ঢাকা রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬
৩২ °সে


সংসদ ‘অবৈধ’ হলে তাঁর সদস্যপদ ‘বৈধ’ হয় কীভাবে?

সংসদ ‘অবৈধ’ হলে তাঁর সদস্যপদ ‘বৈধ’ হয় কীভাবে?

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে ১১ জুন। শুরুর দিনই সংসদ সামান্য সময়ের জন্য ‘উত্তপ্ত’ হয়ে উঠেছিল। আর এটা করেছিলেন সংরক্ষিত আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি স্পিকারের অনুমতি নিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, বর্তমান সংসদটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। তাঁর এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন সরকার দলের সদস্যরা। কিন্তু বাধার মুখেও বিএনপির নতুন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন দুই/আড়াই মিনিটের বক্তৃতায় খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের স্তুতি করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে সংসদ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তা এক্সপাঞ্জ করার কথা স্পিকার জানিয়েছেন। তবে ব্যারিস্টার রুমিনের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। বিএনপি সংসদে যোগ দিয়েছে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পক্ষে কথা বলার জন্যই। তাঁরা যতটুকু সুযোগ পাবে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার যে করবে তার প্রমাণ প্রথম দিনই রেখেছেন।

ব্যারিস্টার রুমিনকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে সম্ভবত তাঁর কথা বলার পারদর্শিতার কারণেই। তিনি বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্য ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একাই যেমন একশ জনের ভূমিকা পালন করেছিলেন, ব্যারিস্টার রুমিনও তেমন ভূমিকা রাখবেন বলে বিএনপি হয়তো আশা করছে। বিএনপির আশাপূরণে এই নবীন সংসদ সদস্য শতভাগ আন্তরিক থাকার চেষ্টা যে করবেন তাতে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। সংসদে তিনি অনেক ‘অপ্রিয়’ মুহূর্তের জন্ম দেবেন বলে মনে হচ্ছে। সরকারি দলের সদস্যরা যেমন তোপের মুখে পড়বেন, তেমনি রুমিনের বিরুদ্ধে কামান দাগবে তাঁরা। গত ৯ জুন শপথ গ্রহণ করেছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। সেদিনই তিনি সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘এই সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। গঠিত হওয়ার পর আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই সংসদকে অবৈধ বলেছি। আমি এখনো তা বলছি’। ‘অবৈধ’ সংসদে তিনি কেন সদস্য হলেন বা শপথ নিলেন—এই প্রশ্নের জবাবে রুমিন বলেছেন, ‘বিষয়টি খুব পরিস্কার। এটা হচ্ছে আমাদের গণতান্ত্রিক স্পেস। আমাদের কথা বলার জায়গাগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। সেই অর্থে দেখতে পাচ্ছি সংসদ একটি ভালো অ্যাভিনিউ, যেটা আমরা ব্যবহার করতে পারি—আমাদের দলের কথা, দেশের কথা ও মানুষের কথা বলার জন্য। আর সেই স্পেসটা ব্যবহার করার জন্য আমাদের এই সংসদে আসা’।

বিএনপির এই নতুন আইনপ্রণেতা আরো বলেছেন, ‘খুব খুশি হবো আমার সংসদ সদস্য হওয়ার মেয়াদ যদি একদিনের বেশি না হয়। আমি চাই যেন অতি দ্রুত একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠিত হোক’। ব্যারিস্টার রুমিনের বক্তব্যে অনেক স্ববিরোধিতা আছে। সংসদ যদি সত্যি অবৈধ হয়ে থাকে, এই সংসদ যদি জনগণের ভোটে গঠিত না হয়ে থাকে তাহলে বিএনপির উচিত হয়নি এই সংসদে যোগ দেওয়া। একদিকে সংসদকে অবৈধ বলবেন, অন্যদিকে এই সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন এই দ্বিমুখী নীতি কোনো যুক্তিতেই সমর্থন করা যায় না। প্রশ্ন আসছে, বিএনপির সংসদ সদস্যরা কি বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নেবেন না? সংসদ সদস্য হিসেবে শুল্কমুক্ত গাড়ি পাওয়ার যে সুযোগ তাদের রয়েছে তারা কি তা নেবেন না? সুযোগ-সুবিধা সব নিয়ে তারপর সংসদকে অবৈধ বললে সেটা খুবই হাস্যকর হয়। তাছাড়া যে সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় সেই ‘অবৈধ’ সংসদ কীভাবে বিএনপির জন্য গণতান্ত্রিক স্পেস তৈরি করবে? ‘অবৈধ’ সংসদ কীভাবে দলের কথা, দেশের কথা ও মানুষের কথা বলার উপযুক্ত স্থান হতে পারে?

বিএনপির কথা ও কাজের সমন্বয়হীনতা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। তাঁদের কথায় যুক্তির ধার কমে আসছে। অনেক কথাই বলা হচ্ছে শুধু বলার জন্য। যেমন দেশে গণতন্ত্র নেই বলে তাঁরা ডংকানিনাদ করছে। বলা হচ্ছে, কথা বলার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। প্রশ্ন হলো— অবস্থা যদি তেমনই হয় তাহলে ব্যারিস্টার রুমিনের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে কীভাবে? বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সভা-সমাবেশে যে বক্তব্য দেন তা প্রচারে কখনো সরকারিভাবে বাধা দেওয়া হয় বলে বিএনপির পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয় না। সংবাদ সম্মেলন করেও বিএনপি তাঁদের দলীয় বক্তব্য প্রচার করছে, কেউ বাধা দিচ্ছে বলে মনে হয় না। আসলে এখন বিএনপি এক কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে আছে। বিএনপির সামনে যেসব প্রতিকূলতা তৈরি হয়েছে তাঁর দায় বিএনপিরই। বিএনপির ভুল রাজনৈতিক নীতি-কৌশলই দলটিকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। সরকারের বিরোধিতা করার জন্য বিরোধী দলকে সহযোগিতা করার কোনো নজির কোনো গণতান্ত্রিক দেশেও আছে কি? সরকারের দমন-পীড়ন মোকাবিলা করেই বিরোধিতা দলকে জনগণের কাছে যেতে হয়, জনগণের সমর্থন আদায় করতে হয়। নদীতে বা পুকুরে নেমে গোসল করলে চুলতো ভিজবেই।

ব্যারিস্টার রুমিন বলছেন, বর্তমান সংসদ অবৈধ। তাহলে বিএনপির যারা সদস্য হয়েছেন তাঁরাও নিশ্চয়ই অবৈধ। সংসদ অবৈধ কিন্তু বিএনপির সদস্যরা বৈধ! এটা হয় কখনো? ব্যারিস্টার রুমিন দ্রুত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দাবি করছেন। এই ‘দ্রুত’ মানে কত দিন? যদি দ্রুত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হয় তাহলে তিনি বা তাঁর দলের অন্য সদস্যদের অবস্থান কি হবে? তাঁরা কি পদত্যাগ করবেন? তিনি সংসদে যোগ দিয়ে ন্যায্য কথা বলার জন্য যথেষ্ট সময় ও সুযোগ দাবি করেছেন। যদি তাঁর এই দাবি পূরণ না হয় তাহলেই তিনি বা তাঁরা কি করবেন? যে রাজনৈতিক অবস্থা দেশে তৈরি হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসার সহজ পথ বিএনপির সামনে আছে বলে মনে হয় না। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই তাঁদের চলতে হবে। নিজেদের ভুল ঢাকতে গিয়ে এখন তাঁদের একেক সময় একেক রকম কথা বলতে হবে। তাতে মানুষের কাছে বিএনপির অসংগতিগুলো আরো স্পষ্ট হবে। মানুষ ঠিকই বুঝতে পারছে যে, সংসদে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি কার্যত সংসদকে বৈধতা দান করেছে। এখন তাঁরা সংসদকে যত অবৈধ বলবে ততই তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে। সরকার তাঁদের সংসদে নিতে চেয়েছে, তাঁরা কিছু গাঁইগুঁই করে শেষ পর্যন্ত সংসদে গিয়েছে। সরকারের সঙ্গে বুদ্ধির খেলায় পরাজিত বিএনপি এখন কথার লড়াইয়ে জিততে চাইছে। কিন্তু সংসদে বিএনপির কথা বলার মুখ ছয়টি। আওয়ামী লীগের মুখ অনেক বেশি। গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী সংসদে বিএনপি হেরে বসে আছে।

রুমিন ফারহানা ভালো বলেন। অনেকেই মনে করছেন, সংসদের বাজেট অধিবেশন এবার জমজমাট হবে। বিএনপির সদস্যরা সংসদে ‘উত্তাপ’ ছড়ানোর চেষ্টা করবে। সরকার পক্ষের উচিত হবে তাঁদের সহ্য ক্ষমতা বাড়ানো। কথায় বলে, ‘যে সহে, সে রহে’। বিএনপিরও এখন উচিত হবে ধৈর্য না হারানো। তাড়াহুড়া করার কিছু নেই। তাঁদেরও মনে রাখতে হবে, ‘সবুরে মেওয়া ফলে’।

n লেখক :প্রবীণ সাংবাদিক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন