ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১১ মাঘ ১৪২৭
২৪ °সে

উইঘুরে অত্যাচার প্রশ্নে পাকিস্তান কেন নীরব

উইঘুরে অত্যাচার প্রশ্নে পাকিস্তান কেন নীরব

অঞ্জন রায় চৌধুরী

চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সিনজিয়ান প্রদেশে সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর চীনা কর্তৃপক্ষ দ্বারা নির্মম অত্যাচার সেদেশে ইসলাম চর্চাকে একটা হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রদেশটির কাসঘর এবং উরুমকি শহরে প্রধান মসজিদগুলো জনশূন্য হয়ে পড়েছে। সেখানে ইসলাম ধর্ম প্রচারে কাউকে আজকাল আর দেখা পাওয়া যায় না। পুরো এলাকা একটা জেলখানায় পরিণত করেছে কর্তৃপক্ষ। মুসলিমদেরকে তাদের আল্লা ছেড়ে চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির ভজনপূজন করার নিদের্শ দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় প্রার্থনা, শিক্ষা এবং রোজা রাখার বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এমনটি চীনের অন্য প্রদেশেও আরবিতে কোনো লেখা প্রচার ও প্রকাশ করার বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে এক প্রকার ভীতি সৃষ্টি করার পুরো আয়োজন সম্পন্ন করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে International Consortium of Investigative journalists (ICIJ) দ্বারা চীনা মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার সম্পর্কিত তথ্য ফাঁস পৃথিবীর অন্যান্য জনসম্প্রদায়কেও বিস্মিত করেছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, চীন কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবিরোধী Education and training Center চালানোর নামে সংখ্যালঘু উইঘুর জনগোষ্ঠীকে কম্যুনিস্ট পার্টির দীক্ষায় দীক্ষিত করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। যারা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে, তাদের কেউ কেউ বর্ণনা দিয়েছে তাদের ওপর দৈহিক অত্যাচারের কথা। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী কিছু উইঘুর এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে।

কিন্তু এই রাষ্ট্রব্যবস্থা সমর্থিত অত্যাচার এবং মুসলিম ইউঘুরদের অমানবিক পরিস্থিতি সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বের অন্য নেতৃবৃন্দকে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা যায়নি। যে মুসলিম বিশ্ব প্রতিরোধ জানিয়েছে ফিলিস্তিনিদের ওপর অত্যাচারে, প্রতিরোধ জানিয়েছে রোহিঙ্গা নিধনে; কিন্তু উইঘুরদের ওপর অকল্পনীয় অত্যাচার তাদেরকে মুখ খুলতে বাধ্য করতে পারেনি। কোনো রাষ্ট্র প্রধানকেও এব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্চ্য করতে আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। তার কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাপট এবং তার প্রভাব।

উইঘুর অধ্যুষিত সিনজিয়ান প্রদেশের সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান এখনো পর্যন্ত উইঘুর অত্যাচার প্রশ্নে নিশ্চুপ। অভিজ্ঞ মহল পাকিস্তানের এই নীরবতাকে প্রভাবশালী চীনের সামনে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছে। তাদের মতে—পাকিস্তানের মধ্যদিয়ে যাওয়া চীনের Belt and Road Initiative এবং তার জন্য বিশাল পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগ পাকিস্তানের জন্য চীনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ একটা বিপদ ডেকে আনতে পারে। উপরন্তু China-Pakistan Economic Corridor (CPEC) প্রকল্পে ৬২ বিরিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে যদি পাকিস্তান এবং চীনের বন্ধুত্বে কোনো বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস (জেনিভা, সেপ্টেম্বর) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কঠোর সমালোচনা করে বলেছে, এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক যে উইঘুরদের চীন দ্বারা অত্যাচারিত হবার প্রসঙ্গে ইসলামাবাদ নীরবতা পালন করে চলেছে এবং বেইজিংকে এ ব্যাপারে সমর্থন করছে। উইঘুর নেতারা বলেন যে, ইমরান খান একদিকে উইঘুর প্রসঙ্গে চোখ বন্ধ করে আছেন, অন্যদিকে কাশ্মীর ইস্যুতে সর্বদা উচ্চকণ্ঠ, যা তার দ্বৈতসত্তার প্রমাণ। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে AL Jazeera তে একটি সাক্ষাত্কারে ইমরান খান নিজস্ব মত অনুযায়ী কাশ্মীরের মানুষের দুর্দশার বর্ণনা দেন এবং BJP সরকার যে কত বর্ণবাদী এবং ফ্যাসিস্ট তারও সুদীর্ঘ বর্ণনা দেন। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে উইঘুর মুসলিমদের ব্যাপারে তার অজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এ বছরের শুরুতে পাকিস্তানের অনেক সাংবাদিক এবং বিশিষ্টজন চীনের উপবাস নিষেধাজ্ঞার নীতির সমালোচনা করেন যার ফলে চীনের ইসলামাবাদস্থিত ডেপুটি চিফ অফ মিশন Lijian Zhao বাধ্য হন তার দেশের হয়ে সাফাই দিতে। তিনি বলেন যে, এই নিষেধাজ্ঞা কেবল চীনের কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য, ছাত্র এবং সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; কিন্তু অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের ২০১৯ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে যে, এই নিষেধাজ্ঞা চীনের Xinjiang প্রদেশে বসবাসরত সব মুসলিমের জন্য প্রযোজ্য।

গত কয়েক মাস থেকে পাকিস্তানের জনগণের কাছে চীনের চিত্রটি মলিন হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ক্রোধের সঞ্চার হয়েছে। কারণ তারা জানতে পেরেছে যে, অল্পবয়সি পাকিস্তানি মেয়েদের চীনে বিবাহের নামে নিয়ে গিয়ে যৌন ব্যবসায়ে নিয়োজিত করা হয় এবং সেখানে মানব অঙ্গের ব্যবসায়ও ঢালাওভাবে চালানো হয়। যদিও চীন এইসব অভিযোগ অস্বীকার করে। উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীনের অত্যাচার, তাদের প্রতি উপহাস নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির দ্বারা পাক জনগণের মধ্যে যে অসন্তোষের সৃষ্ট হয়েছে, সেটি পুঞ্জিভূত হয়ে ভবিষ্যতে ক্রোধের আকার ধারণ করে পাকিস্তান সরকারকে চীনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য করে কি না তাই এখন দেখার বিষয়।

সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি Donald Trump পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার কিছুদিনের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সমালোচনা করে চীনের Xinjiang প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের আটকে রেখে যে অত্যাচার করা হচ্ছে তার প্রতি ঔদাসীন্য দেখানোর কারণে। জম্মু-কাশ্মীরে তথাকথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে পাকিস্তানের প্রচারের বিরোধিতা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের চীনের মুসলিমদের দুরবস্থার প্রতি আরো মনোযোগ দিতে বলে। মার্কিন বিদেশ দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত সহকারী সচিব (দক্ষিণ এবং সেন্ট্রাল এশিয়া) Allice Wells পাকিস্তানকে কাশ্মীরে Article 370 বাতিলের ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়ানো থেকে বিরত থাকতে বলেন। তিনি আরো বলেন যে, কাশ্মীরের ব্যাপারে পাকিস্তানের যে উদ্বেগ, তার সমপরিমাণ উদ্বেগ তিনি পাকিস্তানের থেকে আশা করেন উইঘুর মুসলিমদের ব্যাপারে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বন্দিশিবিরগুলোর প্রতি পাকিস্তানের ইচ্ছাকৃত নীরবতা তাদের মুসলিম ভাইদের প্রতি অমানবিকতা ও দেশটির আসল পরিচয় এবং দ্বৈতভূমিকার প্রকাশ। একদিকে যখন পাকিস্তান কাশ্মীরে Article 370 বাতিল পরবর্তী পরিস্থিতিতে তথাকথিত মানবাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ নিয়ে হইচই বাধাতে ব্যস্ত, অন্যদিকে তারা তাদের নিকটস্থ প্রতিবেশী দেশে সংঘটিত মানবাধিকার হরনের ব্যাপারে নীরবতা পালন করে চলেছে।

n লেখক :দৈনিক ইত্তেফাকের দিল্লি প্রতিনিধি

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন