ঢাকা বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬
৩৩ °সে


থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে চাই সচেতনতা

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে চাই সচেতনতা

আফসানা রিজওয়ানা সুলতানা

থ্যালাসেমিয়া অটোজোমালমিউট্যান্ট প্রচ্ছন্ন জিন দ্বারা গঠিত বংশগত রক্তের রোগ। রক্তে হিমোগ্লোবিন কম থাকলে এই রোগটি হয়। এটি একটি প্রাণঘাতী রোগ। এর চিকিত্সা পদ্ধতি অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮% অর্থাত্ প্রায় ৭০ লাখ লোক থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত এবং ১০%-এর বেশি থ্যালাসেমিয়ার বাহক। সেক্ষেত্রে দেশের প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষ এর বাহক। প্রতিবছর এই রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে আরো ১২-১৫ হাজার শিশু।

আমাদের দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী বাহক হওয়ায় এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলছে। কিন্তু এই রোগ সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে এই রোগটি সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকতে হবে।

যেহেতু এটি একটি বংশগত রোগ এটি বাবা-সন্তান, পরিবার-পরিবার, প্রজন্ম-প্রজন্ম ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিরোধ থেকে কার্যকরী উপায় হলো বাহকদের মধ্যে বিয়ে না করা। কারণ কোনো বাহক এর সঙ্গে বিয়ে হলে প্রতি চারজন সন্তানের মধ্যে তিন ধরনের সন্তান জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার মধ্যে একটি সন্তান হবে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং একটি সন্তান হবে সম্পূর্ণ আক্রান্ত। বাকি দুজন সুস্থ কিন্তু রোগের বাহক হিসেবে জন্মগ্রহণ করবে। আর এভাবেই আমাদের দেশে এই রোগের বাহকের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলছে। কিন্তু স্বামী বা স্ত্রীর যেকোনো একজন যদি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে তাহলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। সন্তান থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে যা কোনো রোগ নয়।

সাধারণত কোনো শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করলে জন্মের ৬ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যেই এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। রোগীর দুর্বল অনুভব হয়, শ্বাসকষ্ট ও মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যায়, ত্বক হলুদ হয়ে যায়, মুখের হাড়ের বিকৃতি ঘটে, পেট বাইরের দিকে প্রসারিত হয়, প্রস্র্রাব গাঢ় রঙের হয় এবং ধীরগতিতে শারীরিক বৃদ্ধি ঘটে। যেহেতু এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তশূন্যতা দেখা দেয় তাই দেখা যায় রক্ত শেষ হয়ে গেলে রোগীর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুকে ব্যথা করে, হেঁচকি উঠে, শীতের মধ্যেও রোগী ঘেমে যায়।

এই রোগের একটি সাধারণ চিকিত্সা হলো রোগীকে নিয়মিত রক্ত দেয়া। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত একজন রোগীকে বছরে ৮-১০ বার রক্ত নিতে হয়। অর্থাত্ রোগীকে অন্যের রক্তের উপর নির্ভর করে বাঁচতে হয়। বারবার রক্ত পরিবর্তনের কারণে রোগীর রক্তবাহিত রোগ হেপাটাইটিসের সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এসব রোগীর জন্য বছরে প্রায় ২ লাখেরও বেশি ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। দেশের ব্লাড ব্যাংকগুলোর শতকরা ৬০ ভাগ রক্ত ব্যয় হয় থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্যে। এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ১০ বছর পর রোগীর হার্টে আয়রন জমা হতে শুরু করে। যার ফলে রোগীর যকৃত বিকল হয়ে যেতে পারে। সেজন্য রোগীকে আবার আয়রন চিলেশন থেরাপি দেয়া হয়।

থ্যালাসেমিয়ার একটি কার্যকরী চিকিত্সা হলো Bone Marrow Transplantation। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি চিকিত্সা। Bone Marrow Transplantation করতে একজন রোগীর প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সাধারণত রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে একজন রোগী ৩০-৩৫ বছর বেঁচে থাকতে পারেন। কিন্তু Bone Marrow Transplantation-এর ফলে একজন রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

সাধারণত কোনো রোগ প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধই উত্তম। আমরা কিছু বিষয় মেনে চললেই এই রোগটিকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করতে পারি। প্রথম বিষয়টি হচ্ছে এই রোগের বাহকদের মধ্যে বিয়ে না করা। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে গর্ভাবস্থায় কিছু পরীক্ষা করানো। যেমন- Chorionic Villus Sampling, Amniocentesis, Fetal Blood Sampling পরীক্ষায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ফল আসলে সেক্ষেত্রে সন্তান ধারণ না করাটাই উত্তম হবে।

কিছু কিছু প্রজাতির মধ্যে এই রোগ বেশি হয়। যেমন- দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, ইতালি, মধ্যপ্রাচ্য ইত্যাদি। দেখা যাচ্ছে ভৌগোলিক দিক থেকে আমরা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে বাস করি। কিন্তু আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে এখনো সেভাবে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। আমরা অনেকেই এই রোগ সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না। তাই সবার আগে আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রচার মাধ্যমগুলোতে বেশি বেশি প্রচারণা চালাতে হবে। দেশেই এর পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই আমরা ভবিষ্যতে একটি থ্যালাসেমিয়ামুক্ত প্রজন্ম পাবো।

লেখক : শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান

ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৭ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন