ঢাকা বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬
৩৩ °সে


কমিটি নিয়ে হানাহানি আদর্শের পরিপন্থি

কমিটি নিয়ে হানাহানি আদর্শের পরিপন্থি

ছাত্র রাজনীতিতে কমিটি গঠন নিয়ে বরাবরই সহিংসতা-অসন্তোষ আমরা লক্ষ করেছি। এমনকি দেশ ভাগের পূর্বেও পদ-পদবি বঞ্চিতদের সহিংস হতে, বিদ্রোহ করতে দেখা গেছে। এটি নতুন কিছু নয়। স্বাধীন বাংলাদেশেও সব রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে এ সংস্কৃতি দেখা গেছে। তারপরও ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বর্তমান রাজনীতিতে চিরাচরিত সেই সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারেনি। কী ছাত্র দল, কী ছাত্রলীগ আর কী ছাত্র ইউনিয়ন—সব ছাত্র সংগঠনই কমিটি গঠনের বেলায় একই সূত্রে গাঁথা। ১৩ মে (২০১৯) ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হবার পর পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের এ কমিটিতে অছাত্র, ছাত্রদলের কর্মী, বিবাহিত ও বিতর্কিতদের স্থান দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগ করে বিক্ষোভ মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করেছে পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা। তারা নিজেদের ক্যাম্পাসে হামলার শিকারও হয়েছে। চলতি বছর এপ্রিল মাসে দ্রুত ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের তাগিদ দিয়েছিলেন ষাটের দশকের ছাত্রলীগ নেতা শেখ হাসিনা। পহেলা বৈশাখের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজন বানচালের ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, ‘তাহলে কী হলো? ছাত্রলীগ তো আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।’ সেদিন এক কেন্দ্রীয় নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ঘটনায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ছাত্রলীগের সাবেক কিছু নেতার ইন্ধন আছে জানালে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়ে গেলে এসব খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যেত।’

২৮ বছর পর ১১ মার্চ (২০১৯) ‘ডাকসু’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। তখন থেকে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে নতুন নেতৃত্ব ও ভবিষ্যত্ ছাত্র রাজনীতির গতি-প্রকৃতি। শেখ হাসিনা তাঁর একটি প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘ছাত্র রাজনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যত্ নেতৃত্বদানে নিজেকে গড়ে তোলা।’ (শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র ১, পৃ ১৭৯) এজন্য তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার উপযুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন ১৯৯৪ সালে। পূর্বে উল্লেখিত ‘আগে শিক্ষা, পরে রাজনীতি’র মতো ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর কারো মুখের দিকে না তাকিয়ে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসে জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘যথাযথ ব্যবস্থা’ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।

অবশ্য দুই দশক আগে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ছাত্রদের দিয়ে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার চিন্তা করেছেন। ১৯৯৪ সালে তাঁর লিখিত ‘শিক্ষিত জনশক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত’ শীর্ষক প্রবন্ধে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। দেশের উত্পাদনমুখী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। প্রতিটি ছাত্র যাতে তাদের নিজস্ব স্বাভাবিক মেধা-মনন, ক্ষমতা ও প্রবণতা অনুযায়ী পেশা বেছে নিতে পারে তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। সেসময় তাঁর প্রত্যয়দৃপ্ত উচ্চারণ ছিল- ‘শিক্ষাঙ্গনে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমরা বদ্ধপরিকর।’ আগেই বলা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা বিরাজ করলে তা প্রতিবিধানে তিনি সবসময়ই উদ্যমী ভূমিকা পালন করেছেন। উক্ত প্রবন্ধে তিনি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দিয়ে নিরক্ষরতা দূর করার কথা বলেছিলেন। ছাত্রদের কাজে লাগানোর তাঁর সেই স্বপ্ন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর ভিন্ন আঙ্গিকে সম্পন্ন হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে ছাত্ররাজনীতির রূপ পাল্টেছে। ২০১৯ সালের ছাত্ররাজনীতি এবং ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতি কখনই এক নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের পর ছাত্ররাজনীতি এবং বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতার রাজনীতি একেবারেই ভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে ছাত্রসংখ্যা এবং বর্তমানের ছাত্র সংখ্যার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে একটা স্পৃহা কাজ করতো, দেশকে স্বাধীন করতে হবে। কারণ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আলাদা একটা ভূখণ্ড হবে এবং বাংলাদেশ তার আত্মপরিচয় হিসেবে জাতীয় সংগীত ও পতাকা পাবে। সর্বোপরি পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। ১৯৭১ সালে ছাত্ররা যুদ্ধ করেছে দেশের বাইরের শক্তি পাকিস্তানের সঙ্গে; কিন্তু বর্তমানে ছাত্রসংগঠনগুলো দেশের ভেতরে অর্থাত্ ঘরের ভেতরের শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ভেতর এমন কতকগুলো সংগঠন রয়েছে যারা বাঙালি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতানাকে ধারণ করে না এবং যারা ধারণ করে তাদেরকে দমন করার চেষ্টা করে। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের চিন্তা-চেতনা হলো কীভাবে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধশালী এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের চিন্তা-চেতনা ও কর্মসূচির সঙ্গে ছাত্রলীগের চিন্তা-চেতনার একটা গভীর মিল রয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সরকারের এই কর্মসূচিকে সমর্থন করে এবং এর সফলতার জন্য কাজ করে। অন্যদিকে ছাত্রলীগ শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি করে। এদিক থেকে ছাত্রলীগের প্রধান মন্ত্র হলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের কমিটি নিয়ে হামলা-মামলার ঘটনা সত্যিই নিন্দনীয়। পদবঞ্চিতদের নিজেদের সংযত করে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রেখে, আদর্শের রাজনীতি করার প্রত্যয়ে পরিচালিত হতে হবে- এটাই সকলের প্রত্যাশা।

n লেখক :অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৭ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন