ঢাকা সোমবার, ২০ জানুয়ারি ২০২০, ৭ মাঘ ১৪২৭
১৯ °সে

অপ্রয়োজনীয় সিজার মা ও শিশুর জন্য ক্ষতিকর

অপ্রয়োজনীয় সিজার মা ও শিশুর জন্য ক্ষতিকর

রাশিদাতুল রোশনী

আমাদের দেশে মাতৃমৃত্যুহার এবং শিশুমৃত্যুর হার গত দশকের থেকে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কিন্তু বেড়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার। সম্প্রতি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, আমাদের দেশে প্রতি বছর ১০ লাখ শিশুর জন্ম হয় অস্ত্রোপচার বা তথাকথিত সিজার পদ্ধতিতে। কিন্তু এর মধ্যে ৫ লাখ ৭১ হাজারের বেশি প্রসবে অস্ত্রোপচারের কোনো প্রয়োজন হয় না। অপ্রয়োজনীয় এই অস্ত্রোপচার বা সিজারের বেশির ভাগই হয়ে থাকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে এবং এই ৫ লাখ ৭১ হাজার অপ্রয়োজনীয় সিজারে মানুষের পকেট থেকে প্রতি বছর ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশে সন্তান প্রসব মানেই সিজার। মাতৃত্ব এখন কতিপয় মানুষের অর্থ উপার্জনের উত্স।

সিজার একটি জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুসারে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রসবে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এ সংখ্যা ৩৫ শতাংশ পেরিয়ে গেছে। সিজার প্রয়োজন যদি রোগীর বা অন্তঃসত্ত্বার উচ্চ রক্তচাপ থাকে কিংবা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকে, মা যদি দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগে ভুগেন; যেমন হার্টের রোগ, বাচ্চার অবস্থানের ত্রুটি থাকে, জরায়ুতে টিউমার থাকে ইত্যাদি সমস্যার কারণে সিজারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে (ইত্তেফাক, ২০ অক্টোবর)। বর্তমানে উপযুক্ত নির্দেশনা এবং পর্যবেক্ষণের অভাবেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদান ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু এই অতিরিক্ত সিজারিয়ানের দায়ভার কার?

বর্তমানে অনেক নারীর কিছু ভুল ধারণাবশত সিজারিয়ানকেই সব থেকে নিরাপদ ব্যবস্থা বলে মনে করে, অনেকে হয়তো জানেই না সিজার স্বাভাবিক সন্তান প্রসব ব্যবস্থা নয়। তাদের কাছে এটি একটি ফ্যাশন। তাছাড়া আমাদের দেশে কিছু বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে; যেখানে স্বাভাবিক প্রসব সত্যিই বিরল ঘটনা, তাই গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা খুব সহজে অন্তঃসত্ত্বা মাকে নিয়ে ডাক্তারের দোরগোড়ায় যাচ্ছে না। কারণ ছাড়পত্রে যে টাকার পরিমাণ থাকবে, তা অনেকেরই সাধ্যের মধ্যে থাকে না এবং এই অপ্রয়োজনীয় সিজারের অন্তঃসত্ত্বা মার শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক দিকে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মনে হয় সিজারের কারণে বাচ্চা মৃত্যু হার কমে গেছে, কিন্তু কৃত্রিম কোনো কিছুই মানুষের জন্য ভালো নয়। স্বাভাবিক প্রসবে মৃত্যু ঝুঁকি ০.১%, কিন্তু সিজারিয়ানে মৃত্যু ঝুঁকি ০.৪%। সিজারের কারণে জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও থাকে অনেক বেশি। স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে শিশুর ফুসফুস থেকে কিছু তরল নিঃসৃত হয়, যা মাতৃগর্ভের বাইরে এসে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য শিশুকে প্রস্তুত করে। কিন্তু সিজারে এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। তাছাড়া সিজার করা মায়েরা তিনবারের বেশি বাচ্চাও নিতে পারে না। সিজার-পরবর্তী সন্তান মায়ের বুকের দুধ পায় অনেক দেরিতে। ফলে মা ও শিশু দুই জনকেই অনেক কষ্টকর সময় পার করতে হয়। সিজারিয়ানের ফলে যে এনেসথেনিসিয়া দেওয়া হয়, তার প্রভাবে নারীদের স্থায়ী কোমর ব্যথার সমস্যা দেখা দেয়। যাকে একটি স্থায়ী পঙ্গুত্বের সঙ্গে তুলনা করা হয়। মানসিকভাবে নারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ সিজারের পর তার ব্যবহারিক জীবনে স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসতে যথেষ্ট সময় লাগে। সিজারের কারণে শারীরিক কষ্ট এবং সন্তানের দুধ না পাওয়া নতুন মায়ের ডিপ্রেশন অনেক বাড়িয়ে দেয়।

আমাদের সবার আকাঙ্ক্ষা একটি সুস্বাস্থ্যকর জীবন, নিরাপদ জীবন। তাই অন্তঃসত্ত্বা মা এবং তার পরিবারের সদস্যদের আরো সচেতন হতে হবে। আমরা সিজারের দিকে যাব যখন আমাদের প্রয়োজন হবে কিন্তু অপ্রয়োজনে সিজার করে পঙ্গুত্ব বরণ করব না।

n লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ ও

গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন