ঢাকা মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬
২৬ °সে

তখন আপনি কী করবেন?

তখন আপনি কী করবেন?

যুদ্ধ-পরবর্তী জাপান। সন্তানরা প্রায় সবাই টোকিওনিবাসী। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেখা করতে গ্রাম থেকে টোকিও আসেন বৃদ্ধ মা-বাবা। বাবা-মা টোকিও আসায় প্রথম প্রথম খুশির আবহাওয়া বিরাজ করে; কিন্তু ব্যস্ততা এবং ভবিষ্যত্ গড়ার খেলায় বেড়াতে আসা বাবা-মা কয়েক দিনের মাথায় সন্তানদের কাছে বোঝাসমতুল্য মনে হতে থাকে। কয়েক দিনের জন্যও ঠাঁই হয় না সন্তানদের কাছে। যুদ্ধে মৃত সন্তানের বধূর আন্তরিকতা দেখালেও শ্বশুর-শাশুড়িকে ঠাঁই দেওয়ার আর্থিক অবস্থা তার ছিল না। বাধ্য হয়ে আবার গ্রামে ফিরে যায় বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রী। পথেই অসুস্থ হয়ে পরে গ্রামে ফিরে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে বৃদ্ধা মা। মায়ের মৃত্যুতে সব ছেলেমেয়েই গ্রামে আসে; কিন্তু সেই শোকও সীমিত। বাবাকে গ্রামে একা রেখে মায়ের রেখে যাওয়া জিনিসগুলো ভাগভাটোয়ারা করে নিয়ে যায় তারা। মৃত সন্তানের বিধবা স্ত্রী আরো কিছু দিন গ্রামে থেকে গেলেও, জীবিকার কারণে একসময় তারও ফেরার সময় হয়। এই গল্পটি জাপানি নির্মাতা ইয়াসুজিরো ওযুর ক্লাসিক সিনেমা টোকিও-স্টোরির।

কিন্তু গল্পটির সঙ্গে মিলে যায় অনেক বাবা-মায়ের জীবন। আমার নানি স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন যোদ্ধা, লেখালেখি করেন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের চট্টগ্রামে প্রথম মহিলা ব্যবসায়ীদের একজন। স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের কারণে আমার নানার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে একাই মানুষ করেন তার সন্তানদের; কিন্তু একটা সময় আমার নানির জীবনেও টোকিও-স্টোরি নেমে আসে। কেউ মাকে রাখতে চাইলেও সে আর্থিকভাবে অক্ষম, আবার কেউ মা কদিনের জন্য ঘুরতে গেলেও ভয় পেয়ে যায়—নাজানি সারাজীবনের জন্য মায়ের ভার নিতে হয়; কিন্তু মায়ের রাখা সম্পদ নিয়ে জল্পনাকল্পনা কমে না। যাহোক আমাদের নানি আমাদের সঙ্গেই থাকেন। শেষটা তার টোকিও-স্টোরির মতো নয়।

কিন্তু অনেক বাবামায়ের জীবনের শেষটা এখন টোকিও-স্টোরির মতোই হয়। রাস্তায় পথেঘাটে বৃদ্ধ বাবামাকে ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনা প্রায় শুনি এবং ঘৃণা করি সেই সন্তানদের। ১০ মাস গর্ভে রেখে এবং নিজের রক্ত পানি করে পেলেপুষে মানুষ করার পর অনেক পিতামাতা এভাবেই মাতৃত্ব-পিতৃত্বের প্রতিদান পান। যেন এমন সন্তানকে পৃথিবীতে আনাই অন্যায়। তবুও সেই সন্তানদের ভালোবেসে যান বাবামা মৃত্যুর আগ-পর্যন্ত। আমি বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মা-বাবার গল্প শুনি না। সে গল্প শোনার সাহস আমার নেই। ২০১৩ সালে বৃদ্ধ বয়সে নিরাপত্তার জন্য পিতামাতা ভরণপোষণ আইন পাশ করা হয়। ভরণপোষণ না করলে জেলজরিমানার বিধানও রয়েছে; কিন্তু কোনো পিতামাতা চান না তাদের নাড়িছেঁড়া ধনের জায়গা হোক জেলে। তাই শেষবয়সে বৃদ্ধাশ্রমের আশ্রয়কেই মেনে নেন। বাবা-মায়ের স্নেহকে শ্রদ্ধা জানিয়েই বলছি, কখনো কি ভেবে দেখেছেন আপনারও সন্তান রয়েছে! বাবামায়ের বয়সটা আপনারও আসবে! তখন আপনি কী করবেন?

n লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন