ঢাকা বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬
৩৩ °সে


খাদ্যে ভেজাল দৌরাত্ম্যের শেষ কবে?

খাদ্যে ভেজাল দৌরাত্ম্যের শেষ কবে?

মাহমুদুর রহমান খান

সারাবিশ্ব যেখানে খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে আজ কঠোর অবস্থানে ঠিক তখনই আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত খাদ্যে ভেজাল নিয়ে পাওয়া যাচ্ছে নতুন নতুন তথ্য। খাদ্যে ভেজালের দৌরাত্ম্য বিশ্বের উন্নত দেশগুলো থেকে শুরু করে কমবেশি প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর ভোক্তাদের মতো আমাদের দেশের ভোক্তারা তাদের অধিকার নিয়ে সচেতন না হওয়ায় খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে অকালেই এসব ভেজাল খাবার খেয়ে বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং বিভিন্ন কঠিন রোগজনিত সমস্যায় আমরা ভুগছি। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে থাকে।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট (বিএসটিআই) বাজার থেকে প্রায় ৪০৬টি পণ্য ক্রয় করে তাদের নিজস্ব ল্যাবে পরীক্ষা করে, তার মধ্যে ৫২টি পণ্যই ভেজাল বা মানসম্মত নয় এমন তথ্য পায়। এগুলোর মধ্যে সরিষার তেল, ঘি, চিপস, খাবার পানি, মশলা, নুডুলস, চানাচুর এমনকি আয়োডিনযুক্ত লবণও রয়েছে। এমন খবর দেখে আপনার আঁতকে ওঠারই কথা। শিশু, বড় ও বুড়ো সব বয়সী মানুষের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার হচ্ছে দুধ। মুরুব্বীরা বলেন- প্রতিদিন একগ্লাস দুধ খেলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া লাগে না এবং স্বাস্থ্য ভালো থাকে। কিন্তু এই দুধের মধ্যেও রয়েছে বিষ। কিছুদিন আগে আদালতে দাখিল করা এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে প্রায় ৯৬টি দুধের নমুনার মধ্যে ৯৩ টিতেই রয়েছে ভেজাল। যাতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, সীসা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের রয়েছে সরব উপস্থিতি। এমনকি দুগ্ধজাত পণ্য দই বা ঘি-ও এর প্রকোপ থেকে মুক্ত নয়। যা খেলে আমাদেরকে সুস্থ থাকার বদলে অসুস্থই থাকতে হবে বেশি পরিমাণে।

শিশুরা হচ্ছে সমাজের ফুল। তারা যদি ছোটবেলা থেকেই এসব ভেজাল দুধ এবং খাবার খেয়ে অসুস্থতার মাঝে বেড়ে ওঠে তাহলে এই সমাজের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিবে কারা যে কেউ এমন প্রশ্ন করাটাই স্বাভাবিক। আমরা কি বাগানের ফুলগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিচ্ছি না? এছাড়াও মাছ, মাংস উত্পাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে এন্টিবায়োটিক। যা খেলে মানবদেহে তা প্রবেশের মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে সুপার বাগ। ধীরে ধীরে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে শরীর অ্যান্টিবায়োটিক রেসিসট্যান্স হয়ে যাচ্ছে। ফলে শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ কারো শরীরেই কাজ করছে না কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ এবং তারা সামান্য সর্দি-কাশিজনিত রোগেই মারা যাচ্ছেন।

পুষ্টিবিদ এবং ডাক্তাররা আমাদেরকে সুস্থ থাকার জন্য বেশি বেশি শাক-সবজি এবং ফলমূল খেতে পরামর্শ দেন। কিন্তু বাজারের কীটনাশক এবং ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করা সেসব শাক-সবজি কি নিরাপদ? কিংবা সুস্বাদু ফলের কথাই ধরা যাক। বাজারের বেশিরভাগ ফলেই ব্যবহার করা হয় কার্বাইড, ফরমালিন এবং বিভিন্ন ক্ষতিকারক কেমিক্যাল। তাই ফলের মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই বাজারে মিলছে ভেজাল উপায়ে সংরক্ষণ করা সেইসব ফল। এমনকি বারোমাসি ফল পেঁপে, কলা ইত্যাদিও নিরাপদ নয়।

বর্তমানে চলছে সিয়াম সাধনা এবং পবিত্রতার মাস রমজান। এমাসে ভেজালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করা হলেও ভেজালের দৌরাত্ম্য যেহারে ছড়িয়ে পড়ছে সে তুলনায় এসব অভিযান খুব তুচ্ছ। রমজানে ধনী-গরীব সকলের জন্য অপরিহার্য একটি খাবার হচ্ছে খেজুর। যা দিয়ে মুসলিমরা সারাদিন অনাহারে থাকার পর ইফতার করেন। সারাবছর দেশে খেজুরের চাহিদা ২৫ হাজার টন হলেও শুধুমাত্র রমজান মাসেই এর চাহিদা হচ্ছে ১৮ হাজার টন। তাই অসাধু ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিচ্ছেন। প্রচুর দামে ক্রেতাদেরকে সরবরাহ করছেন নষ্ট ও মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর। স্বাস্থ্যবিদদের মতে- এ খেজুর নিয়মিত খেলে বিভিন্ন পেটের অসুখ থেকে শুরু করে হতে পারে ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগ।

সব সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে ভোক্তাদেরকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। তাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। ভোক্তাদের অধিকার রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে বহুল প্রতীক্ষিত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেছে। যে আইনে মোট ৮২টি ধারা এবং কিছু ধারার উপধারা রয়েছে। কিন্তু ভোক্তাদের এই আইন সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকার কারণে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোনের মাধ্যমে গুগল প্লে-স্টোরে সংরক্ষিত ‘ভোক্তা অধিকার ও অভিযোগ’ অ্যাপের মাধ্যমে খুব সহজেই অভিযোগ করা যায়। কিংবা ই-মেইল ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ০১৭৭৭৭৫৩৬৬৮ ও ০৩১-৭৪১২১২ নম্বরে কল দিয়ে সহজেই পণ্য কেনার ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ করা যাবে। তদন্ত শেষে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিক্রেতাকে যে পরিমাণ আর্থিক জরিমানা করা হবে, তার ২৫ শতাংশ অভিযোগ দায়েরকারী ভোক্তাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়া হবে।

এছাড়াও আমাদের দেশের ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ অনুসারে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে প্রথমবার ধরা পড়লে ৭ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং দ্বিতীয়বার ধরা পড়লে ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু এ বিধান কি সব ক্ষেত্রেই কার্যকর করা হচ্ছে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সামান্য পরিমাণে জরিমানা বা স্বল্পমেয়াদী কারাদণ্ড দিয়েই খাদ্য ভেজালকারীদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে। ফলে এই নীরব ঘাতক বা খুনীরা খুব সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। একজন খুনীর সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। খাদ্যে ভেজালকারীরা হচ্ছেন নীরব খুনি। তারা সমাজের শত্রু। তাদের এসব অসাধু কারবারের কারণে নীরবে খুন হচ্ছে সমাজের হাজারো মানুষ। তাই সময় এসেছে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করা নিয়ে দেশ ও জাতির নতুন করে ভাবার।

n লেখক : শিক্ষার্থী, খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৭ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন