ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
৩৩ °সে


কথায় বড় কাজে জড়

কথায় বড় কাজে জড়

আমাদের দেশের মানুষেরা সব বিষয়েই হয় ‘খুব ভালো’, অথবা ‘খুব খারাপ’—এই দুই নীতিতে বিশ্বাসী। ‘মধ্য’ বলে এখানে কিছু নেই। সবই সমালোচনার যোগ্য। ধিক্কৃত! সমালোচনা করার অভ্যাসটা অবশ্য এদেশের মানুষের মজ্জাগত। এ ব্যাপারে শুরুতেই বিদ্যাসাগরের একটি অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করা যায়।

একবার বীরসিংহ গ্রামে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বাড়িতে বড় রকম একটা ডাকাতি হয়। ডাকতির সময় বিদ্যাসাগর গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন। প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ জন দস্যু মধ্যরাতে অকস্মাত্ মশাল ও বর্শা হাতে নিয়ে আক্রমণ করায় বিদ্যাসাগর বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে ও বাড়ির অন্য লোকজনদের সরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজে প্রস্তুত রইলেন ডাকাতদের মোকাবিলা করার জন্য। কিন্তু হট্টগোল শুনেও গ্রামবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে ডাকাতদের প্রতিরোধ করার জন্য এগিয়ে আসেনি, একা বিদ্যাসাগর কী করবেন? বাড়ির লোকেরা সবাই বিদ্যাসাগরকে পলায়ন করবার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল, কিন্তু এ গোঁয়ার মানুষটি একবার জেদ ধরলে সহজে ছাড়েন না। তখন বিদ্যাসাগরের পত্নী দীনময়ী দেবী তিন বছর বয়সী পুত্র নারায়ণচন্দ্রকে কোলে নিয়ে সদরের কাছে বসে পড়ে বললেন, তবে আমিও থাকব। ডাকাতরা এসে আগে আমাকে আর ছেলেকে মারুক, কাটুক, তারপর তারা আপনার গায়ে হাত দেবে। পরিবারের অনুরোধে তখন ঈশ্বরচন্দ্রকেও খিড়কির দোর দিয়ে গৃহত্যাগ করতে হয়েছিল।

পরে কলকাতায় ফেরার পর হ্যালিডে সাহেব ঈশ্বরচন্দ্রকে বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, কি হে পণ্ডিত, তোমার গৃহে ডাকাত পড়িয়াছিল শুনিলাম? আর তুমি কাপুরুষের মতোন পশ্চাত্ দ্বার দিয়ে পলায়ন করিলে?

ঈশ্বরচন্দ্র উত্তর দিলেন, আর যদি আমি একা চল্লিশজন দস্যুর সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রাণ দিতাম, তখন আপনি কী বলতেন? বলতেন, লোকটি অতি আহাম্মক! তাই না?

একজন সমালোচকের কাছে পালালেও কাপুরুষতা, না পালালে আহাম্মুকি!

এ প্রসঙ্গে আরও একটি পুরনো গল্প স্মরণ করা যেতে পারে। এক প্রভাবশালী লোকের ছেলে আর গরিবের ছেলে এক সঙ্গে লেখাপড়া করত। কিন্তু প্রভাবশালীর ছেলেটি ঠিকমতো লেখাপড়া করত না, তাই পরীক্ষার পর দেখা গেল তার ছেলে ফেল আর গরিবের ছেলে পাস। এতে প্রভাবশালী লোকটির মানসম্মান থাকে না। আরেকজন এই সুযোগে প্রভাবশালী ব্যক্তিটিকে একটু খোঁচানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না। তিনি গরিব ব্যক্তির ছেলেটির পাস করার রেফারেন্স দিয়ে বলেন, শুনলাম অমুকের পোলায় বিরাট পাস দিছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিটি জবাব দেয়, পাস কইরা লাভ কী? চাকরি তো পাইব না। কিন্তু দেখা গেল ছেলেটি ভালো একটা চাকরি পেল। এখন আবার ওই খোঁচানো স্বভাবের ব্যক্তিটি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রভাবশালী লোকটি বলে, চাকরি পেলে লাভ হবে কি? বেতন তো পাইব না। কিন্তু দেখা গেল মাস শেষে ভালো বেতন পেল! এবার ওই প্রভাবশালী ব্যক্তিটির মুখ থেকে শোনা গেল: বেতন পাইলে কী হবে? ওই টাকা কোনো কাজে লাগবে না!

উল্লিখিত গল্পটিতে বাংলাদেশের মানুষের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। আমাদের দেশে একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা ভীষণ রকম সংশয়বাদী এবং যারা সব কিছুতেই একটা ‘কিন্তু’ খোঁজে। সবকিছুতে খুঁত ধরা বা সমালোচনা করাই তাদের স্বভাব।

আসলে বাঙালিরা খুবই সংশয়বাদী। অন্যের ব্যাপারে আমাদের খুব একটা আস্থা ও বিশ্বাস নেই। বিশেষ করে ‘দলীয় চেতনায় আচ্ছন্ন’ হলে তো কথাই নেই। আমাদের দেশে সব কিছু নিয়েই সমালোচনা। আমেরিকান লেখক, দার্শনিক এলবার্ট হাবার্ড-এর একটা বিখ্যাত উক্তি আছে:To avoid criticism do nothing, say nothing, be nothing. অর্থাত্, সমালোচনা এড়াতে চাইলে কিছু করো না, বলো না, হইও না। যার জীবনে কোনো অর্জন নেই, যে পৃথিবী ধ্বংস হলো কি গড়ল—এটা নিয়ে মাথা ঘামায় না, তাকে নিয়ে কেউ সমালোচনা করার তেমন কিছু খুঁজে পায় না। যখনি আপনি কিছু করতে যাবেন, কিছু একটা বলতে যাবেন, কিছু একটা হতে যাবেন, পৃথিবী দুইভাগ হয়ে যাবে। একদল আপনাকে প্রশংসা করবে, আপনি আরো এগিয়ে যান সেই কামনা করবে, আর আরেক দল আপনার মুণ্ডুপাত করবে।

পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটির বিরুদ্ধেও অনেক সমালোচনা হয়। অবশ্য ‘সবচেয়ে ভালো মানুষ’ বলে আদৌ কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। আপনার কাছে যিনি অনেক ভালো মানুষ, অনেক শ্রদ্ধার পাত্র, অন্যের কাছে তিনি হয়তো ততোটাই বাজে লোক।

আমরা মানুষেরা আমাদের পরিবেশের দ্বারা তৈরি। আমরা যে পরিবেশে বড় হয়েছি, আমাদের বাবা-মা আমাদের যে শিক্ষা আর মূল্যবোধ শিখিয়েছেন, আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা যা শিখেছি, চারদিকের পরিচিত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব থেকে আমরা যে জ্ঞান লাভ করেছি, বই-পত্র-টেলিভিশন-সিনেমা ইত্যাদি থেকে আমরা সাংস্কৃতিক চেতনা পাচ্ছি, সেসব ব্যবহার করে আমরা আমাদের চারপাশকে বিচার করি, মূল্যায়ন করি। প্রত্যেক মানুষের বড় হয়ে ওঠা, শিক্ষার বিষয়বস্তু একে অন্যের চেয়ে ভিন্ন।

সমাজে অনেক মেধাবী এবং গুণী মানুষ আছে যারা শুধু উটকো সমালোচনার ভয়ে নিজের নিরাপদ বলয়ের বাইরে বের হন না। ‘কী দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে, ভালোই তো আছি’—এটা হচ্ছে তাদের চিন্তা। তাদের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমালোচনার বারুদও অনেক তাড়াতাড়ি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আপনি হয়তো কোনো গ্রামের ছেলে-মেয়েদের জন্যে একটা স্কুল করে দিলেন। দুইটা পত্রিকায় আপনাকে নিয়ে বিশাল প্রশংসাসূচক লেখা ছাপা হতে না হতেই অন্য তিনটা পত্রিকায় আপনার নামে যাবতীয় কুত্সা ছড়ানো হবে। পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, কর্পোরেট শক্তির ইন্ধনে আপনি যে স্কুলের নাম করে তলে তলে ‘বিশাল ষড়যন্ত্র’ করে বসে আছেন সেটা নিয়ে অনেক কেচ্ছা-কাহিনি ছাপানো হবে। অথচ আপনি শুধু ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার একটা ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন, এই যা।

আমাদের দেশে এটা প্রচলিত আছে যে, এখানে একজন মানুষের ক্ষতি করা অনেক সহজ কিন্তু কারো উপকার করা অনেক ঝামেলার ব্যাপার। আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা চারদিকের নেগেটিভ জিনিসে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এখন আর মানুষের ভালোত্বে বিশ্বাস করি না সহজে। কেউ যে বিনা কারণে ভালো হতে পারে, স্বার্থহীন হতে পারে এটা বিশ্বাস করতে আমাদের কষ্ট হয়।

যারা সমালোচনার ভয়ে বসে না থেকে নিজের মনের কথা বলে ফেলে, দেশের জন্যে কিছু একটা করার চেষ্টা করে ফেলে, নিজে কিছু একটা হতে চেষ্টা করে তাদের নিয়ে প্রয়াত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট একটা যুগান্তকারী কথা বলেছিলেন: ‘যারা সমালোচনা করছে তারা গুরুত্বপূর্ণ না। যারা আঙুল উঁচু করে দেখিয়ে দিচ্ছে শক্ত মানুষটি কীভাবে হোঁচট খাচ্ছে, তারাও গুরুত্বপূর্ণ না। যারা বাইরে থেকে উপদেশ দিয়ে বেড়াচ্ছে কীভাবে কাজটা আরো ভালোভাবে করা যেত, ওরাও গুরুত্বপূর্ণ না। সব কৃতিত্ব হচ্ছে তার যিনি আসলে সত্যিকার মাঠে নেমে যুদ্ধ করছেন, যার মুখ এবং দেহ ধুলো-ঘামে এবং রক্তে রঞ্জিত। যিনি জীবন দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যিনি বার বার ভুল করছেন এবং জয়ের একেবারে শেষ মাথায় এসে পৌঁছাচ্ছেন। যিনি চরম উত্সাহ, আগ্রহ, সাধনা নিয়ে নিজেকে একটা অর্থপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করেছেন। যিনি বিজয়ী হওয়ার কৃতিত্বের কথা জানেন, কিংবা যদি জয়ী হতে নাও পারেন, অন্ততপক্ষে বীরের মতো চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। অতএব, তার স্থান কখনোই সেই সব ভীরু এবং দুর্বল মানুষের সাথে হবে না যারা জয় কিংবা পরাজয় কোনোটার স্বাদ কখনো পায়নি।’

সমালোচনা করে আদতে তেমন কোনো লাভ হয় না। যে যার স্বার্থ ও বুঝ নিয়ে পথ চলে, কথা বলে। কাজেই আসুন, সবাই সবার সবার প্রশংসা করি। বিড়াল দেখলেই গদগদ হয়ে আদর করি। বিড়াল কালো না ফর্সা, লম্বা কি খাটো, বিছানায় শোয় না খড়ের গাদায়, সেই বিতর্কে না গিয়ে বিড়ালটি ইঁদুর ধরে কি-না সেখানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি।

সমালোচনা করে, বেদনা জাগিয়ে কি লাভ? কবিও বলেছেন, ‘কে হায় হূদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?’

n লেখক: রম্যরচয়িতা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ মে, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন