাবারেই রয়েছে ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিকের ঝুঁকি। পকেটের টাকা খরচ করে যা কেনা হচ্ছে, তার বেশির ভাগই প্রকৃতপক্ষে বিষ। আর বিষাক্ত এ খাবার গ্রহণের ফলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে দেশবাসী। বিশেষ করে শিশুরাই এর প্রধান শিকার।

চিকিত্সকরা শিশুদের নানা রোগের জন্য ভেজাল ও রাসায়নিকযুক্ত খাবারকেই দায়ী করছেন। অধিক মুনাফার আশায় ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের হাতে বিষ তুলে দিচ্ছেন। হাতেনাতে ধরা পড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা নিজ মুখেই বলছেন রাসায়নিক মেশানোর কথা। শুধু নিজের দায়টুকু স্বীকার করছেন না। পাইকারি ব্যবসায়ী দুষছেন খুচরা বিক্রেতাকে। আর খুচরা বিক্রেতা বলছেন, আড়ত থেকেই চলছে এসব। ভেজাল রোধে সরকারি-বেসরকারি নানা চেষ্টা সত্ত্বেও চলছেই এ কারবার।

এসব রং শরীরের জন্য ক্ষতিকর। খাবারের রঙের দাম বেশি বলে ব্যবসায়ীরা কাপড়ের রং ব্যবহার করছেন। দুধেও ফরমালিন দেওয়া হয়। ঐ দুধের স্বাদ কখনোই ঠিক থাকে না। সেদিন জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল এমন ‘মাছের বাজারে মাছি নেই’! প্রতি দিন আমরা যে খাবার খাচ্ছি তাতে যে কোনো এক মাত্রায় বিষ মেশানো আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এই বিষই আমাদের তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিচ্ছে।

কেবল হাসপাতালগুলোতে গেলেই বোঝা যায় কত প্রকার রোগই-না এখন মানবদেহে ভর করে আছে। আসলে আমরা জেনেশুনেই বিষ খাচ্ছি। না খেয়ে উপায়ই-বা কী? তবে উপায় একটা আছে। না খেয়ে থাকলে এ থেকে যেন নিস্তার মিলবে। কিন্তু তা তো হবার নয়। তাই আমে , মাছে, সবজিতে বিষ মেশানো আছে জেনেও তা কিনে নিচ্ছি। আর সেই বিষ মেশানো খাবারগুলোই সপরিবারে গিলে চলেছি দিন রাত। আমরা মনে করি, খাদ্যে ভেজালের অপরাধে দেশে কঠিন শাস্তিযোগ্য আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই। এ অবস্থাই ভেজালকারীদের উত্সাহিত করছে। আর এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ভেজালের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আমজনতা, প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট বিভাগের সবাই মিলে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা প্রদর্শনের কোনোই সুযোগ নেই। এ অবস্থায় সর্বতোভাবে তত্পর হতে হবে বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। সর্বোপরি গণমাধ্যমসহ ব্যাপক জনসচেতনতাও প্রত্যাশিত। তবেই হয়তো ভেজাল থেকে রেহাই মিলবে।

n লেখক :গবেষক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন