ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬
২৮ °সে

সহজ কথা যায় না বলা সহজে

সহজ কথা যায় না বলা সহজে

ফিল্মী দুনিয়ার বিখ্যাত নাম ক্রিস কলম্বাস। হ্যারি পটার সিরিজের দুটি চলচ্চিত্র সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনার পর ওই সিরিজেরই তিন নম্বর চলচ্চিত্র ‘হ্যারিপটার অ্যান্ড দ্য প্রিজনার অব অ্যাজাকাবান’ পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন অ্যালফনসো কোয়ারেনের হাতে। কলম্বাসের এই সিদ্ধান্তে হলিউডিরা একটু চমকেই গিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রিস কলম্বাসের অকাট্য যুক্তি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, স্মতর্ব্য বরং। বলেছিলেন, হ্যারি আর এখন বালক নেই, সে এখন টিনএজার। হাঁসজারু, কচ্ছপ অর্ধেক ঈগল ও অর্ধেক ঘোড়ার হিপোগ্রিফ এখন আর যথেষ্ট নয় তার জন্য। হ্যারি বড়ো হচ্ছে, এখন তার দুনিয়টাকে একটা নতুন চোখে দেখা দরকার। সেজন্য একজন নতুন মানুষও দরকার। শুধু সৃজনশীল নয় আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরও ক্রিস কলম্বাসের মতো এমন উপলব্ধি হওয়াটা জরুরি। প্রত্যেক মানুষকে আত্মোপলব্ধির জন্য, বোধের নবায়নের জন্য, নিজেকে মূল্যায়নের জন্য নিজের কাছে ফিরতে হয়। নিজের কাছে ফেরা মানে অন্তরাত্মার কাছে ফেরা। নইলে নাছোড়বান্দা দম্ভ, পুনরাবৃত্তি এবং ভুল মূল্যায়ন থেকে আমাদের মুক্তি মেলে না। ক্রিস কলম্বাস যা বলেছেন প্রায় একই কথা যুগে যুগে বলে গেছেন মুনি, ঋষি, শাস্ত্রবিদ, পণ্ডিতজন। ধ্যানীরা বলেন, নিজের নিশ্বাসকে চেনা সবচেয়ে জরুরি। নিশ্চয়ই। শ্বাস-প্রশ্বাসকে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ করলেই না মুঠোমুঠো ওষুধ খাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচানো যায়। সক্রেটিসের ‘নো দাইসেলফ’ও ওই একই কথা বলে। নিমগ্নতার মধ্যে যে আত্মনিবেদন থাকে সেটাই প্রাণ সেটাই আত্মা। বিশাল জলরাশি অনন্ত আকাশ নক্ষত্ররাজি গাছপালা নদীর ঢেউ কারোরই ভাষা নেই কিন্তু তাতে কোথাও কোনো অসুবিধা হয় না। কোমল গান্ধার কোমল নিষাদ দরবারি কানাড়া কোনো রাগেরই উচ্চারিত ভাষা নেই কিন্তু তারা কী বলতে চায় তা বুঝতে আমাদের একটুও অসুবিধা হয় না। ‘শুভা গল্পে’ ভাষাহীন শুভার সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় যে যোগাযোগ দেখি; নিশ্চিত করে বলতে পারি কোন ভাষাবিশিষ্ট মানুষের পক্ষে প্রকৃতির সঙ্গে ওই ঘনিষ্টতা অর্জন করা কোনো মতে সম্ভব নয়। বাক্যহীন মানুষ ও বৃহত্তর প্রকৃতির মধ্যে একটি বিজন মহত্ম আছে; আমরা তথাকথিত ভাষাবিশিষ্টরা এই সত্য উপলব্ধি করতে অক্ষম। প্রকৃতিসূত্রে যে ভাষা আমরা পেয়েছি দিনশেষে তার হিসাব মেলাতে গেলে দেখি এই ভাষা দিয়ে যা অর্জন করি তার চেয়ে অনেক বেশি বিসর্জন দিই। অথচ ভাষাবিশিষ্ট হওয়ার জন্য আমাদের দম্ভের শেষ নাই। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, প্রকৃতির এই বিবিধ শব্দ এবং বিচিত্র গতি ইহাও বোবার ভাষা। ঝিল্লিরবপূর্ণ তৃণভূমি হইতে শব্দাতীত নক্ষত্রলোক পর্যন্ত কেবলই ঈঙ্গিত ভঙ্গি সংগীত ক্রন্দন এবং দীর্ঘশ্বাস। ঠিক তাই। এক মানুষ বাদে প্রকৃতির প্রত্যেকের ভাষা সহিষ্ণুতায় পরিপূর্ণ নীরব ভাষা। পড়ন্ত বিকাল সূর্যের কাছে থেকে শেষ আলোটুকু নিয়ে দীঘি লেক পুকুরের জলে যে ছবি তৈরি করে তার কোনো ভাষা নেই। কিন্তু সেদিকে তাকিয়ে ওই ছবি কী বলতে তা বুঝতে কোনোই অসুবিধা হয় না, যদি কেউ বুঝতে চায়। দেখুন, ছবির কোনো ভাষা নেই অথচ হাজারটা বাক্য খরচা করেও যা বোঝানো সম্ভব নয় এক ছবি তা বুঝিয়ে দিতে পারে। আকাশের নিচে নিঃস্তব্ধ সন্ধ্যাকে কথা বলতে হয় না, গভীর রাতের ঝিঁ ঝিঁ পোকা কিংবা জোনাকির দলকে কথা বলতে হয় না। আমাদের চারপাশ ঘিরে আছে যে গাছপালা, লতাগুল্ম, তাদের কথা বলতে হয় না। ফুলের সৌরভকে কথা বলতে হয় না, কথা বলে সুবাস। এমনকি মানুষ যখন গভীর কোনো অনুভূতির মধ্যে থাকে তখন তারও কথা বলার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। লিটল উওম্যান উপন্যাসে অবিরল বৃষ্টিধারার মধ্যে শতচ্ছিন্ন একটি ছাতার দুই পাশে জো মার্চ ও ফ্রিজ ভায়ারের সেই প্রেমের কথা মনে আছে তো? দুজনের কারোরই কিন্তু কথা বলার প্রয়োজন হয়নি। চ্যাপলিনের ‘সিটি লাইটস’ এর ফুলওয়ালী মেয়ে আর সেই ভবঘুরের স্পর্শের সেই দৃশ্যটিকে মনে করুন। আরণ্যক উপন্যাসের লবটুলিয়া আর বইহার গ্রাম ভাষা ছাড়াই কথা বলে।

আমরা দিন শুরু করি শব্দ দিয়ে। হয় মোবাইলের রিমাইন্ডার কিংবা ঘড়ির অ্যালার্মে। সেই যে শুরু, তারপর সারাদিন থাকি শব্দের দুনিয়ায়। অবিরল শুনতে থাকি কোনো না কোনো শব্দ। এমন শহর এখন খুঁজে পাওয়া মুশকিল যে তুলনামূলক শব্দবিহীন, নিজের ইট কাঠ পাথুরে চেহারা ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে। শব্দ মাত্রই পীড়াদায়ক তা নয়। জলপ্রপাতের শব্দ, পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ, নদী কিংবা সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শ্রুতিমধুর। মানুষের কথা হতে পারে সবচেয়ে শ্রুতিমধুর যদি তা কাউকে আঘাত করে না বলা হয়। কিন্তু আমরা মোটেও সেদিকে নজর দিই না। যা বলি তাতে প্রায়শই একজনের কান ও অন্যজনের বাকযন্ত্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। মানে বাকযন্ত্র যা বলতে চায় কানের কাছে তা ঠিকঠাক অনূদিত হয়ে পৌঁছায় না। এজন্য মাঝে মাঝে মনে হয় এই যে সারাদিন আমরা এত শব্দ শুনি এবং নিজেরাও এত কথা বলি এত শব্দের প্রয়োজন আদৌ আছে কি না। বেদে আছে ‘ন মেধয়া ন বহুধা শ্রুতেন’-তর্কের জয় পরাজয় আছে কিন্তু সত্য অপরাজেয়। দেখা যায় সবসময় আমরা তর্কের মাধ্যমে সত্যকে খোঁজার চেষ্টা করি। কেউ বলতে পারেন তর্কের মাধ্যমে সত্যে পৌঁছানো নাও যেতে পারে তা বলে তো আর কথাবার্তা বন্ধ রাখা যায় না। কেজো দিক বিচার করলে এটাও সত্য। কিন্তু ওই যে অন্তত মাঝে মাঝে নিজের কাছে ফেরা জরুরি, নির্জনতা জরুরি, নীরবতা জরুরি। নইলে বহুজাতিক বাণিজ্যিক দুনিয়ার ইঁদুর দৌঁড়ে অজান্তে কখন যে আমরা ইঁদুর হয়ে উঠেছি তা বুঝব কী করে? আরেকটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন। কারো সঙ্গে তর্ক করে কাউকে তার মত থেকে ফেরানো যায় না; যত সে শাণিত যুক্তি হোক। যুযুুধান কোনো পক্ষই নিজের অবস্থান থেকে চুল পরিমাণ সরে আসে না। তাছাড়া কথার মাধ্যমে আমরা একে অন্যকে যেভাবে আঘাত করি, তাতে মাঝে মাঝে মনে হয় তা অস্ত্রের চেয়েও ভয়ঙ্কর। কথার মাধ্যমে বক্তা বোঝাতে চান শ্রোতার কাছে তা কতটুকুই বা পৌঁছায়? অনেক সময় বিপরীত অর্থ হিসেবেও পৌঁছায়, যা তৈরি করে বিবিধ বৈরী সম্পর্ক। বৃষ্টির নানান ছান্দসিক সুরেলা আওয়াজ শুনে আমরা বৃষ্টিকে ছুঁতে চাই, জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে হলেও ছুঁতে চাই। আর মেঘ বিদ্যুতের আড়ম্বর গর্জন শুনে ভয়ে জানালা বন্ধ দিই। ভোরের নরম আলোর কোমল কিরণ দেখলেই জানালা খুলে দিই আর মধ্যাহ্নের প্রচণ্ড দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখে হাঁসফাঁস করি, দূরে থাকতে চাই জানালা থেকে। কথা গান হবে না মেশিনগান হবে সেটা নির্ভর করছে আপনার রুচির ওপর।

n লেখক : কথাসাহিত্যিক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০৭ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন