ঢাকা সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২৩ চৈত্র ১৪২৬
৩৬ °সে

করোনা ভাইরাস :চিকিত্সক, স্বাস্থ্যকর্মী ও শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সুরক্ষা

করোনা ভাইরাস :চিকিত্সক, স্বাস্থ্যকর্মী ও শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সুরক্ষা

২৪ অক্টোবর ২০২০ খ্রি. তারিখে একটি দৈনিক পত্রিকার একটি শিরোনাম—‘এখনো পিপিইর তেমন প্রয়োজন নেই’। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী কথাটি বলেছেন বংলাদেশের মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক মহোদয়। একই দিনে অন্য একটি পত্রিকার শিরোনাম—‘পিপিই ছাড়াই ডিউটিতে র্যাব-পুলিশ।’ সম্প্রতি কোনো কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় চিকিত্সকরা পিপিই সরবরাহের দাবি তুলছেন। কোথাও কোথাও পিপিই না পেলে ধর্মঘটের হুমকিও চিকিত্সকরা দিচ্ছেন। এ অবস্থায় মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়ের কথায় চিকিত্সকদের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হবে, সেটা হয়তো পরে জানা যাবে। পিপিই হলো personal protective equipment (PPE)। বাংলায় বলা যায় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামাদি। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের ও সন্দিগ্ধদের নমুনা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের শরীরে যেন করোনা ভাইরাস বিস্তৃতি ছড়াতে না পারে সেজন্য পিপিই অত্যন্ত জরুরি। দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ও সন্দিগ্ধের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাই মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলতে চাই পিপিইর অবশ্যই প্রয়োজন আছে। করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত কর্তব্যে নিয়োজিত সব চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এখনই পর্যাপ্তসংখ্যক পিপিই সরবরাহ নিশিচত করা প্রয়োজন। পিপিই পরিধান করে ডিউটিতে নিয়োজিত হলে তাদের সাহস ও নিরাপত্তাবোধ বেড়ে যাবে। তারা স্বচ্ছন্দ্যে কর্তব্য সম্পাদন করতে উদ্বুদ্ধ হবেন।

করোনা ভাইরাস-সংশ্লিষ্ট রোগের চিকিত্সার জন্য সর্বপ্রথম চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তি সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কারণ, রোগীর চিকিত্সা ও শুশ্রূষা তারাই করবেন। তাদের যদি সুরক্ষা নিশ্চিতের ব্যবস্থা না থাকে তবে তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। দায়িত্ব পালন করতে চাইবে না বা শিথিলতা প্রদর্শন করবে। আমাদের দেশে চিকিত্সক ও নার্সদের গৌরবময় অতীত আছে। তারা যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি ক্লান্তিকালে মানবতার সেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার পরও প্রত্যেক ব্যক্তিরই নিজের জীবনকে অধিক ভালোবাসার প্রবণতা থাকে। এটাই বাস্তবতা। তাই ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক পোশাক ও সরঞ্জামাদির (personal protective equipment) পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। যারা অন্যের জীবন রক্ষার জন্য কাজ করবে, তাদের সুরক্ষা ও কল্যাণের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার। সাধারণ জনগণের উচিত তাদের সঙ্গে সহযোগিতা ও সদ্ব্যবহার করা। আপত্কালীন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ঝুঁকিভাতা দেওয়ার বিষয়েও চিন্তা করা যায়।

এ ধরনের ক্লান্তিকালে প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণ (motivation) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই করোনা ভাইরাস সংক্রান্তে প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা তৈরি করে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গে প্রশিক্ষণ, ব্রিফিং ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে চিকিত্সক ও নার্সদের মন হতে করোনা ভাইরাসের ভীতি দূর করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক জারিকৃত পরামর্শ, গাইডলাইন ও সতর্কতা মেনে চললে এবং সুরক্ষামূলক পোশাক-সামগ্রী ব্যবহার করলে ভয়ের কিছু নেই। এভাবে অব্যাহতভাবে ব্রিফিং দিয়ে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মনে অবশ্যই ব্যক্তি সুরক্ষা সম্বন্ধে আস্থা, বিশ্বাস ও সাহস জন্মাতে হবে। কর্তব্যে মনোনিবেশ করতে তাদের অবশ্যই আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল থাকতে হবে। তাই প্রশিক্ষণ, ব্রিফিং এবং যে সব দেশ করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে বা হচ্ছে তাদের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মনে আস্থা (confidence) সৃষ্টি করে তাদের মানবতার সেবায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

করোনার বিরুদ্ধে মানবজাতির এটা একটা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে যারা সাহসিকতা দেখাবেন, নিজের ও অন্যের সুরক্ষার জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন অবশ্যই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা তাদের অবদানের স্বীকৃতি ও পুরস্কার দেবে। তার চেয়ে বড়ো কথা তারা নিজেদের গৌরবান্বিত মনে করবেন। গর্বে যেমন তাদের হূদয় ভরে যাবে, তেমনি দেশের মানুষও তাদের সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখবে। মানবতার সেবায় কাজ করার চেয়ে মহান কিছু আর নেই।

জাতির সব দুর্যোগ সময়ে শৃঙ্খলা বাহিনীর যেমন— সেনাবাহিনী, পুলিশ-র্যাব, বিজিবি, আনসার সদস্যদের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়। তাদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সাধারণত ব্যারাকে একসঙ্গে বসবাস করে। আবার কর্তব্যে নিয়োজিত হলেও দলবদ্ধভাবে নিয়োজিত হয়। তাদের কেউ যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তাহলে ব্যারাকের বা কর্তব্যস্থলের অন্য সহকর্মীদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিজের সুরক্ষা আগে নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি সদস্যকে করোনার লক্ষণ, উপসর্গ ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত পরামর্শ ও সতর্কতা সম্বন্ধে সার্বিক জ্ঞান লাভ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ, নিষেধ ও উপদেশ যা সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যম কর্তৃক প্রচারিত হচ্ছে সে বিষয়গুলো সম্বন্ধে তাদের অবহিত হতে হবে। এসব পরামর্শ ও সতর্কতার গুরুত্ব অনুধাবন করে নিজের ও অন্যের সুরক্ষার জন্য তা মেনে চলতে হবে। ব্যারাক, বাসস্থান বা কর্মস্থলে কারো দেহে যদি করোনা ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দেয় তাহলে তাকে কাল বিলম্ব না করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং চিকিত্সকের কাছে যেতে হবে। ভাইরাস অতি অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। তাই এসব ক্ষেত্রে কোনোক্রমেই বিন্দুমাত্র গাফিলতি করা যাবে না। সন্দিগ্ধ ব্যক্তিকে জরুরি ভিত্তিতে কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশনে নিয়ে যেতে হবে। করোনা টেস্ট করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। করোনা সন্দিগ্ধ প্রত্যেক অফিসার ও ফোর্সের সুচিকিত্সা নিশ্চিত করতে হবে। ঊর্ধ্বতন অফিসাররা নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নেবেন।

শৃঙ্খলা বাহিনীর হাসপাতালগুলোতে করোনা ভাইরাস টেস্টের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক হসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত কিট (টেস্টের জন্য) সরবরাহ করতে হবে। দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। বাহিনীর প্রধানগণ এর নিশ্চয়তা বিধান করবেন। শুধু বাহিনীর হাসপাতাল কেন? রাজধানী ও মফস্বলের সরকারি ও বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ হাসপতাল, প্যাথোলোজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করোনা টেস্টের সুবিধা থাকা প্রয়োজন। কেবল দু-একটি সংস্থাকে টেস্টের দায়িত্ব দিলে হয়তো তারা সামলাতে পারবে না। এখনই মানুষ সেবা পাচ্ছে না অভিযোগ করছে। টেস্টে করোনা পজিটিভ পেলে সংশ্লিষ্ট রোগীকে করোনা চিকিত্সার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালে পাঠিয়ে দিবে। সেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাদার চিকিত্সকগণ রোগীর অবস্থা বুঝে চিকিত্সা-প্রটোকল মোতাবেক চিকিত্সা করবেন।

রেজিমেন্টাল ফোর্সের ওপর কমান্ডারদের কমান্ড থাকে। সেকশন কমান্ডার, প্লাটুন কমান্ডার, কোম্পানি কমান্ডার, ব্যাটালিয়ন কমান্ডার তথা ইউনিট ইনচার্জ প্রত্যেকেই করোনা ভাইরাস বিষয়ে অধিক নিষ্ঠাবান ও দায়িত্ববান হতে হবে। এ দুর্যোগের সময় তাদের ভূমিকা অনেক অনেক বেশি। নিম্নপদস্থ কর্মচারীরা স্বভাবতই কম সচেতন থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিজের সুরক্ষার ব্যাপারে তারা উদাসীন। তাই প্রত্যেক লেভেলের কমান্ডার ও ইনচার্জকে তার অধীনস্থ সদস্যদের করোনা ভাইরাসের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্বন্ধে বার বার ব্রিফিং দিতে হবে। পরামর্শ ও সতর্কতা প্রতিপালিত ও অনুসরণ করা হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য তদারকি অফিসারদের সরেজমিনে তদারক করতে হবে। ব্যারাকের বাইরে যখন দলবদ্ধভাবে ডিউটিতে যায় তখন ইনচার্জ অফিসার ফোর্সের আচার-আচরণের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন।

ফোর্সের সচেতনতা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাদের জন্য ব্যারাকে এবং কর্তব্যস্থলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন, সাবান, স্যানিটাইজার, টিস্যু পেপার, মাস্ক, জীবাণুনাশক, স্প্রে ইত্যাদি পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে সদস্যরা ব্যক্তিগত উদ্যোগেও এসব জিনিসের কিছু কিছু নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজের কাছে রাখতে পারে। আবাসস্থল, ব্যবহূত পোশাক, আসবাব, পরিবহন ইত্যাদি নিয়মিত জীবাণুনাশক স্প্রে দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কর্তব্যরত সদস্যদের প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যক্তি সুরক্ষা সামগ্রীও (পিপিই) সরবরাহ দেওয়া আবশ্যক।

হাসপাতালগুলোর বিশেষ করে পুলিশ হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ডাক্তার ও নার্সদের স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নিজস্ব প্রত্যেক হাসপাতালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর জন্য আলাদা ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখতে হবে। কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনের জন্যও ব্যবস্থা এখনই করতে হবে। সেন্ট্রাল ও বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ-র ব্যবস্থা থাকাও একান্ত প্রয়োজন। ডাক্তার ও নার্সের স্বল্পতা থাকলে জরুরি ভিত্তিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ দিতে হবে।

ফোর্সের রোলকল বা ব্রিফিং প্যারেডে হাসপাতালের ডাক্তারগণ উপস্থিত থেকে ফোর্সের উদ্দেশ্যে করোনা সম্বন্ধে সচেতনতা ও সতর্কমূলক বক্তব্য প্রদান করবেন। হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মজুদ রাখা বাঞ্ছনীয়।

সরকারিভাবে করোনা ভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধ করার জন্য নানারকম পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তার মধ্যে বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করছে। কোয়ারেন্টাইনইড স্থানে কর্তব্যরত আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্যদের অধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোয়ারেন্টাইনে অবস্থানরত ব্যক্তিদের অতি কাছে যাওয়া যাবে না। নিরাপদ দূরে থেকে ডিউটি করতে হবে। প্রয়োজনে মাস্ক পড়তে হবে। সাবান বা স্যানিটাইজার ও জীবাণুনাশক স্প্রে সঙ্গে রাখতে হবে। হোম কোয়ারেন্টাইনের ব্যক্তিরা গৃহে থাকে কি না এবং শর্ত ও নির্দেশনা মোতাবেক চলে কি না, তা দেখাশোনা করা বা তথ্য সংগ্রহ করার কাজটি নিষ্ঠা, সতর্কতা ও বিনয়ের সঙ্গে করতে হবে। গণসচেতনতা ও উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও কর্তব্যরত শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণের সম্পৃক্ত থাকার প্রয়োজন আছে।

n লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০৬ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন