ঢাকা সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬
২৪ °সে

আমরা কি স্বকীয়তা হারাতে বসেছি?

আমরা কি স্বকীয়তা হারাতে বসেছি?

আশরাফ উদ্দীন রায়হান

বাংলাভাষার প্রতি আমার অনির্বচনীয় যে ভাবাবেগ আর ভালোবাসা তার দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যেতে না পারার কারণেই আজ আমি সে ব্যাপারে কথা বলতে আগ্রহবোধ করছি। এ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অনেক শুভানুধ্যায়ীকে বারবার পরামর্শ দিয়েই নয়, নিজের অবস্থান থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করেও উল্লেখযোগ্য কোনো ফলাফল পাইনি। কিন্তু আমি হতাশ নই। হবোও না। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের মতোন ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে যাওয়ার অভিলাষই যেন অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিকট অতীতে প্রশ্নফাঁস নিয়ে আমাদের শিক্ষাঙ্গনের ইতিহাসে যে নাটকীয়তা হয়ে গেল, সে ব্যাপারে তিনি সবসময় সরব ছিলেন। জাতীয় দৈনিকসমূহে এ প্রসঙ্গে লেখালেখির মাধ্যমে প্রতিবাদও করে গেছেন নিয়মিত। অবশেষে দেখা গেল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বোধোদয়-সদিচ্ছা আর বুদ্ধিজীবী মহলের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার ফলশ্রুতিতে প্রশ্নফাঁস ছাড়াই পাবলিক পরীক্ষাসমূহ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এজন্যে সরকার যেমন ধন্যবাদার্হ সঙ্গে সঙ্গে লেখালেখিসহ যারা প্রশ্নফাঁসের ন্যায় একটি জাতীয় ব্যাধির প্রতিকারে ভূমিকা রেখেছেন তাদের অবদানও প্রশংসনীয় বৈকি। একটি অনিয়ম যখন বিস্তার লাভ করে ফেলে তখন সেটি থেকে বের হওয়াটা মুশকিলই বটে। উপরন্তু এই ‘অনিয়ম’ পদবাচ্যটি যখন স্বজাত্যবোধ আর স্বকীয়তার প্রশ্নের সম্মুখীন হয় তখন এর আবেদন, তাত্পর্য তথা গুরুত্ব বোধ করি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রকাশ হওয়ার কথা! রবীন্দ্রনাথ থেকে নিয়ে প্রমথ চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহসহ কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ ভাষাবিদ-লেখকেরা আমাদের বাংলাভাষাকে ঋদ্ধ করে দিয়ে গেছেন। এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, অনেক ত্যাগ আর তিতিক্ষার ফসল আমার এ মাতৃভাষা। সেই চর্যাপদ থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক যুগ পর্যন্ত কত বন্ধুর পথ মাড়িয়ে বাংলাভাষা যে চমত্কার ও অনিন্দ্যসুন্দর রূপ পরিগ্রহ করেছে তার নেপথ্যে কতজনের যে বেশুমার অবদান রয়েছে, তার হিসেব আমরা ক’জন রাখি? আমার ভাব-ভাবনা, অনুভব-অনুভূতি আর উপলব্ধি সবই তো প্রকাশ করি বাংলায়।

কিন্তু এই সব আবেগ আর চেতনা মিইয়ে যাবার উপক্রম হয় যখন বর্তমান প্রজন্মের প্রায় অনেকের দ্বারাই বাংলাভাষার মর্যাদাহানী চোখে পড়ে! কেউ কেউ তো ওঠেপড়ে লেগেছে বাংলাকে অবজ্ঞার বিষয় ভেবে, যদিও তা উদাসীনতাপ্রসূতই! হালআমলে ফেসবুক-মেসেঞ্জার থেকে নিয়ে প্রায় সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই বাংলাভাষাকে বিকৃত করে এর গৌরব আর ঐতিহ্যের সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে! বলাবাহুল্য যে, এমন অপরিণামদর্শিতা আমাদের স্বকীয়তাবোধকে জলাঞ্জলি দেয়ারই নামান্তর। লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, বাংলা উচ্চারণ কী ভয়াবহভাবে বিকৃত ইংরেজি উচ্চারণ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যাচ্ছে! ভাষা বিকৃতির যেন প্রতিযোগিতা চলছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার অজুহাতে আমরা ইংরেজিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বাংলাকে রীতিমতো অবজ্ঞা করছি। বিশেষ করে এফএম রেডিওতে যে নিন্দনীয় উচ্চারণে বাংলা বলা হয় তা স্পষ্টত বাংলা বিকৃতি ছাড়া কিছু নয়। এফএম রেডিওর সঞ্চালকদের বাংলা ও ইংরেজি ভাষার মিশ্রণ ও বিকৃতকৃত উচ্চারণের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঁচমিশালি ভাষার যাত্রা শুরু হয়েছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে বাংলা আর ইংরেজি ভাষার মিশ্রণ এত প্রিয় হয়ে ওঠেছে যে, এটিকে তারা বাংলিশ বা বাংরেজি ভাষা বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে! ভাষা বিকৃতির নতুন উপদ্রব হিসেবে দেখা যায় যে, অনেকেই বাংলার সঙ্গে ইংরেজি বাদেও হিন্দি-উর্দুর মিলন ঘটিয়ে ফেসবুকে অনুভূতি শেয়ার করেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তিদের এমনটি করতে দেখা যায়। বিস্ময়ের অন্ত থাকে না, যখন উচ্চমাধ্যমিকের একজন শিক্ষার্থী ‘ষ্ণ’ যুক্তবর্ণ আলাদা করতে গিয়ে আটকে যায়। আটকে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক : সে তো ‘তৃষ্ণা’-কে ‘Thrishna’ লেখার অভ্যাস গড়ে তুলছে! অনেকেই কারণ হিসেবে উল্লেখ করতে চাইবেন বাংলা কি-বোর্ডে টাইপ করতে সময় বেশি লাগে, তাই সুবিধার জন্যেই বাংলিশ বা বাংরেজি লিখি। তাদের উদ্দেশে বলি : কি-বোর্ডে যখন ইংরেজি বর্ণগুলোর উপরে অঙ্ুলি সঞ্চালন করতে সক্ষম হয়েছেন তখন সামান্য চেষ্টা করলে বাংলা বর্ণমালার ওপরও আপনার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। তাই এই ভাষা তথা বানান বিকৃতির যে অনভিপ্রেত ও অযাচিত বিপর্যয় শুরু হয়েছে তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কেননা এ ভাষা যে রক্তের বিনিময়ে কেনা..

n লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন