ঢাকা সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬
২৪ °সে

মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি

মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি

মোহাম্মদ এবাদুল করিম বুলবুল

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতেই মূলত ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র বিশ্বমানচিত্রে স্থান করে নেয়। বিভক্ত দেশের অবিভক্ত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যগত ও জাতিগত অস্তিত্বকে অস্বীকার করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি কেবল ধর্মকে পুঁজি করে পূর্বাঞ্চলের জনগণকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত সহ সকল ক্ষেত্রে শোষণ-নির্যাতন ও জাতিগত বৈষম্য সৃষ্টি করে অস্তিত্বহীন এক জাতিতে পরিণত করতে চেয়েছিল। শাসকগোষ্ঠির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির মুক্তির দিশারী হয়ে পূর্ববাংলার মানুষকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক রাখিবন্ধনে আবদ্ধ করে দীর্ঘ ২৩ বছরের ঔপনিবেশিক শোষণ, নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেন প্রতিবাদে। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয়দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ধাপে ধাপে রূপ নেয় স্বাধীনতার সংগ্রামে।

১৯৭১ সালে ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) উত্তাল জনসমুদ্রে বজ্রকণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেছিলেন: “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। এই একটি ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত করে একই মোহনায় এক কাতারে দাঁড় করিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। এই একটি ভাষণের মধ্য দিয়ে তিনি নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেছেন। আমরা আজ একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন পতাকার মালিক।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই বাংলার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশকে মুক্ত করতে। যাদের হাতে ছিল না কোনো আধুনিক অস্ত্র। পুঁজি বলতে কেবলই ছিল দেশ-মাতৃকাকে মুক্ত করার তীব্র বাসনা। তিনি যে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেটা বাঙালি জাতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান জনগণকে মুক্তি সংগ্রামে প্রবলভাবে প্রেরণা জুগিয়েছিল, বাঙালি জাতির হূদয়ে শিহরণ জাগিয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে যখন বলতো—বল,“পাকিস্তান জিন্দাবাদ”। এরকম মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও বহু মুক্তিযোদ্ধা বলেছিলেন: “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”।

হানাদার বাহিনী ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে এ বাংলার মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে রক্তের সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে যে ভয়ঙ্কর খেলায় মত্ত হয়ে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল, সেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৯৩ লাখ সদস্য মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে নিজের রিভলবার জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল তখনো এদেশের হূদয়জুড়ে স্লোগান উঠেছিল: “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও স্বাধীনতা একই সূত্রে গাঁথা তিনটি শব্দ। বাঙালির মুক্তি আর গৌরবময় পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তাঁরই নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় স্বাধীনতার লাল-সবুজের পতাকাকে ছিনিয়ে এনেছিল এ বাংলার সূর্যসন্তানেরা। সেই থেকে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু ইতিহাসে সমার্থক শব্দ হয়ে আছে। এ “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগানই মহান মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি; আমাদের দেশপ্রেম প্রকাশের ঐক্যের প্রতীক। এ স্লোগান কোনোভাবে কোনো একটি দলের স্লোগান হতে পারে না। এ স্লোগান আপামর জনসাধারণের স্লোগান, রাষ্ট্রীয় স্লোগান। সময় এসেছে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগানকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার।

n লেখক : সংসদ সদস্য ও তথ্যমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন